× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারী প্রকাশকদের অক্ষর ও কালির সংগ্রাম

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১২:৫৯ পিএম

নারী প্রকাশকদের অক্ষর ও কালির সংগ্রাম

যে দেশে শিক্ষার মান নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন ওঠে, পাঠাভ্যাস যেখানে ক্রমেই নিম্নগামী, সেখানে প্রকাশনা শিল্প এমনিতেই এক বন্ধুর পথ। আর এই দুর্গম পথে যখন কোনো নারী হাঁটতে শুরু করেন, তখন তার সামনের বাধাগুলো বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প মূলত মেধা, মনন, পুঁজি এবং অসীম ধৈর্যের এক সংমিশ্রণ। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত এই শিল্পে নারী প্রকাশকদের উপস্থিতি এখনও হাতে গোনা। কেন নারীরা প্রকাশনা শিল্পে পিছিয়ে আছেন? তাদের বাধাগুলো ঠিক কোথায় এবং কীভাবে এই অচলায়তন ভাঙা সম্ভব? দেশের কয়েকজন স্বনামধন্য ও প্রতিশ্রুতিশীল নারী প্রকাশকের অভিজ্ঞতার আলোকে উঠে এসেছে এই শিল্পের অন্তর্নিহিত সংকট ও সম্ভাবনার গল্প।

শিক্ষার মান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট প্রকাশনা শুধু একটি ব্যবসাই নয়, এটি একটি জাতির মননশীলতার পরিচায়ক। কিন্তু আমাদের দেশে এই শিল্পের ভিত্তিই যেন নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে যুক্ত প্রকাশনীর প্রকাশক নিশাত জাহান রানা এক গভীর সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যে দেশে শিক্ষার মান ক্রমাগত নিম্নগতি ধারণ করছে, সেখানে প্রকাশনা ব্যবসা কোনো লাভজনক ক্ষেত্র যে নয়, সেটা নিশ্চয়ই খুব সহজেই সবাই অনুধাবন করতে পারেন। সাক্ষরতার হার বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হলেও, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নকে অবহেলা করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস প্রায় ধূলিসাৎ হয়েছে।

শায়লা রহমান তিথি (ঝুমঝুমি) ও মিতিয়া ওসমান (ময়ূরপঙ্খি)

তিনি আরও যুক্ত করেন, প্রকাশনা জগৎ যে জনগোষ্ঠীকে বুদ্ধিবৃত্তিক আহার জোগান দেয়, সেই জনগোষ্ঠীকেই সবচেয়ে দুর্বল করে তোলা হয়েছে। ফলে এটি নতুন বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করে না। আর নারীর কাছে পুঁজির জোগান সবচেয়ে কম থাকায় তার জন্য এই ব্যবসায় নামা আরও কঠিন। নিশাত জাহান রানার মতে, প্রকাশনা ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য যে জ্ঞান, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, তা শিক্ষা ও বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্কের তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নারীর জন্য কিছুটা কঠিন বটে।

বহুমাত্রিক বাধা ও পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব নারী প্রকাশকদের সামনে সমাজ, অর্থনীতি ও কাঠামোগত নানা বাধা প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। ‘জলধি’ প্রকাশনীর প্রকাশক নাহিদা আশরাফী বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, সামাজিক ও পারিবারিক বাধা এর অন্যতম কারণ। বইমেলা, লেখক-পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ, রাত অবধি কাজ- এসবকে নারীর জন্য অনুপযুক্ত ধরা হয়। এ ছাড়া প্রকাশনা শুরু করার মূলধন জোগাড় করা নারীর জন্য অনেক বেশি কঠিন।

সবচেয়ে বড় বাধা হলো নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগের ঘাটতি। নাহিদা আশরাফী বলেন, ‘প্রকাশনা জগৎ অনেকটাই নেটওয়ার্ক নির্ভর। লেখক, সম্পাদক, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, পরিবেশক- এই নেটওয়ার্ক ঐতিহাসিকভাবে পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় নতুন নারী প্রকাশকদের প্রবেশ বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।’ এ ছাড়া রাতের কাজ, দূরে যাতায়াত ও নিরাপত্তার উদ্বেগ নারীদের পিছিয়ে রাখে। পুরুষ সহকর্মীদের অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘খুব দুঃখজনক হলেও সত্যি নারীদের প্রতি পেশাদারি মনোভাব পোষণ করেন না অধিকাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের পুরুষ সদস্যবৃন্দ। কিছুদিন আগে আমি একটি আয়োজনে সবাইকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছিলাম- আমাকে দুর্বল ভেবে এগিয়ে দেওয়ার কোনো দরকার নেই, শুধু আমার চলার পথে দয়া করে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না।’

