সেই ১৩৫৯ বঙ্গাব্দের কথা! আজ থেকে ৭৩ বছর আগে ইন্দিরা দেবী ‘সাত সমুদ্দুর’ নামে একটি পূজা-সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে রাধারাণী দেবীর লেখা একটি কিশোর কবিতা প্রকাশ পেয়েছিল। সেটিই আবার পড়ি…
রাধারাণী দেবী
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১১:৩০ এএম
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১১:৩১ এএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক, দশম শ্রেণি, ভিকারুননিসা, নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
প্রাচীন কালের গল্প এটা, শকদ্বীপের কথা।
শান্তি ছিল তখন দেশে, চিত্তে প্রসন্নতা॥
এক যে ছিলেন মস্ত রাজা রাজ্য ভুবনজোড়া।
তার ছিল এক দুধের বরণ সোনার কেশর ঘোড়া ॥
তেমন ঘোড়ার জোড়াই নাকি তিন ভুবনে নাই।
‘ঘোড়ার রাজা’ নাম ছিল তাই রাজার ঘোড়ার ভাই।
মানুষ-ভাষায় ‘ঘোড়ার রাজা’ কইতো কথা বলে
সপ্ত সাগর পেরিয়ে মানুষ আসতো দলে দলে
দেখতে সোনার কেশরওলা মানুষ-ভাষী ঘোড়া।
নজর দিতো রত্ন মোহর ফলের ফুলের তোড়া ॥
রাজার ঘোড়া ‘ঘোড়ার রাজা’র যত্ন আদর কত।
সোনার ডাবায় খাবার সে খায় জামাইবাবুর মত ॥
আস্তাবলে আতর গোলাপ, চন্দনধূপ জ্বলে।
মাথায় হীরের পালখ্ চূড়ো, মোতির মালা গলে ॥
আশের পাশের নানান্ দেশের অনেক রাজার দল
‘ঘোড়ার রাজা’য় পাওয়ার লোভে সর্বদা চঞ্চল ॥
কিন্তু ঘোড়া আনতে কেড়ে হয় না সাহস কারো।
কারণ রাজার সৈন্য আছে ওদের চেয়েও আরও ॥
শেষ কালে কী করলে জানো? সাতরাজাতে মিলে
‘দাও ঘোড়া, নয় যুদ্ধ করো, পত্র লিখে দিলে ॥
পত্র পেয়েই ‘ঘোড়ার রাজা’র রাজার হলো ভয়।
মন্ত্রণাগার গুপ্তঘরে ছিলেন মন্ত্রীচয়॥
সেই নিমেষেই স্বয়ং সেথায় হাজির হলেন গিয়ে।
সেনাধ্যক্ষ বীরবাহাদুর সঙ্গে তাকে নিয়ে ॥
মন্ত্রীরা ক’ন্Ñ‘এই বিপদে তোমার কি মত্ বীর?
বীর বাহাদুর বলেনÑ‘রাজা, যুদ্ধ করাই স্থির ॥
কেবল আমার এক নিবেদন, Ñ ‘ঘোড়ার রাজা’য় চড়ে
সপ্তরথীর সঙ্গে একাই আসতে পারি লড়ে ॥
চাইনে আমি সৈন্য সাবুদ, কিংবা হাতী রথ।
সাত রাজাকেই মারবো একাই মেষের শাবকবৎ’ ॥
বলেন রাজা ‘আমার ঘোড়া তোমায় দিলাম আজ।
যাও এখনি বীরবাহাদুর চড়াও সমর সাজ ॥
বীর বটে এই বীরবাহাদুর একলা ঘোড়ায় উঠে
সাত রাজাদের শিবির পানে আপনি গেলেন ছুটে ॥
ভীষণ রণে ছ’জন রাজা বন্দী হলেন হেরে;
সপ্তমটির বেলায় ওরা দিলেন ঘোড়া মেরে॥
সেনাধ্যক্ষ বীরবাহাদুর হতাশ হবার নয়।
নিজের ঘোড়া নিয়েই লড়েন, নাইকো কোনো মনে ভয় ॥
‘ঘোড়ার রাজা’ বললে তখন বীরবাহাদুর শোনো।
মরিনি ভাই, জখম আমি, ভয় নেইকো কোনো ॥
আমায় নিয়েই যুদ্ধে চলো, চড়ো আমার পিঠে।
অন্য ঘোড়ার সাধ্য কোথায় ডিঙোয় ওদের ভিটে ॥
সপ্তম রাজ যোদ্ধা ভীষণ, শেষ-রাখা-ভার তাঁর।
ওঁর কাছে কেউ খুব সহজে পায়না বড়ো পার ॥

বীরবাহাদুর যত্নে তখন ‘ঘোড়ার রাজা’য় তুলে
ক্ষতস্থানে লাগিয়ে ওষুধ বাঁধন দিলেন খুলে ॥
সুস্থ করে নিয়েই আবার গেলেন ছুটে রণে।
লড়াই হলো ভীষণতর সপ্তম রাজ সনে ॥
হারিয়ে দিলে বীরবাহাদুর ‘ঘোড়ার রাজা’র গুণে।
বন্দী করে আনলে তাঁরেও; রাজন্ এ সব শুনে
বুকের মাঝে নিলেন টেনে বীরবাহাদুর বীরে।
আদর করে দিলেন চুমু ‘ঘোড়ার রাজা’র শিরে ॥
অশ্ব তখন বললেÑ রাজন্ দাওহে আমায় দান।
যুদ্ধে তোমার পরাস্ত এই সাতটি রাজার প্রাণ ॥
শপথ এরা করছে প্রভু ভবিষ্যতেও আর
করবেনা কেউ হিংসা বিরোধ যুদ্ধ অনাচার ॥
সেনাধ্যক্ষ বীরবাহাদুর যোদ্ধা চমৎকার।
যুদ্ধজয়ের বিজয়মুকুট ওঁরই পুরস্কার ॥
এখন থেকে রাজ্যে প্রভু শান্তি রেখো স্থির।
হিংসা ছেড়ে সৈন্যরা হোক্ বিশ্বপ্রেমিক বীর ।।
এই বলে ভাই ‘ঘোড়ার রাজা’ পড়লো রাজার পায়ে।
যুদ্ধশ্রমে ক্লান্ত, ক্ষত, রক্ত ঝরে গায়ে ৷৷
প্রাণবায়ু তার বিলীন হল, স্বর্গে গেল চলে।
অশ্রুজলে সিক্ত রাজা নিলেন তারে কোলে ৷৷
রাজ আদেশে তৈরী হল ঘোড়ার স্মৃতি-মঠ।
দেখতে এসে ভক্ত ঢালেন শ্রদ্ধা সজল ঘট ৷৷
এই ঘোড়াটিই পরের কোন্ এক জন্মে নাকি শুনি।
বিশ্বে হ’লেন বিশ্বখ্যাত শাক্য বুদ্ধ মুনি ৷৷