আবেদীন জনী
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১১:১৩ এএম
আঁকা : মেহেরুন্নিসা, অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
শিয়ালনেতা হুক্কা। মিটিং ডাকল বনে। জড়ো হলো হাজার হাজার শিয়াল। মিটিং পরিণত হলো শিয়ালসমুদ্রে। তরুণ শিয়ালনেতা হুক্কা বক্তব্য রাখল। বলল, আমি রাজা হতে চাই। বনের রাজা। শিয়ালবংশের কেউ আজ পর্যন্ত রাজা হতে পারেনি। রাজা হয়ে আমি ইতিহাস সৃষ্টি করব। পৃথিবীজুড়ে শিয়ালবংশের সুনাম ছড়িয়ে দেব। সবার জারা শিয়ালেরা খুব চালাক। ওদের পেটে সাত ছালা বুদ্ধি। চালাক ও বুদ্ধিমান শিয়ালের গল্প পড়ে পড়ে কত বোকাসোকা মানুষ বুদ্ধিমান হয়ে গেল, অথচ আমরা পেছনেই পড়ে আছি। একটা শিকার ধরে আনলেও সিংহ-বাঘ-ভালুকদের ভাগ দিতে হয়। আর কখনও দেব না। সব বুনো ফলমূল আমরাই মজা করে খাব, হিঃ হিঃ হিঃ!
হুক্কার কথায় শিয়ালেরা খুব খুশি। হুক্কাহুয়া ডেকে ডেকে, লেজ নেড়ে নেড়ে সমর্থন করল সবাই। শুধু একটা বুড়ো শিয়াল বলল, বনের রাজা হচ্ছে সিংহ। বনে আছে আরও অনেক ভয়ংকর ভয়ংকর, বড় বড় প্রাণী। বাঘ। ভালুক। হাতি। এদের সামনে শিয়ালবংশ থেকে রাজা হবে ক্যামনে? আমি তো কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না।
হুক্কা বলল, উপায় আমার ভালোই জানা আছে। বুদ্ধির জোরেই পথের কাঁটা সরাব। সিংহ, বাঘ, ভালুক ও হাতিকে বন থেকে তাড়াতে পারলেই কেল্লাফতে।
ভাবুক শিয়াল বুড়ো সতর্ক করে বলল, সাবধান, এ কাজ করা ঠিক হবে না। সিংহ, বাঘ, ভালুক ও হাতিকে তাড়িয়ে দিলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। একসময় হয়তো বনটাই থাকবে না।
শিয়াল বুড়োর কথা শুনে সবাই হিঃ হিঃ হিঃ করে হাসল। শিয়াল নেতা হুক্কাও বুড়োর কথার গুরুত্ব দিল না। তাচ্ছিল্য করে বলল, বুড়ো হয়ে গেলে জ্ঞানবুদ্ধিও বুড়ো হয়ে যায়!
রাজা হওয়ার কাজ শুরু করে দিল হুক্কা।
প্রথমে এক ছালা বুদ্ধি খাটিয়ে বন থেকে সিংহদের তাড়িয়ে দিল। রইল বাকি বাঘ, ভালুক ও হাতি।
আরেক ছালা বুদ্ধি খাটিয়ে বাঘদের তাড়িয়ে দিল। রইল বাকি ভালুক ও হাতি।
আরেক ছালা বুদ্ধি খাটিয়ে ভালুকদের তাড়িয়ে দিল। বাকি রইল শুধু হাতি।
আরেক ছালা বুদ্ধি খাটিয়ে হাতিদের তাড়িয়ে দিল। বনে রয়ে গেল শুধু শিয়াল আর ছোট ছোট প্রাণী।
সাত ছালা বুদ্ধির মধ্যে শেষ হয়ে গেল চার ছালা। রইল বাকি তিন ছালা।
তারপর বনে শুরু হলো নির্বাচন। রাজা হওয়ার জন্য নির্বাচনে দাঁড়াল শিয়াল। নির্বাচনে দাঁড়াল খরগোশ। আরও দাঁড়াল বনবিড়াল ও বেজি। আরও এক ছালা বুদ্ধি খরচ করে নির্বাচনে খুব সহজেই জয়ী হলো শিয়াল। তার মানে রাজা নির্বাচিত হলো শিয়ালনেতা হুক্কা।