তানিয়া আক্তার (গপ্পো-সপ্পো) ও ফরিদা হৃদি (আদিত্য)

পারিবারিক অনুমোদন ও ছাপাখানার বাস্তবতা সমাজ ও পরিবার নারীকে সবসময় ‘নিরাপদ’ পেশায় দেখতে চায়, যেখানে ঝুঁকি নেই। ‘গ্রন্থিক প্রকাশন’-এর প্রধান নির্বাহী ও প্রকাশক গপ্পো-সপ্পো এই সামাজিক মনস্তত্ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক নারী প্রকাশনা শিল্পে আসতে চায়, কিন্তু পরিবারের অনুমোদন প্রায়ই থাকে না। পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসাকে নিরাপদ মনে করে না। অনেক পরিবারে মেয়েদের জন্য শুধু সরকারি চাকরি অনুমোদিত। কারণ তা স্থির ও ঝুঁকিমুক্ত।’

তিনি মাঠপর্যায়ের একটি বড় সংকটের কথা জানিয়ে বলেন, বইয়ের মান নিশ্চিত করতে ছাপাখানার শ্রমিকদের নির্দেশনা দেওয়া নারী প্রকাশকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এখানকার বেশিরভাগ শ্রমিক কম পড়াশোনা জানেন। সব মিলিয়ে বড় বিনিয়োগের এই জায়গায় ব্যাংকঋণ পাওয়া বা বিনিয়োগকারী পাওয়া নারীদের জন্য দুরূহ। এতকিছুর পরও কিছু নারী প্রকাশক যে সাহসের সঙ্গে টিকে আছেন, তার চিত্র এঁকে তিনি বলেন, ‘সকালবেলার নরম রোদে বইমেলায় কিছু নারী প্রকাশক স্টল সাজাচ্ছেন, হিসাব মিলাচ্ছেন, লেখকের ফোন ধরছেন। দূর থেকে সাধারণ মনে হলেও, ভেতরে তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প লুকিয়ে আছে।’

নাহিদা আশরাফী (জলধি) ও মুক্তা মজুমদার শ্রাবণী (আনন্দম)  

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপত্তার অভাব অন্যান্য পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও প্রকাশনায় তা সীমিত কেন, তার বাস্তবসম্মত উত্তর দিয়েছেন ‘ঝুমঝুমি’ প্রকাশনীর শায়লা রহমান তিথি। তার মতে, একজন পুরুষ প্রকাশক চাইলেই গভীর রাতে বাঁধাইখানা বা ছাপাখানায় যেতে পারেন, কিন্তু একজন নারীকে পরিবার, সমাজ ও নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়।

তিথি মনে করেন, প্রকাশনা কেবল ব্যবসা নয়, এটি একটি শিল্প এবং শখের জায়গা। কিন্তু শখ পূরণ করতেও অর্থের প্রয়োজন। এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘এখানটিতে যদি সরকার একটু সুদৃষ্টি দেন বা যারা ভালো ভালো বই করেন অথচ তাদের দৈন্যতা আছে, তবে সরকারিভাবে তাদের সহযোগিতার ব্যবস্থা করা উচিত। অন্যান্য পেশায় সরকারি বা বেসরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও প্রকাশনা সেক্টরে বলতে গেলে তা নেই।’ এ ছাড়া ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বইমেলায় নারী প্রকাশকদের জন্য নিরাপত্তা ও সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

নিশাত জাহান রানা (যুক্ত)

ভিন্ন অভিজ্ঞতা : ব্যবসায়িক কৌশল যেখানে মুখ্য সব নারী প্রকাশকের অভিজ্ঞতাই যে কেবল সামাজিক বাধায় পূর্ণ, তা নয়। ‘আনন্দম’ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী শ্রাবণী মজুমদার মুক্তা তুলে ধরেছেন ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকাশক জানান, তিনি পরিবার, সমাজ বা প্রেসÑ কোথাও কোনো হেনস্থা বা বৈষম্যের শিকার হননি; বরং সম্মান পেয়েছেন।

তবে তিনি পিছিয়ে পড়েছিলেন ব্যবসায়িক কৌশলের কারণে। শুরুতে কেবল কবিতার বই প্রকাশ করায় তাকে ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি এখন গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ ও শিশুতোষ বইয়ের দিকেও মনোযোগ দিচ্ছেন। শ্রাবণী মনে করেন, ‘প্রকাশনায় নারী বা পুরুষ বলে আলাদা কিছু নেই। মেধা, শ্রম ও আগ্রহ থাকলে যে কেউই আসতে পারেন। তবে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে, গুছিয়ে এবং ব্যবসায়িক দিকগুলো গভীরভাবে ভেবেচিন্তে আসাটা জরুরি।’

দৃষ্টান্তের অভাব ও সমাজের প্রতিচ্ছবি যেকোনো পেশায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য পূর্বসূরিদের দৃষ্টান্ত প্রয়োজন হয়। প্রকাশনা শিল্পে সেটির বড়ই অভাব ছিল বলে মনে করেন ‘ময়ূরপঙ্খি’ প্রকাশনীর মিতিয়া ওসমান। তিনি বলেন, ‘আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন হাতে গোনা দু-তিনজন নারী প্রকাশককে দেখতাম এবং তাদের অনেকেই পরিবারভিত্তিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে নতুন করে কেউ এই পেশায় আসার মতো অনুপ্রেরণার উদাহরণ খুব বেশি ছিল না।’

মিতিয়া ওসমানের মতে, প্রকাশনা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যেখানে দ্রুত লাভের নিশ্চয়তা নেই। পুঁজি জোগাড় ও পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরি করা নারীদের জন্য কঠিন। তবে তিনি মনে করেন এটি কেবল প্রকাশনার সমস্যা নয়, এটি সমাজের সার্বিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। তিনি আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, ‘একজন এগিয়ে এলে, তার কাজ দেখে আরেকজন সাহস পায়- এভাবেই ধীরে ধীরে পথটা তৈরি হয়।’

পারিবারিক দায়িত্ব ও নেটওয়ার্কের চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ, ধৈর্য আর সৃজনশীলতার এই পথে নারীর পারিবারিক দায়িত্ব একটি বড় অদৃশ্য শেকল হয়ে দাঁড়ায়। আদিত্য অনীক প্রকাশনী-এর ফরিদা হৃদি এই চ্যালেঞ্জটির কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, প্রথমত এটি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ, দ্বিতীয়ত পরিবার ও সমাজের অনাস্থা।

তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘প্রকাশনা শিল্পের নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকাংশে পুরুষ প্রধান। লেখক, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, পরিবেশক ও বিক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এই পুরুষ-প্রধান নেটওয়ার্কে নারীদের জন্য সহজ হয় না।’ এর সঙ্গে গৃহস্থালি ও সন্তানের দায়িত্ব সামলে প্রকাশনার মতো জটিল পেশায় সময় দেওয়া নারীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

উত্তরণের পথ ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে নারী প্রকাশকদের এই সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, মেধা বা যোগ্যতায় নয়, বরং সমাজ কাঠামো, পুঁজির অভাব ও নিরাপত্তার অভাবেই নারীরা পিছিয়ে আছেন। এই অচলায়তন ভাঙতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ, বইমেলাগুলোতে নারী প্রকাশকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং সর্বোপরি পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।

আমাদের সমাজ যেমন ক্রমশ বদলাচ্ছে, প্রকাশনা শিল্পেও সেই বদলের হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। বাধা পেরিয়ে যে নারী প্রকাশকরা আজ মেধা ও সাহসের স্বাক্ষর রাখছেন, তারাই আগামী প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক। একদিন সম্পাদনা ও প্রকাশনার মতো এই পরম সৃজনশীল খাত নারী-পুরুষের কাঁধে কাঁধ মেলানো শ্রমে ফুলে-ফসলে ভরে উঠবে- এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা