শক্তিশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পড়াশোনা-পরবর্তী কাজের সুযোগ ও সহজ অভিবাসনের কারণে কানাডা বিশ্বের অনেকে শিক্ষার্থীর পড়াশোনার জন্য সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্যগুলোর মধ্যে একটি। কানাডায় শিক্ষার্থীদের জন্য বড় আকর্ষণের কারণ হলো পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক পারমিট (পিজিডব্লিউপি), যার আওতায় স্নাতকরা তিন বছরের জন্য কাজ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কেন অন্যতম গন্তব্য তা একটি পরিসংখ্যানেও বোঝা যাবে। গত কয়েক বছরে দেশটির উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালে ৩ লাখ ২৬ হাজার ১২০ জন শিক্ষার্থী কানাডায় পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮৫ হাজারে।
ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (আইআরসিসি) থেকে প্রাপ্ত সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, কানাডার অর্থনীতির একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক শিক্ষা। ২০২২ সালে শিক্ষা খাত দেশটির জিডিপিতে ৩০ দশমিক ৯ বিলিয়ন কানাডা ডলার অবদান রেখেছে। যদিও কানাডা সরকার স্টাডি পারমিট নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু সীমা সাম্প্রতিক সময়ে চালু করেছে, তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক আবেদনকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রেই আছে।
কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন প্রক্রিয়া বিভিন্ন এবং কখনও কখনও জটিল হতে পারে। শিক্ষার্থীদের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে আবেদন করতে গেলে অ্যাডমিশন ফরম, ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষা, ডকুমেন্টস ও ভিসা সময়সীমা পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে।
ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিক্রুটমেন্ট ও অ্যাডমিশন ডিরেক্টর অ্যান ম্যাকডোনাল্ড এবং ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অ্যাডমিশন অফিসার কারিন জেবারি জানিয়েছেন, আবেদন প্রক্রিয়ায় কিছু বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত।
১. ভর্তির শর্তাবলি বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভিন্ন
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি প্রোগ্রামের নিজস্ব যোগ্যতার মানদণ্ড থাকে। প্রাদেশিক নিয়ম, শিক্ষার স্তর ও বিষয়ভেদে শর্ত ভিন্ন হতে পারে।
২. নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন
শিক্ষার্থীদের অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে তথ্য যাচাই করা উচিত। EduCanada, UniversityStudy.ca এবং StudyinCanada.com-এর মতো জাতীয় প্লাটফর্মও নির্ভরযোগ্য।
৩. সঠিক ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষা বেছে নিন
ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা পরীক্ষা আবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন স্বীকৃত পরীক্ষার স্কোর গ্রহণ করে। সহজে অ্যাক্সেস, খরচ, ফলাফলের সময় এবং পরীক্ষার সুবিধা অনুযায়ী পরীক্ষা নির্বাচন করা উচিত।
ডুয়োলিঙ্গো ইংরেজি পরীক্ষা (DET) একটি জনপ্রিয় বিকল্প। এটি অনলাইনে করা যায়, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল প্রকাশ হয় এবং খরচ মাত্র ৭০ ডলার। কানাডার ৪৮০-এরও বেশি প্রোগ্রামে এবং U15 বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এটি গ্রহণযোগ্য।
আবেদন প্রক্রিয়ার টিপস
অ্যাডমিশন বিশেষজ্ঞরা ৬-৮ মাস আগে আবেদন শুরু করার পরামর্শ দেন। সময়মতো পরিকল্পনা থাকলে SOP প্রস্তুত করা, ডকুমেন্ট সংগ্রহ করা এবং ইংরেজি পরীক্ষা দেওয়া সহজ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য SOP কাস্টমাইজ করা আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে।
বৃত্তির অধীনে বা নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পড়তে যাচ্ছে। কানাডার উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে জানতে সে দেশে বসবাসরত বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী, গবেষক ও পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে ‘স্বপ্ন নিয়ে’।
১. স্নাতকের জন্য কি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা যায়?
বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থীই স্নাতক করতে কানাডা যাচ্ছেন। তবে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য নিয়ে আবেদন করা উচিত। স্নাতক ডিগ্রি একজন শিক্ষার্থীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগে থেকে খরচ, বৃত্তির পরিমাণ ইত্যাদি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া দরকার। মাঝপথে গিয়ে যেন পড়ালেখায় বিঘ্ন না হয়।
২. কানাডায় পড়াশোনার ধরন কেমন?
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া যেখানেÑ মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা মূলত দুই ধরনের শিক্ষার জন্য আসেনÑ গবেষণাভিত্তিক ও কোর্সবিষয়ক পড়ালেখা। কোর্সভিত্তিক পড়ালেখায় বৃত্তির সুযোগ বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নেই বললেই চলে। কিছু কিছু কোর্স আছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা কো-অপ করতে পারেন। কো-অপ এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত কোনো কর্মক্ষেত্রে কিছুদিনের জন্য কাজ করে অর্থ উপার্জন করা যায়।
৩. বৃত্তির কী কী সুযোগ আছে?
একাডেমিক ফলাফল ও গবেষণার অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ততা এবং আইইএলটিএসের স্কোরের ভিত্তিতে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীরা নানা তহবিল পেয়ে থাকেন। ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি, যেখানে বৃত্তির সুযোগ মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভর করে। কুইবেক প্রভিন্সিয়াল গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ, অন্টারিও ট্রিলিয়াম স্কলারশিপসহ নানা বৃত্তি শিক্ষার্থীদের জন্য চালু আছে।
৪. আইইএলটিএস স্কোর কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে আইইএলটিএস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউ ফাউন্ডল্যান্ড। ‘যারা উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের আগে থেকেই আইইএলটিএসের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। শুধু বৃত্তি বা ভর্তির জন্য নয়, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এটির গুরুত্ব আছে। আমরা জানি যে দুই ধরনের আইইএলটিএস আছে, একাডেমিক ও জেনারেল।
৫. কানাডায় জীবনযাত্রার ব্যয় কেমন?
প্রদেশ কিংবা পরিবেশভেদে জীবনযাত্রার ব্যয় ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয় ডরমিটরিতে থাকলে এক রকম খরচ, আবার আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে রুম ভাগ করে থাকলে খরচ আরেক রকম। অন্টারিও প্রদেশের অটোয়া শহরে একজন শিক্ষার্থী ১২০০-১৩০০ কানাডিয়ান ডলারে খুব ভালোভাবে চলতে পারে। একই সময়ে নিউ ব্রান্সউইকের ফ্রেডরিকটনে এই খরচ হয়তো ১০০০-১১০০ ডলার। আবার টরন্টো বা ভ্যাঙ্কুভারে ১৯০০-২০০০ ডলার খরচ হয়ে যায়।
৬. বৃত্তি ছাড়া পড়লে খরচ কেমন?
বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে টিউশন ফি আলাদা। স্নাতক প্রোগ্রামে প্রতি সেমিস্টারে খরচ পড়বে ১০ থেকে ১২ হাজার কানাডিয়ান ডলার (৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রায়)। মাস্টার্স প্রোগ্রামেও প্রতি সেমিস্টারে খরচ প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কানাডিয়ান ডলার। সেই হিসাবে বৃত্তি ছাড়া পড়তে পূর্ণকালীন স্নাতকে খরচ ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ কানাডিয়ান ডলারের কাছাকাছি। বৃত্তি ছাড়া স্নাতকোত্তরে পড়তে প্রায় ৩০ হাজার কানাডিয়ান ডলার খরচ হতে পারে।
৭. পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ আছে?
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজের সুযোগ আছে। স্টুডেন্ট ভিসায় শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পান। সেই হিসাবে মাসে প্রায় দেড় হাজার কানাডিয়ান ডলার আয়ের সুযোগ আছে। মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল-এই সময়ে কর্মঘণ্টার সীমাবদ্ধতা থাকে না। তখন আরও বেশি কাজ করা যায়।
৮. কানাডায় পড়ালেখা করে সে দেশে চাকরির সুযোগ কেমন?
কানাডা অনেকটাই অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল। তাই অভিবাসীরা এখন প্রচুর কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। দক্ষতা, রেজাল্ট, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তি দক্ষতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরে বিভিন্ন সময় চাকরির মেলা বা প্লেসমেন্টের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগ থেকে নিয়মিত জব-প্লেসমেন্ট করা হয়।