আফসানা মিমি
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৪৭ পিএম
রমজান মাস আত্মসংযম, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সময়। কিন্তু কর্মজীবী নারীদের জন্য এ মাসটি অনেক সময় বাড়তি চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। ভোরে সেহরি প্রস্তুত করা, দিনের বেলা অফিসের দায়িত্ব পালন, সন্ধ্যায় ইফতার ও রাতের খাবারের আয়োজনÑ সব মিলিয়ে সময় ও শক্তির ওপর চাপ পড়ে। এই ব্যস্ততার ভিড়ে নিজের পুষ্টি ও বিশ্রামের বিষয়টি অবহেলিত হলে ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, গ্যাস্ট্রিক, মাথাব্যথা বা কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সেহরি ও ইফতারি যদি পরিকল্পিতভাবে সাজানো যায়, তবে কর্মজীবী নারীরা সহজেই সুস্থ ও সক্রিয় থেকে রোজা পালন করতে পারেন।
সেহরি : সারা দিনের শক্তির ভিত্তি
সেহরি বাদ দেওয়া বা খুব কম খেয়ে নেওয়া অনেকের অভ্যাস। কিন্তু এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সেহরি হলো দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার আগে শেষ পুষ্টিকর খাবার, যা সারা দিনের শক্তি জোগায়। তাই সেহরিতে সুষম খাদ্য থাকা জরুরি।
খাদ্যতালিকায় জটিল শর্করা রাখা উচিত- যেমন লাল চালের ভাত, আটার রুটি, ওটস বা সুজি। এগুলো ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি দেয়। সঙ্গে প্রোটিন যেমন ডিম, ডাল, ছোলা, মাছ বা মুরগি থাকলে ক্ষুধা কম লাগে এবং পেশিশক্তি বজায় থাকে। আঁশসমৃদ্ধ সবজি ও সালাদ হজমে সহায়ক এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।
অতিরিক্ত তেল-ঝাল বা ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। এগুলো তৃষ্ণা বাড়ায় এবং অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। সেহরিতে অন্তত দুই থেকে তিন গ্লাস পানি পান করা উচিত। কেউ চাইলে দই, কলা বা লেবু পানি রাখতে পারেন; যা শরীরকে সতেজ রাখে। অতিরিক্ত চা বা কফি না খাওয়াই ভালো, কারণ ক্যাফেইন শরীরের পানি কমিয়ে দিতে পারে।

ইফতার : সংযম ও ভারসাম্যের চর্চা
সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতার একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। তবে এই আনন্দ যেন অতিরিক্ত ভোজনের দিকে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ইফতার শুরু করা যেতে পারে খেজুর ও পানি দিয়ে। খেজুর দ্রুত শক্তি জোগায় এবং শরীরকে চাঙ্গা করে। এর পর ফল, ছোলা, অল্প পরিমাণ বুট, চিড়া-মুড়ির স্বাস্থ্যকর মিশ্রণ বা ডাল-স্যুপ রাখা যেতে পারে। ভাজাপোড়া আইটেম পুরোপুরি বাদ দেওয়া না গেলেও সীমিত পরিমাণে খাওয়াই উত্তম। অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার পেটে অস্বস্তি সৃষ্টি করে এবং রাতে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। মাগরিবের নামাজের পর হালকা ও পুষ্টিকর রাতের খাবার গ্রহণ করা ভালো। ভাত বা রুটির সঙ্গে ডাল, সবজি ও প্রোটিন-সমৃদ্ধ একটি পদ থাকলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়। খুব ভারী বা মসলাদার খাবার পরদিনের সেহরি পর্যন্ত অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
পানিশূন্যতা রোধে সচেতনতা
রমজানে পানিশূন্যতা একটি সাধারণ সমস্যা, বিশেষ করে যারা সারা দিন বাইরে কাজ করেন তাদের জন্য। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ধীরে ধীরে পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন। একবারে অনেক পানি না খেয়ে সময় ভাগ করে পান করলে শরীর তা ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে।
ডাবের পানি, লেবু পানি বা ফলের প্রাকৃতিক রস শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক। তবে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো। ক্যাফেইন কমিয়ে দিলে শরীরের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে।
চাপ কমাতে আগাম পরিকল্পনা
কর্মজীবী নারীদের জন্য সময় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহের শুরুতে একটি সহজ খাদ্যতালিকা তৈরি করলে প্রতিদিন কী রান্না হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমে যায়। ছুটির দিনে কিছু উপকরণ কেটে রাখা, ডাল সেদ্ধ করে রাখা বা মাংস-মাছ প্রস্তুত করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে কর্মদিবসে সময় বাঁচে।
সেহরির টেবিল আগের রাতেই গুছিয়ে রাখা, পানির বোতল ভরে রাখা বা প্রয়োজনীয় উপকরণ হাতের কাছে রাখা সকালে তাড়াহুড়ো কমায়। পরিবারের সদস্যদের ছোট দায়িত্ব ভাগ করে দিলে কাজের চাপ অনেকটাই হালকা হয়।
বিশ্রাম ও মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব
পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তিও জরুরি। রাতে খুব দেরি করে কাজ করলে বা পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিলে পরদিন অফিসে মনোযোগ কমে যায়। তাই সময়মতো ঘুমানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন। নিজের যত্ন নেওয়াকে অবহেলা করা উচিত নয়। সুস্থ শরীর ও মন থাকলে ইবাদত, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রÑ সব জায়গায় সমানভাবে দায়িত্ব পালন করা সহজ হয়।
রমজান সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। কর্মজীবী নারীদের জন্য এই সংযমের চর্চা খাবার ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেহরি ও ইফতারির সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত পানি পান, আগাম প্রস্তুতি ও পরিবারের সহযোগিতায় ব্যস্ততার মাঝেও একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও প্রশান্ত রমজান কাটানো সম্ভব। সামান্য সচেতনতা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাই হতে পারে কর্মজীবী নারীদের জন্য সফল রমজানের চাবিকাঠি।