রওনক জাহান পুষ্প
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৩৯ পিএম
একসময় ইফতার ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক, একসাথে বসা, রান্নাঘরের ব্যস্ততা, টেবিল সাজানোÑ সব মিলিয়ে এক অন্তরঙ্গ সময়। দিনের শেষে সবার একত্র হওয়া, মায়ের রান্নাঘরের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, আর আজানের অপেক্ষায় নিঃশব্দ বসে থাকা- এ সবই ছিল ইফতারের স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জীবনের ব্যস্ততা ইফতারকে ঘরের দেয়াল পেরিয়ে বাইরে নিয়ে এসেছে। এখন অনেকেই ইফতার করে অফিসের সহকর্মীদের সাথে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে, কিংবা আত্মীয়দের সাথে কোনো রেস্টুরেন্টে বসে। কাজিন বা বান্ধবীদের সাথে নিয়ে গ্রুপ ইফতার করা বা কারো বাসায় নিজেরা অ্যারেঞ্জ করা এখন খুবই জনপ্রিয়। তাই আজ থাকছে এমন কিছু আইডিয়া, যা আপনার পরবর্তী ইফতার আউটিংকে রঙিন করে তুলবে আর আলাদা মাত্রা যোগ করবে।
খোলা জায়গায় ইফতার আয়োজন
সোশ্যাল মিডিয়া ও পিন্টারেস্টে প্রায়ই দেখা যায় অল্প কিছু বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় বা প্রিয়জনদের নিয়ে খোলা কোনো মাঠে বা ওপেন স্পেসে ইফতার করার আইডিয়া। অল্প আয়োজনে নিজেদের মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে ইফতার করা যায়। একটি চাদর, কিছু লাইট, সামান্য সাজসজ্জা- এইটুকুই যথেষ্ট। সুন্দর একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয় ও এতে সম্পর্কও ভালো হয়। সাধারণত গ্রামের বাড়িতে উঠানে এরকম ইফতার আয়োজন করা যায়। এ রকম কোনো জায়গা না থাকলে বিভিন্ন পার্ক বা রেস্টুরেন্টে অনেক সময় এমন আয়োজনের সুযোগ থাকে। ঢাকায় এয়ার ফোর্স বেস ক্যাম্পে এ ধরনের আয়োজন করা হয়। খোলা আকাশের নিচে বসে ইফতার করা শুধু আড্ডার জন্যই নয়, বরং মানসিক প্রশান্তির জন্যও বিশেষ ভূমিকা রাখে।
বাসার ছাদে ছোট্ট আয়োজন
ইন্টিমেট আউটিংয়ের জন্য অনেকেই বাইরে বের হতে চান না, ইফতারের আগে বাইরে যেতে স্বস্তিবোধ করেন না। তাদের জন্য একটা ভালো আইডিয়া হতে পারে বাসার ছাদে ইফতার আয়োজন করা। এখন সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ জনপ্রিয় বাসার ছাদে নিজেদের মতো করে ইফতার আয়োজন। বাসা থেকেই সাজানোর জিনিস নেওয়া যায় এক্ষেত্রে। ছোট ছোট লাইট, মোমবাতি, ছোট শোপিস দিয়ে সাজাতে পারেন। চাইলে কুশন, কার্পেট বা ছোট টেবিল ব্যবহার করে পরিবেশটাকে আরও আরামদায়ক করা যায়। বাজেটের মধ্যে সুন্দর একটা আয়োজনে ইফতার করা আর প্রিয়জনের কাছাকাছি থাকার চেয়ে সুন্দর উপায় আর কী হতে পারে! শহরের কোলাহলের মাঝেও এই ছোট আয়োজন এক ধরনের ব্যক্তিগত শান্তি এনে দেয়।

চাঁদরাত স্পেশাল ইফতার-মেহেদি আয়োজন
এই ধরনের প্ল্যান সাধারণত চাঁদ রাতে আত্মীয়স্বজনকে সাথে নিয়ে করা যায়, তবে এখন অনেকেই মেহেদির গাড় রঙের জন্য আগেই মেহেদি পরে ফেলেন, সেক্ষেত্রে রোজার শেষভাগেও করা যায়। নিজের বাসায়, কাজিন অথবা বান্ধবীর বাসায় যেকোনো জায়গাতেই করা যায় এমন আয়োজন। মেহেদি, ইফতার, একটু বিশেষ নাস্তা, হালকা সাজগোজ, ছবি-ভিডিও সব মিলিয়ে বেশ উৎসবমুখর একটা পরিবেশ হতে পারে। অনেকেই মেহেদির ডালা, ফুল, ছোট ছোট গেম যেমন লুডো, উনো এসবের ব্যবস্থাও করেন। এতে ইফতার সন্ধ্যাটি ধীরে ধীরে উৎসবের আবহে রূপ নেয়।
পটলাক ইফতার
পটলাক বা ওয়ান ডিশ পার্টি বাইরের দেশগুলোতে বেশ জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এখনও অতটা পরিচিত নয়। এ ধরনের আয়োজনে নিমন্ত্রিতরা প্রত্যেকে একটা করে খাবারের আইটেম নিয়ে আসেন। অনেকটা পিকনিকের মতো, যেখানে সবার সমান অংশগ্রহণ থাকে, আবার একজনের ওপর বেশি চাপও পড়ে না। ইফতারে এ ধরনের আয়োজন করলে রোজা রেখে বেশি আয়োজন করার চাপটা থাকে না, আবার কাছের মানুষদের সাথে সুন্দর একটা সময় কাটানো যায়। বাসায় হালকা ডেকোরেশন বা সামান্য আয়োজনেই করা যায় পটলাক ইফতার। এতে প্রস্তুতির আনন্দও সবার মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
ছোট সদস্যদের ইফতার
প্রায় সবার বাসাতেই পরিবারের ছোট সদস্যদের রোজা রাখা আর ইফতার নিয়ে আলাদা আয়োজন থাকে। তাই এমনভাবে একদিন আয়োজন করা যায়, যেখানে তারাই থাকবে আয়োজনের মধ্যমণি। তাদের বন্ধুবান্ধব নিয়ে পিকনিকের মতো আয়োজন অথবা তাদেরকেই আয়োজন করতে দিয়ে বড়রা সাহায্য করা, ছোটদের মধ্যে আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাদের পছন্দের খাবার রাখা, সম্ভব হলে অল্প ডেকোরেশন করা, খেলার ছলে বা গল্পের মধ্য দিয়ে তাদের উৎসাহিত করার আয়োজন করা যায়। এতে তাদের মনে যেমন রোজা রাখার প্রতি আগ্রহ আসবে, সুন্দর একটা সময়ও কাটবে সবাই মিলে।
থিম-বেজড ইফতার
থিম-বেজড ইফতার আয়োজনও হতে পারে একটি নতুন সংযোজন। নির্দিষ্ট কোনো রঙ বা সাজের ধারণা নিয়ে পুরো আয়োজনটি সাজানো যায়। যেমনÑ প্যাস্টেল, ফুলেল বা ঐতিহ্যবাহী থিম। সবাই চাইলে সেই অনুযায়ী পোশাক পরতে পারেন। এতে পুরো আয়োজনটি আরও নান্দনিক হয়ে ওঠে এবং ছবি বা স্মৃতির জন্য বিশেষ হয়ে থাকে।
সময় বদলেছে, জীবনের ধরন বদলেছে। তবুও ইফতার এখনও মানুষকে একত্রে বসার একটি সুন্দর উপলক্ষ করে দেয়। ঘরের ভেতর থেকে ছাদে, ছাদ থেকে খোলা আকাশের নিচেÑ ইফতার আয়োজনের ধরন বদলালেও এর মূল অনুভূতি একই থাকে, একসাথে থাকা। সামান্য পরিকল্পনা আর আন্তরিকতাই পারে এই সময়টুকুকে আরও বিশেষ করে তুলতে। কারণ শেষ পর্যন্ত ইফতার শুধু খাবার নয়, এটি স্মৃতি তৈরির একটি উপলক্ষ।