জারাদ ত্রিস্তান
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৪ পিএম
আঁকা : নীলাদ্রি রাজ সাহা, সপ্তম শ্রেণি, বি এ এফ শাহীন কলেজ, ঢাকা
বর্ণমালা আর পঙক্তি যমজ বোন। তবে বর্ণমালা পঙক্তির চেয়ে এক মিনিট ২৫ সেকেন্ড ২৫০ মিলি সেকেন্ড বড়। দুই বোন দেখতে একই রকম। এক রকম জামা পরলে তাদের আলাদা করে চেনা কঠিন। ওরা থাকে আমেরিকায়। এবার বাবা-মার সঙ্গে বাংলাদেশের বেড়াতে এসেছে। বাংলাদেশে আবার কত মজা! দাদু-দিদা, নানা, নানু, চাচ্চু, মামা, ফুফি আর খালামণিদের সঙ্গে কত যে আনন্দ হয়। তা বলে শেষ করা মুশকিল!
দুই বোনের মনে আনন্দের আরও একটি কারণ আছে। ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ ওদের জন্মদিন। এবার দাদু-দিদার সঙ্গে জন্মদিন পালন করবে ঢাকায়। দাদুদের বাসায়।
দুই বোন খেয়াল করল জন্মদিনের কয়দিন আগে থেকেই দাদু খুব উত্তেজিত!
শেষে দাদুর কাছে গিয়ে ওরা বলল, ‘বাবু কয়দিন ধরে তোমাকে এমন লাগছে কেন?’
দাদু বললেন, ‘সামনেই তো একুশে ফেব্রুয়ারি, মনে হলেই গায়ের রক্ত গরম হয়ে ওঠে।’
দুই বোন ভেবে পেল না। তাদের জন্মদিনের সঙ্গে একুশের ফেব্রুয়ারির সম্পর্ক কী?
তাই কৌতূহল দমাতে না পেরে আবার দাদুকে প্রশ্ন করল।
দাদু বললেন, ‘আরে তোমরা জানো না? একুশে ফেব্রুয়ারি তো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ ডে।’
দুই বোন একটু অবাক হলো। দুই বোন জানত ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখে ওদের জন্মদিন। এ ছাড়া আর কোনো বিশেষ দিন আছে, সেটা তাদের জানা নেই! দুই বোনই ভাবনায় পড়ে গেল।
দাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদু, মাতৃভাষা দিবস কী?’
‘দাদুমণিরা, মাতৃভাষা অর্থ মায়ের ভাষা। মায়ের ভাষার জন্য যেদিন, সেটি হলো মাতৃভাষা দিবস। বহু বছর আগে ওই দিনে অনেকেই মায়ের ভাষার দাবিতে জীবন দিয়েছিলেন।’
‘ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন? ভাষা মানে তো আমরা যে ভাষায় কথা বলি, নিজ ভাষায় কথা বলতে আবার কেউ বাধা দেয় নাকি?’
‘সেটাই তো বিষয়। কেউ যদি তাদেরকে মায়ের ভাষায় কথা বলতে না দেয়, তাহলে কেমন লাগবে বল তো?’
বর্ণমালা ও পঙক্তি ভাবল, সত্যিই তো আমেরিকায় সব সময় ইংরেজি বলা হয়, কিন্তু দেশে এসে সবার সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে ওদের খুব ভালো লাগে। কথাটি দাদুকে বলল।
‘ঠিক তো! সবাই তো নিজের মাতৃভাষায়ই মন খুলে কথা বলবে। কিন্তু একসময় বাঙালিদের নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল ভিনদেশি ভাষা। সে এক লম্বা কাহিনী।’
‘বলো না লক্ষ্মী দাদু বলো না, বলো বলো তোমার গল্প।’
‘আরে গল্প নয় রে, গল্প নয়। সবই সত্যি, আগে বাংলাদেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী আমাদেরকে শাসন করত। হঠাৎ করে তাদের মাথায় ভূত চাপল, রাষ্ট্রভাষা উর্দু করবে। রাষ্ট্রভাষা মানে বুঝি তো, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রয়োজনে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়। যাহোক, তারা বলল বাঙালিদের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, তারা উর্দুতেই কথা বলবে। কিন্তু বাঙালিরা তা মানবে কেন? তারা এর প্রতিবাদ করল। তারা বলল বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা, কেননা পূর্ব পাকিস্তানের সব মানুষই ছিল বাংলা ভাষাভাষী। তারা বাংলায় কথা বলত, বাংলায় গান গাইত, বাংলায় নিজের মনের ভাব প্রকাশ করত। বাংলা ছিল তাদের মনের ভাষা, প্রাণের ভাষা। শুরু হলো আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা বাংলাই করতে হবে। কিন্তু পাকিস্তানের সরকার তা মানবে না, উর্দুই হবে বাংলার রাষ্ট্রভাষা তারা চাপিয়ে দেবে...।’
‘দাদু এত খারাপ ছিল কেন? তারপর পূর্ববাংলার রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলো কী করে?’
‘আরে শুনে নে। তারপর সব বুঝবি। পাকিস্তান সরকার সারা দেশে ১৪৪ ধারা জারি করল। অর্থাৎ কেউ ঘর থেকে বের হতে পারবে না। কোনো মিটিং-মিছিল, আন্দোলন, শোভাযাত্রা বেরোতে পারবে না। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল দিনটি। বাংলার মানুষ ফুঁসে উঠল, এ কেমন কথা রে বাবা! মাতৃভাষায় কথাও বলতে দেবে না, আবার তার প্রতিবাদও করতে দেবে না। আইনভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হলো বাংলার ছাত্র-জনতা। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান নিয়ে রাজপথে নামলেন ছাত্ররা। পাকিস্তানের পুলিশ তাদের ওপর হামলা করল। পাখির মতো গুলি চালাতে লাগল। মায়ের মুখের ভাষার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সালাম, বরকত, রফিক, শফিক ও জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকেই। তাদের স্মৃতিতেই আমরা বানিয়েছি শহীদ মিনার...।’
‘তারপর দাদু?’
‘পৃথিবীতে এর আগে আর কোনো জাতি মাতৃভাষার জন্য লড়াই করেনি, মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জীবন দান করেনি। তাই এমন ঘটনায় সারা পৃথিবীর টনক নড়ে উঠল। বিশ্বের মানুষ বিস্মিত হয়ে উঠল। টলে উঠল পাকিস্তানি হানাদাররা। এত মানুষের আত্মত্যাগ ও সারা বিশ্বের নিন্দার মুখে, ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি দেওয়া হয়।’
‘তাই দাদু! বাঙালিরা ভাষার জন্য এত লড়াই করেছে!’
‘হ্যারে দিদিমারা, বাংলায় একমাত্র জাতি যারা মাতৃভাষার জন্য লড়াই করেছে। তারপর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে; যা বৃহৎ ভাষার দিক দিয়ে পঞ্চম।’
‘সত্যিই দাদু বাংলা একটা খুব সুন্দর ভাষা। বাঙালিরা লড়াই করে এটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমি তো আমেরিকায় গিয়ে আমার সব বন্ধুবান্ধবীকে এই গল্প বলব।’
‘তাই নাকি দিদি মারা, তবে তো খুব ভালো হয়। সবার কাছেই তার মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম, আমাদের উচিত সবার মাতৃভাষাকে সম্মান করা।’
ষষ্ঠ শ্রেণি, উইলস লিটল
ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