× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারীদের ঈদ ফ্যাশন

পোশাকে গল্প ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া

সাদিয়া সিদ্দিকা

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫৬ পিএম

ছবি- সেইলর

ছবি- সেইলর

২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর এমন একসময়ে দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে, যখন আকাশে মেঘ আর রোদের খেলা। গরমের তীব্রতা আর হঠাৎ বৃষ্টির ঝাপটাÑ এই দুইয়ের মেলবন্ধন মাথায় রেখেই সাজানো হয়েছে এবারের মেয়েদের ঈদ ফ্যাশন। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এই উৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায় নতুন পোশাকে। তবে ২০২৬ সালের ফ্যাশন ট্রেন্ড কেবল পোশাকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ডিজাইনাররা এবার পোশাকে ফুটিয়ে তুলেছেন একেকটি গল্প, ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার এক অনন্য ফিউশন।

যখন মিনিমালিজমই আভিজাত্য

গত কয়েক দশকের জবরজং কারুকাজ আর অতিরিক্ত পাথর-চুমকির ব্যবহারের দিন শেষ। ২০২৬ সালের ঈদ ফ্যাশনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মিনিমালিজম বা ন্যূনতম সাজে সর্বোচ্চ আভিজাত্য। ডিজাইনারদের মতে, পোশাক এখন আর কেবল প্রদর্শনের বস্তু নয়, বরং এটি ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। এ বছর কাপড়ের গুণমান এবং বুননেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ফ্যাশনের দিকে ঝুঁকেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো।

ছবি- সেইলর 

দেশীয় ব্র্যান্ডের রাজকীয় আয়োজন

এবারের ঈদে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউসগুলো নিজেদের সাজিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে। প্রতিটি ব্র্যান্ডের রয়েছে আলাদা আলাদা থিম। 

সেইলর : সেইলরে এবার নারীদের কালেকশনে রয়েছে এনআর জ্যাকার্ড, চিকনকারি ও ব্লেন্ডেড ফ্যাব্রিকে তৈরি থ্রিপিস, গাউন, স্ট্রেট কাট, টুপিস, কুর্তি ও টপস। রঙের বৈচিত্র্যে স্থান পেয়েছে হালকা ও প্যাস্টেল টোন, ট্রান্সফরমেটিভ টিল, বেইজ, গোল্ডেন, হালকা বেগুনি, পিচ পিংক, ব্রিক, লেমন, ধূসর ও লাল।

আড়ং : আড়ং মানেই আভিজাত্য। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন হিসেবে আড়ং এবার নিয়ে এসেছে মেয়েদের জন্য বেশকিছু চমৎকার কালেকশন। শাড়ি থেকে শুরু করে মেয়েদের কুর্তি আর পাঞ্জাবির বিশেষ সমাহার দেখা যাচ্ছে এবার। তাদের প্রিমিয়াম কালেকশনে দেখা যাচ্ছে হাতে আঁকা মসলিন শাড়ি, যাতে সোনালি জরি ও রেশম সুতার সূক্ষ্ম কাজ। কামিজের কাটে এবার লং কুর্তার চেয়ে শর্ট ও মিড-লেংথ কামিজের জনপ্রিয়তা বেশি। তাদের প্রিমিয়াম কালেকশনে দেখা যাচ্ছে হাতে আঁকা মসলিন শাড়ি, যাতে সোনালি জরি ও রেশম সুতার সূক্ষ্ম কাজ। কামিজের ক্ষেত্রে আড়ং এবার লং কুর্তার চেয়ে শর্ট ও মিড-লেংথ কামিজের ওপর জোর দিয়েছে। তাদের পোশাকের মোটিফে ফুটে উঠেছে মুঘল স্থাপত্য ও বাংলার লোকজ নকশা।

ইয়োলো : তরুণ প্রজন্মের পছন্দের শীর্ষে থাকা ইয়োলো এবার নিয়ে এসেছে ফ্লোরাল ভাইবস। লিনেন ও জর্জেটের ওপর ডিজিটাল প্রিন্টের কামিজ এবং টুপিস সেটগুলো নজর কাড়ছে। বিশেষ করে ল্যাভেন্ডার, মিন্ট গ্রিন, পাউডার ব্লু এবং টি-রোজের মতো সফট পেস্টেল শেডগুলো তাদের কালেকশনের মূল আকর্ষণ।

অঞ্জন’স ও কে-ক্রাফট : ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং টাইডাইয়ের এক অনন্য মিশেল দেখা যাচ্ছে অঞ্জন’স-এ। তাদের লং প্যাটার্নের ফতুয়া ও কামিজে আদিবাসী এবং জ্যামিতিক মোটিফ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে কে-ক্রাফটের সিগনেচার এমব্রয়ডারি করা ওড়নাগুলো এবার আলাদাভাবে নজর কাড়ছে।

