× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঈদ ফ্যাশন

সবার আগে শিশুরা

মাহবুবা মিতু

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম

সবার আগে শিশুরা

মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ, যা প্রতি বছরই আমাদের মাঝে নিয়ে আসে অনাবিল আনন্দ আর নতুনত্বের বার্তা। এই উৎসবের প্রাণকেন্দ্রেই থাকে শিশুরা; যাদের উচ্ছ্বাস আর নতুন পোশাকের ঝলকানিতে ঈদ পায় এক ভিন্ন পূর্ণতা। বড়দের তুলনায় বাচ্চাদের ঈদের পোশাক নির্বাচনে বরাবরই একটি ভিন্নধর্মী আমেজ এবং বিশেষ সতর্কতা লক্ষ করা যায়। এখনকার শিশুরা শুধু পোশাক পরে না, তারা নিজস্ব স্টাইল এবং স্বাচ্ছন্দ্যও বোঝে। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে ফ্যাশনের ভাষা, আর সেই হাওয়ায় নতুন রূপ পেয়েছে খুদেদের ফ্যাশন জগৎও। এবারের ঈদের বাজারে কাটিং, প্যাটার্ন আর ফেব্রিকের বৈচিত্র্যে ছোটদের পোশাকে এসেছে এক রাজকীয় আভিজাত্য। উৎসবের জৌলুস বজায় রেখে শিশুদের কোমল ত্বকের কথা মাথায় রেখে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে আরামদায়ক সুতি, লিনেন এবং অর্গানজা কাপড়ের ওপর। ঐতিহ্যের মোহনীয় ছোঁয়া আর আধুনিক ফিউশনের মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এবারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কালেকশন। যেখানে এমব্রয়ডারি, হাতের কাজ এবং উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার শিশুদের ঈদ ক্যানভাসকে করেছে আরও বর্ণিল। স্টাইল আর ফেস্টিভ ভাইবের এই অপূর্ব সমন্বয় এবারের ঈদকে শিশুদের জন্য করে তুলবে আরও স্মরণীয়।

মেয়ে শিশুদের পোশাক

মেয়ে শিশুদের পোশাক মানেই যেন রঙের এক বিশাল সমারোহ। তবে এবারের নকশায় কেবল কারুকাজ নয়, বরং ভলিউম ও কাটিংকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

ফ্রক ও গাউনের আভিজাত্য : লেয়ারড ফ্রক বা ফ্লাফি গাউন বরাবরই ছোট মেয়েদের প্রথম পছন্দ। তবে এবার যোগ হয়েছে ‘অর্গানজা ড্রামাটিক স্লিভস’ হাতার নকশায় পাফ বা বেল স্লিভস; যা ছোটদের লুকে এক ধরনের ভিক্টোরিয়ান আভিজাত্য এনে দিচ্ছে। থ্রিডি ফ্লোরাল অ্যাপ্লিক (কাপড়ের ওপর আলাদা করে বসানো ফুল) এবং মুক্তার কাজ করা গাউনগুলো এবার আভিজাত্যের শিখরে। বিশেষ করে হালকা রঙের নেট বা টিস্যু কাপড়ের স্তরে স্তরে সাজানো ফ্রকগুলো শিশুদের একেকজন ছোট্ট রাজকন্যার মতো ফুটিয়ে তুলবে।

শারারা, ঘারারা ও লেহেঙ্গা :  কয়েক বছর ধরে বড়দের ফ্যাশনে শারারা বা ঘারারা ইনট্রেন্ড থাকলেও এবার তা ছোটদের পোশাকেও আধিপত্য বিস্তার করছে। লিনেন বা জামদানি মোটিফের শর্ট কামিজের সঙ্গে ঘেরওয়ালা ঘারারা আর মাথায় একটি ছোট্ট টায়রা ব্যস, তৈরি খুদে নবাবজাদী! লেহেঙ্গার ক্ষেত্রে এবার খুব বেশি ভারী কাজ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। পরিবর্তে হালকা এমব্রয়ডারি ও ব্লক প্রিন্টের ব্যবহার বেশি, যাতে শিশুরা সহজেই তা বহন করতে পারে।

কাফতান ও কো-অর্ড সেট : স্মার্ট ও ক্যাজুয়াল লুকের জন্য এবার কাফতান ব্যাপক জনপ্রিয়। সিল্ক বা ক্রেপ সিল্কের ওপর ডিজিটাল প্রিন্ট করা কাফতানগুলো যেমন আরামদায়ক, তেমনি স্টাইলিশ অন্যদিকে একই রঙ ও প্রিন্টের টপ ও প্যান্ট (কো-অর্ড সেট) এবার বিদেশের বাজারের মতো এদেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোয়ও জায়গা করে নিয়েছে।

ছেলে শিশুদের ফ্যাশন

ছেলেদের ফ্যাশন এখন আর কেবল টি-শার্ট আর জিন্সে সীমাবদ্ধ নেই। পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে ফরমাল স্যুট সবখানেই এসেছে আভিজাত্য ও রুচির ছোঁয়া।

