মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬ ১৪:১৮ পিএম
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে ‘ঈদ’ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি আত্মপরিচয় আর শুদ্ধতার এক অনন্য উদযাপন। আর এই উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো নতুন পোশাক। একসময় ছেলেদের ঈদ ফ্যাশন মানেই ছিল সাদা সুতির পাঞ্জাবি আর সাধারণ পায়জামা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রুচি ও মননশীলতায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। বর্তমান সময়ে ছেলেদের ফ্যাশন কেবল একটি পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন আভিজাত্য, ব্যক্তিত্ব এবং স্বকীয়তা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এখন সময় দাঁড়িয়ে আছে এক চমৎকার সন্ধিক্ষণে যেখানে একদিকে ঐতিহ্যের শিকড় আঁকড়ে ধরা আভিজাত্য, অন্যদিকে বিশ্বায়ন আর আধুনিক জ্যামিতিক নকশার জয়জয়কার।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউসগুলো সাজিয়েছে তাদের বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ। এবারের ঈদ ফ্যাশনের মূল মন্ত্র হলো ‘কমফোর্ট উইথ স্টেটমেন্ট’ অর্থাৎ শুধু দেখতে সুন্দর হলেই হবে না, পোশাকটি হতে হবে আরামদায়ক এবং তাতে থাকতে হবে পরিধানকারীর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের ছাপ।

রঙের জাদুকরি ব্যবহার
এবারের ঈদে রঙের ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চিরাচরিত সাদা বা কালো তো আছেই, তবে প্যাস্টেল শেডগুলো এবার বাজার দখল করে নিয়েছে।
আর্থি টোন : অলিভ গ্রিন, মাস্টার্ড ইয়েলো, টেরাকোটা এবং মাটির রঙ এবার খুব ট্রেন্ডি। যারা একটু কুল লুক পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই রঙগুলো সেরা।
প্যাস্টেল কালার : হালকা নীল, মিন্ট গ্রিন এবং হালকা গোলাপি বা ল্যাভেন্ডার রঙের পাঞ্জাবি ও শার্ট তরুণদের প্রথম পছন্দ। এই রঙগুলো চোখে প্রশান্তি দেয় এবং রোদে আরামদায়ক অনুভূতি দেয়।
রয়েল টাচ : রাতের অনুষ্ঠানের জন্য গাঢ় মেরুন, নেভি ব্লু বা পান্না সবুজ রঙের জয়শট বা সিল্কের পাঞ্জাবি আভিজাত্য এবং জৌলুস প্রকাশ করে।
দিনের বেলা এবং রাতের বেলার সাজের জন্য আলাদা আলাদা রঙের ব্যবহার সচেতন ব্যাক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলে। তীব্র গরমের কথা মাথায় রেখে দিনের বেলা হালকা এবং প্রশান্তিদায়ক রঙের ব্যবহার করা উচিত।
পাঞ্জাবিতে আধুনিকতার ছোঁয়া

