রওনক জাহান পুষ্প
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:১৪ পিএম
‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে...।’ গানের সুরে সুরে প্রকৃতিতে বসন্ত চলে এলো। শীতের রুক্ষতা কাটিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে নতুন প্রাণের ছোঁয়া, গাছপালা ভরে যাবে কচি সবুজ পাতা আর রঙিন ফুলে। প্রকৃতি সাজবে তার সবচেয়ে সুন্দর রূপে। কিন্তু প্রকৃতির এই সুন্দর রঙ আর রূপ সবাই সমানভাবে উপভোগ করতে পারেন না। বসন্ত কারও কাছে আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও, কারও জীবনে নিয়ে আসে অস্বস্তি আর অসুস্থতা। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ফুলের রেণুতেই অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি। বাতাসে ভেসে যাওয়া ফুলের রেণু থেকেই অনেকের হয় অ্যালার্জির সমস্যা। চোখ জ্বালা, নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, নাক-মুখ চুলকানোসহ হতে পারে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা। অনেক সময় ত্বকেও দেখা দেয় অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া। মজার ব্যাপার হলো, অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে সমস্যার উৎস আসলে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পছন্দ করে চুলে গোঁজা ফুল বা ঘরে সাজিয়ে রাখা ফুল থেকেই শুরু হয় অ্যালার্জির উপসর্গ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অ্যালার্জিকে বলা হয় পোলেন অ্যালার্জি। একে আবার সিজনাল অ্যালার্জি বা হে ফিভার (hay fever) নামেও ডাকা হয়। বসন্তকালে গাছ, ফুল আর ঘাস থেকে যখন ফুলের রেণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই মূলত এই সমস্যার শুরু হয়। আমরা শ্বাস নেওয়ার সময় এই রেণুগুলো আমাদের শ্বাসনালির মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। আমাদের শরীর তখন এই রেণু ও ধুলাবালিকে ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে এবং প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। এই প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়ার ফলেই অ্যালার্জির বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়।

তবে পোলেন অ্যালার্জি সবার হয় না। যাদের আগে থেকেই ধুলাবালি, রেণু বা প্রাকৃতিক উপাদানে অ্যালার্জি আছে, তাদের মধ্যেই এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে পোলেন অ্যালার্জির প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশের পরিবর্তন- সব মিলিয়ে এই অ্যালার্জি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
আমরা অনেকেই পোলেন অ্যালার্জিকে সাধারণ ঠান্ডা বা সর্দি-কাশির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু দুইয়ের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ঠান্ডা ভাইরাসের কারণে হয় এবং সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। কিন্তু পোলেন অ্যালার্জি পুরো বসন্তকাল জুড়েই স্থায়ী হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখে সাধারণ সর্দি-কাশি আর পোলেন অ্যালার্জির মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব।
যেমনÑ বারবার হাঁচি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া বা শ্বাসকষ্ট যদি বারবার ফিরে আসে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে সেটি পোলেন অ্যালার্জির লক্ষণ হতে পারে। সাধারণ সর্দি-কাশি হলে এক-দুইবার অসুস্থ হওয়ার পর সেরে যায়। কিন্তু পোলেন অ্যালার্জি থাকলে পুরো সিজন জুড়েই এই সমস্যাগুলো বারবার দেখা দিতে পারে।
চোখ চুলকানো, লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া বা চোখ ফুলে যাওয়াও পোলেন অ্যালার্জির খুব সাধারণ লক্ষণ। ফুলের রেণু চোখে ঢুকলেই শরীর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখায়। এর প্রভাব পড়ে চোখের ওপর, যা অনেক সময় বেশ বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
এ ছাড়াও পোলেন অ্যালার্জি ত্বকের ওপরও প্রভাব ফেলে। ত্বকে চুলকানি, ফুসকুড়ি ওঠা, জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা, গলা চুলকানোÑ এসব উপসর্গও দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ফুলের রেণু ত্বক বা চুলে আটকে থেকে দীর্ঘক্ষণ সমস্যার কারণ হয়।
ফুলের রেণুর অ্যালার্জি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু সতর্কতা মেনে চললে এই সমস্যার মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। নিয়মকানুন মেনে চললে বসন্তকালেও সুস্থ থাকা সম্ভব।
সুস্থ থাকার উপায়
যেহেতু ফুলের রেণু মূলত বাইরের বাতাসেই ভেসে বেড়ায়, তাই বাইরে যাওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। সকালে যখন ফুল ফোটে এবং বাতাসে রেণুর পরিমাণ বেশি থাকে, তখন বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে গেলে মুখে মাস্ক ও চোখে সানগ্লাস ব্যবহার করা উচিত। সম্ভব হলে হাতে গ্লাভস পরা যেতে পারে।
বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই হাত-মুখ ভালো করে ধুয়ে নেওয়া, কাপড় বদলানো এবং সম্ভব হলে গোসল করে নেওয়া সবচেয়ে ভালো। কারণ চুল বা কাপড়ে ফুলের রেণু আটকে থাকতে পারে, যা পরে অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
বসন্তের মুক্ত বাতাস আর ফুলের সুবাস আমরা সবাই উপভোগ করতে ভালোবাসি। কিন্তু যাদের পোলেন অ্যালার্জি আছে, তাদের জন্য এই সময়টা একটু সতর্কতার। এ সময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখা ভালো। বাসায় ব্যবহার করা যেতে পারে এয়ার ফিল্টার, যা বাতাস থেকে ফুলের রেণু ও ধুলাবালির কণা দূর করতে সাহায্য করে। এতে ঘরের বাতাস থাকবে পরিষ্কার, আর আপনিও থাকবেন অনেকটাই অ্যালার্জিমুক্ত।
সবুজের উৎসব আর ফুলের রঙে ভরা বসন্ত যেমন আনন্দের, তেমনি কারও কারও জন্য একটু বাড়তি সতর্কতার সময়। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিজের খেয়াল রাখাটাও জরুরি। সামান্য সচেতনতা আর যত্ন থাকলেই বসন্তকে উপভোগ করা যায় সুন্দরভাবেই।