পাঞ্জাবিতে কাটিংয়ের খেলা : ছেলেদের ঈদের মূল আকর্ষণ পাঞ্জাবি। এবার পাঞ্জাবিতে অপ্রতিসম কাটিং সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। সাধারণ সোজা কাটের বদলে একপাশে বোতাম বা ভিন্ন রঙের কাপড়ের প্যানেল ব্যবহার করে আনা হয়েছে মডার্ন লুক। কলার এবং বুকে হালকা কম্পিউটার এমব্রয়ডারি বা মেটাল বোতামের ব্যবহার এখনকার খুদে ফ্যাশনিস্তাদের বেশ টানছে। রঙের ক্ষেত্রে নেভি ব্লু, বটল গ্রিন এবং মেরুনের পাশাপাশি এবার হালকা হলুদ ও পেস্টেল রঙের পাঞ্জাবির জয়জয়কার।

কটি বা ওয়েস্ট কোটের ম্যাজিক : একটি সাধারণ পাঞ্জাবির ওপর সুন্দর একটি কটি পুরো লুকই বদলে দেয়। জ্যামিতিক নকশা, ফ্লোরাল প্রিন্ট বা একরঙা কটি এবার বাজারে রাজত্ব করছে। বিশেষ করে বাবা ও ছেলের একই রঙের বা ডিজাইনের কটি পরার ট্রেন্ডটি এবারও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এটি যেমন আভিজাত্য বাড়ায়, তেমনি উৎসব আমেজকে আরও গাঢ় করে।

ক্যাজুয়াল ও ফরমাল ফিউশন : যারা পাঞ্জাবির বাইরে আরাম খুঁজতে চায়, তাদের জন্য রয়েছে লিনেন শার্ট ও চিনোস প্যান্ট। বেইজ, খাকি বা অলিভ গ্রিন রঙের প্যান্টের সঙ্গে হালকা রঙের হাফহাতা শার্ট ছোটদের বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন দেখায়। এ ছাড়া এবার সেমি-ফরমাল ব্লেজার বা মোদি কোটের চাহিদাও দেখা যাচ্ছে বিকালের আড্ডা বা রাতের দাওয়াতের জন্য।

ফেব্রিক ও টেক্সচার 

শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো আরাম। ঈদের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া, খেলাধুলা সব মিলিয়ে পোশাক হতে হবে হালকা ও বাতাস চলাচল উপযোগী। তাই ফ্যাশনের পাশাপাশি অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে যেন পোশাক শিশুর স্বাভাবিক চলাফেরায় বাধা না দেয়। এবারের ঈদ যেহেতু কিছুটা গরম ও আর্দ্র সময়ে পড়ছে, তাই ফ্যাশন হাউসগুলো ফেব্রিক নির্বাচনে কোনো ছাড় দেয়নি।

রঙ বাংলাদেশ এবার ঈদে বাচ্চাদের জন্য নিয়ে এসেছে দারুণ পোশাক। ফিলিস্তিন সূচিশিল্পের ঐতিহ্যবাহী ভাষা তাতরেজের জ্যামিতিক মোটিফ ও সুতায় আঁকা পরিচয়ের গল্প এবারের পোশাকে নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছে। প্রতিটি নকশা যেন শিকড়ের কথা বলে, ইতিহাসের কথা বলে, আবার আধুনিক কাট ও রঙের ভেতর দিয়ে সমকালীন হয়ে ওঠে।

প্রাচীন সভ্যতার আবহ নিয়ে এসেছে ইজিপশিয়ান ফ্লোরাল ডিজাইন লোটাস, প্যাপিরাস ও প্রতীকী ফুলেল মোটিফের সূক্ষ্ম অলংকরণে ফুটে উঠেছে রাজকীয় এক মাধুর্য। আধুনিক রঙের ছোঁয়ায় সেই প্রাচীন শিল্পধারা হয়ে উঠেছে ঈদের উপযোগী, সমকালীন ও মার্জিত।

প্রিমিয়াম কটন ও লিনেন

দিনের বেলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কটন ও লিনেন, এটি ঘাম শুষে নেয় এবং শিশুকে দীর্ঘক্ষণ ফুরফুরে রাখে। অর্গানিক কটন বা হাতে বোনা তাঁতের কাপড় এবার পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের অংশ হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছে।

মসলিন ও সিল্ক 

রাতের আভিজাত্যের জন্য মসলিনের কোনো বিকল্প নেই। হালকা ওজনের মসলিন বা অ্যান্ডি সিল্কের পোশাকগুলো শিশুদের জন্য বহন করা সহজ এবং দেখতেও দামি লাগে।

জ্যাকার্ড ও ভেলভেট 

পাঞ্জাবি বা কটির ক্ষেত্রে জ্যাকার্ড ফেব্রিক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বাড়তি কোনো কাজ ছাড়াই জমকালো লুক দেয়।

রঙে রঙিন ঈদ

ঈদ মানেই উজ্জ্বলতা। তাই শিশুদের পোশাকে রঙের বৈচিত্র্যই যেন প্রধান আকর্ষণ। শুধু ট্রেন্ডি রঙই নয়, শিশুর গায়ের রঙ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই রঙ বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। 