ঈদের সকালে পাঞ্জাবি ছাড়া ছেলেদের সাজ পূর্ণতা পায় না। ঈদ ফ্যাশনে পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এর কাপড়ে। এ বছর সুতি কাপড়ের পাশাপাশি ব্যাম্বু কটন এবং ভিসকস কাপড়ের ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। ব্যাম্বু কটন অত্যন্ত আরামদায়ক এবং পরিবেশবান্ধব, যা গ্রীষ্মের তপ্ত রোদেও শরীরকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া সিল্ক ও তসর সিল্কের পাঞ্জাবিগুলো রাতের দাওয়াতের জন্য বিশেষ আভিজাত্য যোগ করছে। ডিজাইনের ক্ষেত্রে এ বছর মিনিমালিস্ট কারুকাজ প্রাধান্য পাচ্ছে। খুব বেশি ভারী কাজ বা চুমকির বদলে কলার এবং পকেটে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি বা হাতের কাজ বেশি সমাদৃত। ডিজিটাল প্রিন্টের পাঞ্জাবিগুলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। জ্যামিতিক নকশা, ফ্লোরাল মোটিফ এবং বিমূর্ত শিল্পের ছোঁয়া থাকছে এবারের পাঞ্জাবিগুলোতে। কাটিংয়ের ক্ষেত্রে সেমি-লং এবং স্লিম-ফিট পাঞ্জাবিগুলোই ট্রেন্ডে রয়েছে। পাঞ্জাবির বোতামেও এসেছে বৈচিত্র্যÑ ধাতব বোতাম, কাঠের বোতাম কিংবা পাথরের বসানো বোতাম পাঞ্জাবির লুকে নিয়ে আসছে এক নতুন মাত্রা।
কাবলি সেটের জয়জয়কার
গত কয়েক বছর ধরে কাবলি সেট ছেলেদের ফ্যাশনে এক অনন্য জায়গা দখল করে নিয়েছে। এ বছরও এই ধারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। কাবলি সেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ঢিলেঢালা ভাব এবং রাজকীয় লুক। অনেক ফ্যাশন হাউস বাবা এবং ছেলের জন্য একই ডিজাইনের কাবলি সেট বাজারে এনেছে। কাবলি সেটের ক্ষেত্রে কলারের ডিজাইন এবং পকেটের কাজে নতুনত্ব এসেছে। গাঢ় রঙের কাবলি যেমন নেভি ব্লু, বটল গ্রিন এবং মেরুন রঙের পাশাপাশি হালকা ধূসর এবং বেজ রঙের কাবলিগুলোও বেশ জনপ্রিয়।
ক্যাজুয়াল ফ্যাশন
নামাজের পর বা বন্ধুদের সাথে আড্ডার সময় আরামদায়ক পোশাক হিসেবে টি-শার্ট বা পোলো শার্টের বিকল্প নেই।
ওভারসাইজ টি-শার্ট : বর্তমান প্রজন্মের কাছে স্ট্রিটওয়্যার বা ওভারসাইজড টি-শার্ট একটি বড় ক্রেজ। ড্রপ শোল্ডার এবং বড় প্রিন্টের এই শার্টগুলো যেমন আরামদায়ক, তেমনি স্টাইলিশ।
প্রিমিয়াম পোলো : যারা একটু ফরমাল কিন্তু আরামদায়ক লুকে থাকতে চান, তারা পিকে বা নিট ফেব্রিকের প্রিমিয়াম পোলো শার্ট বেছে নিচ্ছেন। হালকা স্ট্রাইপ বা সলিড কালারের পোলো শার্ট এবারও ইন-ট্রেন্ড।
বটমওয়্যার
ঈদের ফ্যাশন এখন আর একমাত্র পাঞ্জাবিকেন্দ্রিক নয়। দিনের ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনে বদলে যায় লুক, আর সেই সঙ্গে বদলে যায় বটমওয়্যারের ধরনও। তাই বটমওয়্যারকে এখন ভাবা হয় পুরো স্টাইলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে, যা পাঞ্জাবি কিংবা টি-শার্ট, দু’ক্ষেত্রেই সমান জরুরি।
স্লিম-ফিট ট্রাউজার : সাধারণ কিন্তু পরিপাটি লুকের জন্য কটন বা গ্যাবার্ডিন ট্রাউজার ভালো মানায়। হালকা রঙের টি-শার্টের সঙ্গে বেজ, ধূসর বা নেভি ট্রাউজার স্মার্ট দেখায়।
জিন্স : ক্লাসিক ডেনিম কখনও পুরনো হয় না। ঈদের বিকালের আড্ডা বা ঘুরতে যাওয়ার জন্য মিড-ব্লু বা ডার্ক-ব্লু জিন্স বেশ মানানসই। তবে খুব বেশি ডিস্ট্রেসড বা ছেঁড়া ডিজাইন এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ ঈদের লুক সাধারণত পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত হয়।
