মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:২১ পিএম
অলংকরণ : নিশা আক্তার
আলিনা খুব চকলেট খেতে ভালোবাসে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে প্রথমে খেতে চায়—চকলেট। রাতে বিছানায় গিয়ে বলে, ‘আম্মু, একটা চকলেট খেতে পারি?’ সেদিন ডাক্তার আংকেল বলেছেন— ‘মামনির দাঁতের ভেতর পোকারা ঘরবাড়ি বানিয়েছে।’
ডাক্তার আংকেলের কথা শুনে আলিনা ভয় পেয়ে বলে ওঠে, ‘আংকেল, এখনই পোকা তাড়িয়ে দাও।’
‘আগে চকলেট দিয়ে দাঁত মাজা বন্ধ করতে হবে!’ ডাক্তার বলেন।
এ কথায় আলিনা হি হি করে হাসে।
কিন্তু আলিনা খুব কৌতূহলী একটা মেয়ে। ওর বাবা একজন রোবট ইঞ্জিনিয়ার। ওরা থাকে ধানমন্ডির এগারো নম্বর রোডে। এক রাতে চুপি চুপি বাবার ল্যাবের দরজার সামনে উঁকি দেয়। দেখে বাবা চেয়ারে হেলান দিয়ে গভীর ঘুম। হঠাৎ এক ছোট রোবট চুপি চুপি বের হয়ে আসে। রোবোবয়ের মাথায় দুটো ঘুরন্ত অ্যান্টেনা, সবুজ আলো জ্বলছে। ওর নাম—‘টিকটক’। এই নামটা আলিনা রেখেছিল। সে আলিনার পাশে এসে বলে—
‘তুমি এখনও ঘুমোওনি?’
‘ঘুম আসছে না টিকটক।’
‘চলো, আমি তোমায় চকলেট গ্রহে বেড়াতে নিয়ে যাই!’
‘সত্যি বলছো?’ চোখ বড় বড় করে বলে আলিনা।
‘রোবটদের মিথ্যে বলার ক্ষমতা নেই।’
‘আমি কীভাবে যাব?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল আলিনা।
‘আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।’
‘বাবাকে বলে গেলে ভালো হতো না?’ ভয়ে ভয়ে বলে আলিনা।
‘তখন যাওয়া-ই হবে না।’
‘তাই তো... চলো তাহলে...।’ আলিনা টিকটকের হাত ধরে বলে।
টিকটিক তার বুকে থাকা বোতাম টিপে দেয়— পপ! এক ছোট্ট রকেটবোট বের হয়! দুজনে রকেটবোটে উঠে পড়ে। চোখের পলকে ওটা রাতের আকাশে মিলিয়ে যায়।
আলিনা ও রোবোবয় টিকটক কিছুক্ষণের মধ্যেই চকলেট গ্রহে পৌঁছে গেল। অদ্ভুত সুন্দর গ্রহ— আকাশ ক্যান্ডির মতো গোলাপি, পাহাড়গুলো চকোলেট দিয়ে তৈরি, আর নদীতে বয়ে যাচ্ছে দুধ। চারদিকে বৃষ্টির মতো ঝরছে ক্যারামেল আর ক্যারামেল! চকলেটের গন্ধে চারপাশ ম-ম করছে। আলিনা নাক টেনে টেনে পেটের ভেতর ঘ্রাণ নিতে লাগল। তার ইচ্ছে করছে, এক দৌড়ে চকলেটের পাহাড়ে উঠে পড়তে! ইচ্ছেমতন চকলেট খেতে শুরু করে, কিছু চকলেট পকেটে পুরতে।
এই সময় চকলেট গ্রহের বাসিন্দারা ছুটে আসে। আলিনা ও টিকটককে দেখে খুব ভয় পেয়ে যায় ওরা। ওরা চোখ পিটপিট করে আলিনা ও টিকটকের দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের চোখে প্রশ্ন খেলা করছে, ‘এই তোমরা কারা? এখানে কী চাও?’
টিকটক ফিসফিস করে আলিনার কানে কানে বলল, ‘ভয় পেয়ো না, ওরা এই গ্রহের বাসিন্দা—‘চকোচকো’! ওরা সবসময় ভয়ে থাকে, এই বুঝি রোবটরা এসে সব চকলেট নিয়ে যাবে। হি হি...’
আলিনার ভয় কেটে গেছে। একটু সামনে গিয়ে বলে, ‘টিকটিক আমার বন্ধু। সে চকলেট খায় না, সে তোমাদের জন্য চকলেট ‘ঠান্ডা রাখার যন্ত্র’ বানাতে এসেছে!’
আলিনার কথা শুনে চকোচকোদের চোখ-কান মুহূর্তে বড় বড় হয়ে গেল। একটা ছোট্ট সাইজের চকোচকো আলিনার সামনে এসে জানতে চাইল, তুমি সত্যি বলছো?’
‘হ্যাঁ, সত্যি। গরমে তোমাদের শরীরের চকলেট আর গলে গলে পড়বে না।’
টিকটক তার কাজ শুরু করে দিল। চকলেট গ্রহের বাসিন্দারা গোল হয়ে রোবোবয় টিকটককে ঘিরে ধরল। মুগ্ধ হয়ে ঠান্ডা করার যন্ত্র বানানো দেখতে লাগল।
নিমিষেই যন্ত্র বানানোর কাজ শেষ হয়। চকোচকোরা খুশি হয়ে চকলেটের মুকুল টিকটিকের মাথায় পরিয়ে দিল।
টিকটক বলে, ‘আলিনাকেও একটা চকলেটের মুকুট পরিয়ে দাও।’
‘এখনই দিচ্ছি।’ চকোচকোরা বলল।
আলিনা খুশি হয়ে বলে, ‘তোমরা শুধু মিষ্টি না, অনেক ভালোও!’
টিকটক আস্তে করে বলল, ‘বুদ্ধি আর ভালোবাসা থাকলে সব গ্রহেই বন্ধু পাওয়া যায়।’
শেষে ওরা সবাই একসাথে চকলেট পুকুরে গোসল করে, দুধস্নান করে আর ক্যারামেল রোলার কোস্টারে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। রাত ভোর হতে চলল। টিকটক আলিনাকে ফিসফিস করে বলল, ‘আমাদের এখনই ফিরতে হবে।’
‘আরেকটু সময় থাকি?’ চোখ-মুখ কুঁচকিয়ে বলে আলিনা।
‘তোমার বাবার কাছে ধরা পড়তে না চাইলে এখনই আমাদের যেতে হবে।’ টিকটক সাফ বলে দেয়।
চকোচকোদের কাছ থেকে ওরা বিদায় নিল। কিন্তু ওদের কথা দিতে হলো— আলিনারা আবারও চকলেট গ্রহে একদিন বেড়াতে আসবে।
চাঁদের আলোয় রকেটবোট আবার চালু হয়। আলিনা আর টিকটক পৃথিবীতে ফিরে আসে। আলিনা টুপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
সকাল হলে আলিনার মা এসে বলে, ‘তোমার মুখে চকোলেট লাগানো কেন?”
মায়ের কথায় আলিনা কেবল দুষ্ট করে হাসছে...।’
এদিকে আলিনার বাবা ভেবে পাচ্ছেন না— ল্যাবের ভেতর চকলেটের ঘ্রাণ এলো কেমন করে?
তিনি টিকটককে কথাটা জিজ্ঞেসও করলেন, ‘হ্যারে টিকটক বাবু, চকলেটের ঘ্রাণ আসছে কোথা থেকে?
টিকটক মাথা চুলকে বলে, ‘ওকে ওস্তাদ, আমি এখুনি খোঁজ নিচ্ছিÑ’
টিকটিকের চোখ তখনও জ্বলছে— চারপাশ সবুজ আলোয় ভরে আছে।