শান্ত স্নিগ্ধ রঙ

ল্যাভেন্ডার, মিন্ট গ্রিন, পাউডার ব্লু এবং ডাস্টি রোজের মতো রঙগুলো ছোটদের লুকে এক ধরনের স্নিগ্ধতা ও আভিজাত্য যোগ করে। রোদ উজ্জ্বল দিনের জন্য এই রঙগুলো চোখের আরাম।

উৎসবের রঙ 

রাতের উৎসবের জন্য মেরুন, রয়্যাল ব্লু, এমারেল্ড গ্রিন বা গোল্ডেন কালার বরাবরের মতোই জনপ্রিয়। গোল্ডেন বা মেটালিক সুতার কাজ এই গাঢ় রঙগুলোকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

অ্যাকসেসরিজ

পোশাকের সঙ্গে সঠিক অনুষঙ্গ না থাকলে শিশুদের ঈদ সাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বড় ফুলের হেয়ারব্যান্ড, ছোট ঝুমকো বা পুঁতির মালা এখনকার মেয়েশিশুদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। হাতে একগুচ্ছ কাচের চুড়ি ছাড়া যেন ঈদ পূর্ণই হয় না। ছেলেদের জন্য ছোট আকারের অ্যানালগ ঘড়ি, স্টাইলিশ রোদচশমা আর চামড়ার বেল্ট এক অনন্য স্মার্টনেস যোগ করে।

জুতা

পায়ের আরাম সবার আগে। মেয়েদের জন্য স্টোন বসানো ব্যালেরিনা বা ফ্ল্যাট চটি এবং ছেলেদের জন্য নরম তলার চামড়ার লোফার, কেডস বা ফরমাল সু পছন্দ করা উচিত।

পছন্দের চরিত্রের ছাপ

কার্টুনপ্রেমী বাচ্চাদের জন্যও রয়েছে নানা আয়োজন। ফ্রক, পাঞ্জাবি বা টি-শার্টে ছাপা হচ্ছে ফ্রোজেন, মিকি মাউস, মার্ভেল সুপার হিরোদের ছবি। বর্তমানে দেশীয় বাজারে ডোরেমন, ছোটদের প্রিয় চরিত্র গুড্ডু আর ভূতের গল্পের নানা ডিজাইনের পোশাক পাওয়া যায়। বাচ্চারা নিজেদের পছন্দের চরিত্রের পোশাক পেলে ঈদের আনন্দ তাদের জন্য হয়ে ওঠে আরও স্পেশাল।

সচেতন অভিভাবকদের জন্য গাইডলাইন 

শিশুদের পোশাক কেনার সময় নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখা জরুরি :

ত্বকের সংবেদনশীলতা : অনেক সময় কারুকাজ করা পোশাকে চুমকি, জরি বা শক্ত লেস থাকে; যা বাচ্চার কোমল চামড়ায় র‍্যাশ বা চুলকানি তৈরি করতে পারে। কেনার সময় পোশাকের ভেতরের স্তরটি সুতির কি না, তা নিশ্চিত হোন।

মাপ ও স্বাচ্ছন্দ্য : ঈদ মানেই সারা দিন ছোটাছুটি আর আনন্দ। তাই একদম গায়ের সঙ্গে সেঁটে থাকে এমন পোশাক না কিনে কিছুটা ঢিলেঢালা কিনুন। এতে শিশু দীর্ঘক্ষণ পোশাকটি পরে থাকতে পারবে।

আবহাওয়ার প্রস্তুতি : রোদ থাকলে ছাতা বা হ্যাট সঙ্গে রাখুন। পোশাকটি যদি সিন্থেটিক হয়, তবে ভেতরে অবশ্যই একটি পাতলা সুতির গেঞ্জি পরিয়ে দিন।

ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব : আপনার পছন্দ শিশুর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তাকেও মতামত দিতে দিন। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং সে পোশাকটি আনন্দের সঙ্গে পরবে।

নিরাপত্তা ও যত্ন : ঈদের দিনে নতুন পোশাক পরার আগে তা ধুয়ে নেওয়া ভালো, বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে। কাপড়ে কোনো ধারালো অ্যাকসেসরিজ বা ঢিলা বোতাম আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা উচিত। 

ঈদে বাচ্চাদের ফ্যাশন কেবল বাহারি পোশাকের প্রদর্শনী নয়; এটি তাদের আনন্দ, আত্মবিশ্বাস ও শৈশবের নির্মল উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে উজ্জ্বল হাসি ফুটে ওঠে, সেটিই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য। তাই ট্রেন্ড বা ব্র্যান্ডের মোহে নয়, অগ্রাধিকার দিন শিশুর আরাম, পছন্দ ও স্বাভাবিক চলাফেরার স্বাধীনতাকে। আগেভাগে পরিকল্পনা করলে সীমিত বাজেটেও বেছে নেওয়া যায় মানানসই ও সুন্দর পোশাক। নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও রঙিন আয়োজনে প্রতিটি শিশুর ঈদ হয়ে উঠুক আনন্দময়। কারণ এই ছোট মুহূর্তগুলোই এক দিন হয়ে উঠবে তাদের শৈশবের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা