লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১৪:২০ পিএম
বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে ভূমিক্ষয় ঘটলেও জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যাকে আরও খারাপ করে তুলছে ছবি : জাকির হোসাইন চৌধুরী
২০২৬ সালের সূচনালগ্নে বাংলাদেশ সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু নারী অধিকার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স ২০২৫-এ বাংলাদেশের ২৪তম অবস্থানে উন্নীত হওয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। বিপরীতে রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার রূঢ় বাস্তবতা।
বর্তমানে দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির ৭৪ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। শস্য উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত তাদের বিস্তৃতি। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আড়ালে লুকিয়ে আছে শ্রমের অবমূল্যায়ন, মজুরিবৈষম্য ও অধিকারহীনতার ইতিহাস। নতুন সংকট হিসেবে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। উপকূলীয় লবণাক্ততা, উত্তরাঞ্চলের খরা ও আকস্মিক বন্যায় শারীরিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশু। রাষ্ট্র নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এই উন্নয়ন টেকসই হবে না।
কৃষিতে অবমূল্যায়িত শ্রম ও মজুরিবৈষম্য
কৃষিতে নারীর অবদান কেবল আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই। শস্য উৎপাদনের ২১টি ধাপের অন্তত ১৭টিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। আলু বা ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় নারীরাই প্রধান ভরসা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪-২০২৬ প্রাক্কলনে এই হার আরও ঊর্ধ্বমুখী।
মাঠে পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরিতে নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই বৈষম্যের চিত্র বেশ প্রকট। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পেঁয়াজ ও রবি শস্য চাষে পুরুষ শ্রমিক দিনে ৬০০ টাকা পেলেও নারী শ্রমিক পান মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা; এখানে বৈষম্যের হার প্রায় ৪১ থেকে ৫০ শতাংশ। বগুড়ার মাটিডালিতে আলু উত্তোলন ও বাছাইয়ের কাজে পুরুষদের ৫০০ টাকার বিপরীতে নারীদের দেওয়া হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৈষম্য। একইভাবে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ধান ও সবজি চাষে পুরুষ পান ৫৫০ টাকা, নারী পান ২৮০ টাকা (৪৯ শতাংশ বৈষম্য)। সাতক্ষীরা উপকূলে চিংড়ি পোনা সংগ্রহে পুরুষদের ৫২০ টাকার বিপরীতে নারীদের মজুরি মাত্র ২৭০ টাকা, বৈষম্য ৪৮ শতাংশ।
পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, কৃষি শ্রমবাজারে নারীর শ্রমকে ‘সস্তা’ বিবেচনা করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বাধার কারণে মজুরিবৈষম্য দূর করার দাবিগুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। মালিকপক্ষ নারীকে শারীরিকভাবে দুর্বল বিবেচনা করে। বাস্তবে নারী মাঠে কাজের পাশাপাশি গৃহস্থালি কাজও সামলান, যার কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি জিডিপিতে নেই।
সম্পদের অধিকারহীনতা ও ভূমির মালিকানা
কৃষিতে বিশাল অবদানের বিপরীতে সম্পদের মালিকানা নগণ্য। কার্যকর কৃষি ভূমির মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ নারীর নামে রয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার আইন ও ভূমি স্বাক্ষরতার অভাব এর প্রধান কারণ। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ফসলের আয়ের ওপর নারীর অধিকার থাকে না, সিদ্ধান্ত নেন পুরুষরা। জমির দলিল না থাকায় সরকারি কৃষি কার্ড বা প্রণোদনা প্রাপ্তিতেও নারী বঞ্চিত হন।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত অভিঘাত
জলবায়ু পরিবর্তন উপকূলীয় জেলার নারীদের জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি সাতক্ষীরা, মোংলা ও কয়রা অঞ্চলের নারীদের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ফেলেছে। ২০২৫-২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই স্বাস্থ্য সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
লবণাক্ততা ও জরায়ুর সংক্রমণ : মাছের ঘের থেকে গৃহস্থালি কাজে লোনা পানির ব্যবহারে সাদাস্রাব, চুলকানি ও জরায়ুর প্রদাহ মহামারি আকার ধারণ করেছে। লোনা পানির সংস্পর্শ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে উপকূলীয় নারীদের মধ্যে জরায়ু প্রদাহ ও জরায়ু অপসারণের হার অত্যন্ত উচ্চ; প্রতি ৫ জন নারীর মধ্যে ১ জন এই সমস্যার শিকার। পানিতে লবণের উচ্চ ঘনত্বের কারণে ৭০ শতাংশের বেশি নারী চর্মরোগ ও লিকোরিয়ায় ভুগছেন।
গর্ভপাত ও প্রসবকালীন ঝুঁকি : বিশ্বব্যাংকের গবেষণা (২০২৫) অনুযায়ী, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে অকাল গর্ভপাতের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ বেড়েছে। লোনা পানি পানে গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ ও একলাম্পসিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। পরিবেশগত চাপের কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ গর্ভবতী নারী উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
