মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১২:৪৬ পিএম
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপের অনেক গ্রামেই তাকে সবাই চেনে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই তার আসল নাম জানে না। কেউ তাকে তনুশ্রী বলে ডাকে না, সবাই চেনে এক নামেই, ভ্যাকসিন দিদি। হাতে ছোট্ট একটি বক্স, কাঁধে ব্যাগ আর মেঠোপথে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়ানো এই নারীই তনুশ্রী গাইন। হাঁস-মুরগির টিকা দেওয়ার কাজ করে শুধু নিজের সংসারই নয়, পুরো এলাকার প্রাণিসম্পদ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তিনি।
দাকোপ উপজেলা এমন একটি অঞ্চল, যেখানে জীবন প্রতিনিয়ত সংগ্রামের নাম। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই এখানে মানুষের বসবাস। প্রতিদিন একটু একটু করে নদী গিলে নিচ্ছে জমি আর বসতভিটা। তবুও জীবন থেমে থাকে না। এই কঠিন বাস্তবতায় নিজেদের ভাগ্য বদলাতে নানা পথ খুঁজছেন এখানকার মানুষ। সেই পথেই সাহসী এক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তনুশ্রী গাইন।
তনুশ্রী গাইন দাকোপ উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহবধূ। এক সময় তার জীবনও ছিল অনেকটা সাধারণ গ্রামের নারীদের মতোই। সংসারের কাজ, সন্তান লালন-পালন আর সীমিত আয়ের মধ্যে দিন পার করা এই ছিল তার জীবনের গল্প। স্বামীর আয়েই চলত চার সদস্যের সংসার। কিন্তু সংসারের খরচ মেটাতে প্রায়ই হিমশিম খেতে হতো।
তবে তনুশ্রীর মনে ছিল কিছু করার ইচ্ছা। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। সেই সুযোগটি আসে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের উদ্যোগে। স্থানীয়ভাবে হাঁস-মুরগির রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছু নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় প্রাণিসম্পদ বিভাগ। আগ্রহ দেখালে তনুশ্রীও সেই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
প্রশিক্ষণ শেষে শুরু হয় তার নতুন পথচলা। হাঁস-মুরগির টিকা দেওয়া শিখে মাঠে কাজ শুরু করেন তিনি। সংসারের কাজ শেষ করেই প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন গ্রামের মেঠোপথে। কখনও এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম, কখনও নদী পার হয়ে দূরের জনপদ এভাবেই মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হাঁস-মুরগির টিকা দেন। এই কাজের বিনিময়ে তিনি সরকার নির্ধারিত সম্মানী পান। ধীরে ধীরে এই আয়ই হয়ে ওঠে তার পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভিত্তি।
তনুশ্রী গাইন বলেন, মানুষ আমার নাম না জানলেও আমাকে ভ্যাকসিন দিদি বলেই ডাকে। এতে আমার খারাপ লাগে না। বরং মনে হয় মানুষ আমার কাজকে সম্মান করছে। আগে সংসার চালাতে কষ্ট হতো, এখন নিজের আয় দিয়ে অনেকটা সচ্ছলভাবে চলতে পারছি।
বর্তমানে তনুশ্রীর দুই সন্তান পড়াশোনা করছে। বড় সন্তান কলেজে এবং ছোট সন্তান স্কুলে পড়ে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচের একটি বড় অংশ এখন তিনি নিজেই বহন করতে পারেন। শুধু টিকা দেওয়ার কাজই নয়, নিজের বাড়ির আশপাশের জমিও কাজে লাগিয়েছেন তনুশ্রী। পতিত জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করেন। এতে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি কিছু আয়ও হয়।
তনুশ্রী জানান, আমাদের এলাকায় বিভিন্ন গ্রুপ বা কমিটি আছে। সেখানে মাঝে মাঝে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা আসেন। তারা নতুন নতুন তথ্য দেন, প্রশিক্ষণ দেন। এগুলো আমাদের কাজ করতে অনেক সাহায্য করে। স্থানীয়দের কাছেও তনুশ্রী এখন খুবই পরিচিত একজন মানুষ। গ্রামের গৃহবধূ আফরোজা বেগম বলেন, দিদির আসল নাম আমরা জানি না। সবাই তাকে ভ্যাকসিন দিদি বলেই ডাকে। যখন হাঁস-মুরগিকে টিকা দিতে হয় তখন আমরা তাকে খবর দিই। আরেক বাসিন্দা স্বপ্ন মণ্ডল বলেন, উপজেলার অনেক জায়গাতেই তাকে সবাই ভ্যাকসিন দিদি নামে চেনে। তিনি নিয়মিত এসে হাঁস-মুরগির টিকা দিয়ে যান। এতে আমাদের হাঁস-মুরগিও কম অসুস্থ হয়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বঙ্কিম কুমার হালদার বলেন, তনুশ্রী গাইন আমাদের দেওয়া প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন খুব দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে। সে নিয়মিত গ্রামে গ্রামে গিয়ে হাঁস-মুরগির টিকা দিচ্ছে। এতে প্রাণিসম্পদ সুরক্ষিত হচ্ছে এবং একই সঙ্গে একজন নারী স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, গ্রাম পর্যায়ে এমন প্রশিক্ষিত নারী কর্মী তৈরি হলে প্রাণিসম্পদ খাত আরও শক্তিশালী হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।