রইল বাকি দুই ছালা বুদ্ধি। হুক্কা সিদ্ধান্ত নিল, এই দুই ছালা বুদ্ধি দিয়েই রাজ্য চালাবে।
রাজা হয়ে আনন্দে ভোজসভার আয়োজনের ঘোষণা দিল হুক্কা। এজন্য দশ জোড়া ছাগল ধরে আনার হুকুম দেওয়া হলো। যেই হুকুম, সেই কাজ। শিয়ালেরা ছাগল ধরতে বেরিয়ে পড়ল মাঠে। যেই ছাগল ধরতে গেল, অমনিই ধর ... ধর... ধর আওয়াজ করতে করতে লাঠিসোটা নিয়ে ধেয়ে এলো অসংখ্য মানুষ। শিয়ালেরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে লাগল বনের দিকে। মানুষও পেছনে পেছনে দৌড়াতে লাগল। মুহূর্তেই শিয়ালগুলো বনের ভেতর ঢুকে পড়ল। তবুও মানুষেরা থামল না। তারাও নির্ভয়ে ঢুকে গেল বনের ভেতর। তছনছ করে ফেলল শিয়ালদের আস্তানা। এমনকি শিয়াল রাজা হুক্কার বাড়িতেও হামলা চালাল। সেদিনের মতো শিয়ালেরা এ ঝোপে ও ঝোপে লুকিয়ে বাঁচল।
কিন্তু সমস্যা হলো, এখন মুরগি-ছাগল ধরতে গেলেই মানুষেরা তাড়া করতে করতে গভীর বন পর্যন্ত চলে আসে। শিয়াল সামনে পেলেই পিটুনি দেয়। কিছুদিন পর শুরু হলো নতুন বিপদ। বনের গাছ কাটা শুরু করে দিল মানুষ। কাটতে কাটতে বনের গাছ শেষ হয়ে যেতে লাগল। এভাবে চলতে থাকলে পুরো বনটাই উজাড় হয়ে যাবে।
শিয়ালসহ বনের অন্য বাসিন্দারা চিন্তায় পড়ে গেল। একদিন সবাই রাজার কাছে গেল। বলল, এখন কী হবে রাজা? বন না থাকলে আমরা থাকব কোথায়? খাব কী? মানুষ যেরকম হিংস্র হয়ে উঠেছে, যেকোনো সময় জীবনও চলে যেতে পারে। আপনি সবাইকে বাঁচান, হে রাজা মশাই!
শিয়াল রাজা হুক্কা মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবতে লাগল। ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পেল না।
এমন সময় এলো সেই শিয়াল বুড়ো। বলল, আমরা আজ যে বিপদে পড়েছি, এজন্য একমাত্র রাজাই দায়ী। আমি আগেই বলেছিলাম, বনে সিংহ-বাঘ-ভালুক ও হাতি না থাকলে আমাদেরই ক্ষতি হবে। হয়তো বনটাই থাকবে না। ঠিক তাই হলো। আগে সিংহ-বাঘ-ভালুক ও হাতিদের ভয়ে বনে ঢুকত না মানুষ। মুরগি-ছাগল ধরে আনলেও বনে এসে শিয়াল-বনবিড়ালদের ধাওয়া করার সাহস পেত না। কিন্ত এখন সাহস পাচ্ছে। গাছ কাটতে কাটতে উজাড় করে ফেলছে বন। এখন আমরা কীভাবে বাঁচব, কী খাব, কোথায় থাকব, সেকথা রাজাকেই বলতে হবে।
সবাই চেঁচিয়ে বলল, তাই তো, তাই তো, শিয়াল বুড়ো ঠিক কথাই বলেছেন!
নিজের দোষ স্বীকার করে শিয়াল রাজা হুক্কা ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে বলল, হে পণ্ডিত শিয়াল বুড়ো, আপনার কথা না শুনে আমি ভুল করেছি। আপনি আমাদের বাঁচান।
শিয়াল বুড়ো বলল, আর একটুও বিলম্ব নয়, বাঁচতে হলে অতি দ্রুত সিংহ-বাঘ-ভালুক ও হাতিদের বনে ফিরিয়ে আনতে হবে।
সব শিয়াল একসাথে বলল, তাই তো, তাই তো, শিয়াল বুড়োর কথাই ঠিক।