প্রান্তিক নারীর টিকে থাকার লড়াই
মোংলায় বসবাসকারী রুপা দাস, যিনি দীর্ঘকাল লোনা পানিতে কাজ করায় তার জরায়ু নিচে নেমে যায়। তিন বছর যন্ত্রণার পর জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হন। মোংলা ও কয়রায় শত শত নারী আজ এই ঝুঁকিতে।
জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলায় চরবাঘবাড়িয়া গ্রামে যমুনা তীরের বাসিন্দা মর্জিনা বেগম। বন্যায় প্রতি বছর ফসল নষ্ট হয়। পুরুষের সমান খেটেও মজুরি অর্ধেক পান, ফসল ডুবলে কোনো ক্ষতিপূরণ মেলে না।
নোনা পানিতে ডুবে থাকা জমিতে জৈব সার ব্যবহার করে সবজি ও মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন খুলনার ডুমুরিয়ার সুচিত্রা রানী। সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সফল যোদ্ধা হতে পারেন। কিন্তু নেই কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা বরং নারী হওয়ার কারণে রয়েছে বাড়তি লাঞ্ছনা।
জলবায়ু পরিবর্তন ও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট
জলবায়ু পরিবর্তন শিশু-কিশোরীদের মানসিক বিকাশে বড় বাধা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় (২০২৫) দেখা যায়, বন্যাপ্রবণ বরিশালের কিশোরীদের দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতার হার ঢাকার তুলনায় বেশি।
মানসিক স্বাস্থ্যের সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে উচ্চঝুঁকি এলাকা হিসেবে বরিশালের পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। নিম্ন ঝুঁকি এলাকা ঢাকার তুলনায় বরিশালে বিষণ্নতার উপসর্গ ১১ শতাংশ বেশি (ঢাকায় ৮৮%, বরিশালে ৯৮%)। তীব্র দুশ্চিন্তার বা অ্যাংজাইটির হার ঢাকায় ৭১ শতাংশ হলেও বরিশালে তা ৮৬ শতাংশ, অর্থাৎ বৃদ্ধির হার ২১ শতাংশ। পারিবারিক নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য সবচেয়ে বেশি; ঢাকায় এটি ৬৮ শতাংশ হলেও বরিশালে ৯৭ শতাংশ নারী এই ভয়ে ভুগছেন, বৃদ্ধির হার প্রায় ৪২ শতাংশ।
দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারানো, অর্থনৈতিক সংকট, পড়াশোনা বন্ধ হওয়া বাল্যবিয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। কিশোরীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে তাৎক্ষণিক টিকে থাকাকেই বড় করে দেখছে। দুর্যোগকালে আয় কমলে নারী ও শিশুর ওপর পারিবারিক সহিংসতা বাড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তার অভাবে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা বা পিটিএসডি সৃষ্টি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বনাম স্থানীয় বাস্তবতা
জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে থাকলেও তৃণমূলের চিত্র ভিন্ন। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ১২,৭৬৯টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে। বিচার ও সাজার হার নগণ্য। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী নারীরা বেশি বঞ্চনার শিকার।
২০২৬ সালের নির্বাচনে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা অন্যতম নির্ণায়ক। নির্বাচন ঘিরে রক্ষণশীল দলগুলোর উত্থান ও নারী নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক নারী সমাজকে শঙ্কিত করেছে। নারী প্রার্থীরা অনলাইন বুলিং ও হুমকির শিকার হয়েছেন। রাষ্ট্র বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর না করলে নারীদের টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হবে।
উত্তরণের পথ
অর্থনৈতিক সমতা : কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের বৈষম্যহীন ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রকৃত নারী চাষিদের কৃষি কার্ড ইস্যু ও সরাসরি ভর্তুকি প্রদান জরুরি।
জলবায়ু ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা : উপকূলীয় অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বিনামূল্যে জরায়ু পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশুদের পৃথক কক্ষ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইনি সংস্কার : সব ধর্মের নারীর সমান অধিকার নিশ্চিতে ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’ প্রণয়ন করতে হবে। নির্যাতন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন আবশ্যক।
সামাজিক নিরাপত্তা : সংসদে সরাসরি নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। অনলাইন হয়রানি ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধে কঠোর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৬ সালের সন্ধিক্ষণে নারীর টিকে থাকার লড়াই একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও মানবিক হওয়ার মাপকাঠি। কৃষিতে ঘাম ঝরানো, উপকূলে লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করা কিংবা শহরে নিরাপত্তার অভাবে শঙ্কিত নারীর কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণীতে স্থান পেতে হবে। প্রান্তিক নারীরা ন্যায্য মজুরি ও শরীরের ওপর অধিকার ফিরে পেলেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সার্থক হবে। সময়ের দাবিÑ বিচারহীনতার অবসান, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং জলবায়ু স্থিতিস্থাপক জেন্ডার-সংবেদনশীল বাংলাদেশ গড়া।