কার্গো বা চিনো প্যান্ট : তরুণদের মধ্যে কার্গো বা চিনো প্যান্ট জনপ্রিয়। এটি আরামদায়ক এবং ক্যাজুয়াল স্টাইলে মানানসই। সলিড কালারের টি-শার্টের সঙ্গে এই ধরনের প্যান্ট ভারসাম্যপূর্ণ লুক দেয়।
শর্টস : পরিবার বা বন্ধুদের ঘরোয়া আয়োজনে কেউ কেউ স্টাইলিশ শর্টসও পরেন। তবে এটি পুরোপুরি পরিবেশ ও অনুষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী বেছে নেওয়া উচিত।
ফিট ও রঙের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ, টি-শার্টের সঙ্গে বটমওয়্যার নির্বাচন করার সময় খেয়াল রাখতে হবেÑ
-ওপরের পোশাক যদি লুজ হয়, নিচেরটি যেন খুব বেশি ঢিলা না হয়।
-খুব বেশি টাইট ফিট এড়িয়ে চলা ভালো।
-রঙে কনট্রাস্ট বা টোনাল ব্যালান্স রাখলে লুক পরিপাটি দেখায়।
সব মিলিয়ে, ঈদের স্টাইল এখন একমুখী নয়। পাঞ্জাবি হোক বা টি-শার্ট প্রতিটি লুকেই সঠিক বটমওয়্যারই তৈরি করে সম্পূর্ণ ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি।
জুতা
ছেলেদের ঈদ ফ্যাশনে জুতো পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পাঞ্জাবির সাথে ট্র্যাডিশনাল নাগরা বা চামড়ার স্যান্ডেল সবসময়ই সেরা। নাগরা জুতোর ক্ষেত্রে এ বছর বিভিন্ন রঙ এবং এমব্রয়ডারি করা ডিজাইনের চাহিদা বেশি। তবে বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ পাঞ্জাবির সাথে লোফার বা ফরমাল সু পরতেও পছন্দ করছেন। কাবলি সেটের সাথে পেশোয়ারি চপ্পল বা চামড়ার চটি জুতো একটি রাজকীয় লুক দেয়। জুতোর রঙ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেল্ট এবং ঘড়ির ফিতার সাথে সামঞ্জস্য রাখা ফ্যাশন সচেতনতার পরিচয়।
অনুষঙ্গ বা এক্সেসরিজ
ঈদের সাজপোশাক যত দামিই হোক না কেন, সঠিক অনুষঙ্গ ছাড়া সাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একজন সচেতন পুরুষ যখন তার পোশাকের সাথে মানানসই ঘড়ি, চশমা বা সুগন্ধি বেছে নেন, তখনই তার ব্যক্তিত্বের প্রকৃত আভিজাত্য ফুটে ওঠে।
ঘড়ি : ঈদের সাজে ঘড়ি কেবল সময় দেখার যন্ত্র নয়, বরং এটি রুচির পরিচায়ক। পাঞ্জাবির হাতা কিছুটা ফোল্ড করে পরলে একটি প্রিমিয়াম ঘড়ি পুরো লুক বদলে দেয়। ক্ল্যাসিক লুকের জন্য বাদামি বা কালো চামড়ার বেল্টের বড় ডায়ালের ঘড়ি চিরকালই আভিজাত্যের প্রতীক। অন্যদিকে, আধুনিক বা টেক-স্যাভি স্টাইল পছন্দ করলে রুপালি বা গান-মেটাল রঙের মেটাল চেইনের স্মার্টওয়াচ বেছে নেওয়া যেতে পারে, যা গাঢ় রঙের পাঞ্জাবির সাথে দারুণ মানিয়ে যায়।
কটি ও পকেট স্কয়ার : সাধারণ পাঞ্জাবির ওপর একটি সুতি বা জ্যাকার্ড ফেব্রিকের কটি যোগ করলে সাজে রাজকীয় ভাব আসে। এখনকার ট্রেন্ড অনুযায়ী পাঞ্জাবির রঙের সাথে মিলিয়ে বা বিপরীত রঙের কটি বেছে নেওয়া যায়। এ ছাড়া কটির পকেটে একটি সিল্কের পকেট স্কয়ার বা রুমাল গুঁজে দিলে আভিজাত্য আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