ছবি-সেইলর 

বিশ্বরঙ ও রঙ বাংলাদেশ : যারা উজ্জ্বল রঙের উৎসবে নিজেকে রাঙাতে চান, তাদের জন্য বিশ্বরঙ নিয়ে এসেছে ভাইব্রেন্ট কালেকশন। লাল, মেজেন্টা এবং ফিরোজা রঙের শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজে ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার পটচিত্র ও লোকশিল্প।

আরামের রাজত্ব কাফতান ও কাফতান সেট

২০২৬ সালে মেয়েদের পোশাকে কমফোর্ট স্টাইল বা আরামদায়ক আভিজাত্যই মূল কথা। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে কাফতান সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এটি বেশ ঢিলেঢালা হওয়ায় গরমে যেমন আরামদায়ক, তেমনি যেকোনো শারীরিক গড়নের মেয়েদের এতে মানিয়ে যায়। সিল্ক, মসলিন এবং ডিজিটাল প্রিন্টের কাফতানে এবার ট্যাসেল, পার্ল এবং পুঁতির কাজ বেশি দেখা যাচ্ছে। কোমরে বেল্ট দেওয়া ‘সিলুয়েট স্টাইল’ কাফতানগুলো এবার ট্রেন্ডসেটার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে রাতের দাওয়াতের জন্য ডার্ক শেডের সিল্ক কাফতানগুলো রাজকীয় লুক দিচ্ছে।

২০২৬-এর বড় পরিবর্তন কো-অর্ড সেট

এবারের ঈদের সবচেয়ে আলোচিত পোশাক হলো কো-অর্ড সেট। টপস ও প্যান্ট একই রঙের এবং একই প্রিন্টের হয়। এটি দেখতে কিছুটা ওয়েস্টার্ন ঘরানার হলেও দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো যেমন আড়ং বা ইয়োলোতে এথনিক বা লোকজ মোটিফ যোগ করে এক চমৎকার ফিউশন তৈরি করেছে। সালোয়ারের বদলে চওড়া ট্রাউজার বা ডিভাইডার প্যান্টের ব্যবহার এতে বেশি। লিনেন ও প্রিমিয়াম কটন কো-অর্ড সেটগুলো দিনের বেলার কেনাকাটা বা আড্ডারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।

কামিজ ও সালোয়ারের কাটে বিবর্তন

২০২৬ সালের ঈদে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে কামিজের দৈর্ঘ্যে। গত কয়েক বছর লং কামিজের দাপট থাকলেও এবার তরুণীরা বেছে নিচ্ছেন শর্ট কামিজ বা কুর্তি। শর্ট কামিজের সঙ্গে ঘেরওয়ালা সারারা বা গারারা প্যান্টের জোর এবার তুঙ্গে। এটি উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। এবার কামিজের বডির চেয়ে হাতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাফ স্লিভ বা ফোলা হাতা, বেল স্লিভ এবং ভিক্টোরিয়ান স্টাইল হাতা এবার ফ্যাশনে রাজত্ব করছে।

ফ্যাব্রিক যখন আভিজাত্যের মাপকাঠি

২০২৬ সালের ঈদে আবহাওয়া তপ্ত থাকার সম্ভাবনা থাকায় ফ্যাব্রিক বাছাইয়ে সবাই সতর্ক। ডিজাইনাররা এবার ভারী কাজের চেয়ে উন্নত ফ্যাব্রিককে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। থ্রিপিস বা কামিজের ক্ষেত্রে বডিতে একরঙা কাপড় এবং ওড়নায় ভারী অরগ্যানজার কাজ করা হচ্ছে। অরগ্যানজার স্বচ্ছতা ও ঔজ্জ্বল্য পোশাকে এক ধরনের বিমূর্ত আভিজাত্য নিয়ে আসে। হাতে বোনা মসলিন এবং জামদানি ফ্যাব্রিকের কুর্তি এবার উচ্চবিত্তদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। সাধারণ মানুষের জন্য আরাম নিশ্চিত করতে অর্গানিক কটন এবং মডেল ফ্যাব্রিক এবার বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে। ঘাম শুষে নেওয়ার ক্ষমতা এবং কাপড়ের ফিনিশিংÑ এই দুইয়ের কারণে তরুণীরা এবার সিল্কের চেয়ে ফিনফিনে সুতি এবং লিনেনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