রোদচশমা : ঈদের সকালে নামাজে যাওয়া বা দুপুরে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় স্টাইলিশ সানগ্লাস চেহারায় গাম্ভীর্য ও আধুনিকতা নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে মুখের গড়ন অনুযায়ী ফ্রেম নির্বাচন করা জরুরি।
সুগন্ধি ও আতর : ঈদের আমেজে সুগন্ধি ছাড়া সাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কড়া পারফিউমের চেয়ে হালকা ‘উড’ বা ‘মাস্ক’ ফ্লেভারের আতর বা পারফিউম দীর্ঘক্ষণ সতেজতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। হাতের কব্জিতে এবং কানের লতির পেছনে সামান্য আতর মাখলে তার স্নিগ্ধ সুবাস সারাদিন আপনাকে সতেজ রাখবে।
হেয়ারকাট
ফ্যাশন মানে শুধু পোশাক নয়, নিজেকে পরিপাটি রাখাও। চুলের স্টাইল এবং দাড়ির সঠিক গ্রুমিং ঈদের সাজে বড় ভূমিকা রাখে। ঈদের অন্তত ৩-৪ দিন আগে চুল ও দাড়ি ট্রিম করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বর্তমানে ‘ফেড কাট’ এবং ‘স্লিক ব্যাক’ হেয়ারস্টাইল তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়। দাড়ি রাখার ক্ষেত্রে ‘লাইন আপ’ বা সুবিন্যস্ত দাড়ি ব্যক্তিত্বে গাম্ভীর্য যোগ করে।
স্কিনকেয়ার : ঈদের কয়েক দিন আগে থেকে নিয়মিত ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ঈদের সকালে চেহারায় একটা সতেজ ভাব ফুটে ওঠে।
সময়ের সাথে মানানসই স্টাইলিং টিপস
ঈদের দিনটি দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। তাই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পোশাক পরিবর্তন করা একটি স্মার্ট সিদ্ধান্ত হতে পারে।
সকাল : ঈদের সকালে হালকা রঙের সুতি বা ব্যাম্বু কটনের পাঞ্জাবি সবচেয়ে আরামদায়ক। এটি আপনাকে ফ্রেশ লুক দেবে।
দুপুর : দুপুরে ঘরের ভেতরে থাকলে আরামদায়ক টি-শার্ট বা ক্যাজুয়াল শার্ট পরা যেতে পারে। তবে অতিথি আপ্যায়নের সময় হালকা কাজের পাঞ্জাবি বা কাবলি সেট উপযুক্ত।
বিকাল : বিকালের সময়টা একটু এক্সপেরিমেন্টাল হতে পারে। ডেনিম বা চিনোসের সাথে ট্রেন্ডি শার্ট কিংবা শর্ট পাঞ্জাবি পরতে পারেন।
রাত (দাওয়াত ও অনুষ্ঠান) : রাতের জন্য তুলে রাখুন আপনার সবচেয়ে দামি এবং জমকালো পোশাকটি। সিল্কের পাঞ্জাবি বা কোটিসহ সেট আপনাকে ভিড়ের মাঝে আলাদা করে চিনিয়ে দেবে।
ফ্যাশন কেবল সময়ের সাথে বদলে যাওয়া কিছু পোশাকের সমষ্টি নয়, বরং এটি আপনার রুচি ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। তাই আপনার নির্বাচিত সাজপোশাকও হওয়া উচিত সেই আবহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিচ্ছন্ন, মার্জিত এবং স্বতন্ত্র। ফ্যাশন মানেই অন্ধ অনুকরণ নয়। আপনার রুচিসম্মত পোশাক নির্বাচন যেমন ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল করবে, তেমনি আপনার অমায়িক ব্যবহার আর হাসিমুখ উৎসবের আমেজকে করবে আরও প্রাণবন্ত। পরিপাটি সাজ আর সতেজ একচিলতে সুগন্ধি মেখে এবারের ঈদ হয়ে উঠুক আনন্দময় ও স্মৃতিমুখর।