শাড়িতে ঐতিহ্যের নবজন্ম

বাঙালির ঈদ শাড়ি ছাড়া অপূর্ণ। ২০২৬ সালে শাড়ির ট্রেন্ডেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। হাতে বোনা সাদা বা পেস্টেল রঙের জামদানি এবারও রাজত্ব করছে। এ ছাড়া একরঙা মসলিন শাড়ি, যার পাড়ে শুধু চিকন জরি বা সিকুইনের কাজÑ এমন শাড়িগুলোই এবার রুচিশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে যারা শাড়ি পরতে হিমশিম খান, তাদের জন্য কুঁচি করা তৈরি শাড়ি বা ‘প্রি-স্টিচড’ শাড়ি এবার দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মাত্র দুই মিনিটে পরে ফেলা যায় এই শাড়িগুলো, যা আধুনিক নারীদের পছন্দের শীর্ষে। সুতি ও লিনেন শাড়িতে এবার বড় বড় ফ্লোরাল মোটিফ এবং ডিজিটাল প্রিন্টের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে।

ওড়নায় বৈচিত্র্যই আসল ম্যাজিক

এবারের ফ্যাশনে একটি বড় চমক হলো ওড়না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কামিজ বা স্যুটটি খুব সাধারণ, কিন্তু ওড়নাটি অত্যন্ত জমকালো। বড় আকারের এমব্রয়ডারি করা ওড়না কিংবা নেট-অরগাঞ্জার কারুকাজ সাধারণ পোশাককেও আভিজাত্য দিচ্ছে। ওড়নাগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা আলাদাভাবে অন্যান্য পোশাকের সঙ্গেও অনায়াসেই পরা যায়। হাতে বোনা খাদি বা সিল্কের ওড়নাগুলো এবার আলাদাভাবে বিক্রি হচ্ছে প্রচুর।

ছবি- কে ক্র্যাফট 

রঙ ও মোটিফের খেলা

২০২৬ সালের কালার প্যালেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজাইনাররা এবার প্যাস্টেল শেড এবং আর্থি টোনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সাদা, পাউডার ব্লু, মিন্ট গ্রিন, ল্যাভেন্ডার এবং কোরাল। নকশা, পাখির অবয়ব, জ্যামিতিক রেখা এবং ট্র্যাডিশনাল ব্লক প্রিন্টের আধুনিকায়ন ঘটেছে প্রতিটি পোশাকে। কৃত্রিম রঙের বদলে ভেষজ বা ন্যাচারাল ডাইয়ের ব্যবহার এবার ফ্যাশন সচেতনদের নজর কাড়ছে।

ডিজিটাল বনাম ফিজিক্যাল

মহামারী পরবর্তী সময়ে কেনাকাটার ধরনে যে বড় পরিবর্তন এসেছিল, তা ২০২৬ সালে এসে পূর্ণতা পেয়েছে। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম লাইভের মাধ্যমে ঘরে বসে পোশাকের কাপড় ও মান দেখে অর্ডার করার প্রবণতা এবার তুঙ্গে। প্রতিটি বড় ব্র্যান্ডের নিজস্ব অ্যাপ এবং ওয়েবসাইট থেকে কেনাকাটা করলে মিলছে বিশেষ ছাড়। তবে ঈদের আমেজ নিতে যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি বা আড়ংয়ের আউটলেটগুলোতে মানুষের ভিড়ও কম নয়। অফলাইন শপিংয়ের অভিজ্ঞতা এখনও বাঙালির কাছে এক ধরনের আবেগ।

দেশের প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনারদের মতে, ২০২৬ সালের ঈদ হলো আভিজাত্যের সঙ্গে কমফোর্টের মেলবন্ধন। মানুষ এখন এমন পোশাক চায়, যা সে দীর্ঘক্ষণ পরে থাকতে পারবেন এবং যা টেকসই। কৃত্রিম রঙের বদলে ভেষজ রঙের ব্যবহার এবং দেশীয় মোটিফের আধুনিকায়নই এবারের মূলমন্ত্র।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ঈদ ফ্যাশন যেন এক নতুন পরিকলাপনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেখানে ঐতিহ্যের শেকড় শক্ত থাকলেও ডালপালা মেলেছে আধুনিকতার আকাশে। আপনি যদি নিজেকে ভিড়ের মাঝে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে চান, তবে এবারের ঈদে আপনার পছন্দ হতে পারে একটি শর্ট কুর্তি আর সারারা সেট অথবা একটি আভিজাত্যপূর্ণ হাতে বোনা মসলিন শাড়ি। যেটাই বেছে নিন না কেন, আরাম আর আত্মবিশ্বাস যেন থাকে আপনার সঙ্গী।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা