× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ওরা সংগ্রামী জীবনযোদ্ধা

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:২০ পিএম

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:২২ পিএম

ওরা সংগ্রামী জীবনযোদ্ধা

প্রতিবন্ধী জীবন মানে শুধু নিজের কষ্ট নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্যও জীবন হয়ে ওঠে সংগ্রামের। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিবন্ধী পরিবারের সংগ্রামী জীবন নিয়ে লিখেছেন প্রতিনিধিরা

বাবা পঙ্গু, চোখে দেখেন না মা 

১১ বছরের রহমতুল্লাহর জীবনযুদ্ধ  

শেখ সোহেল, বাগেরহাট

বাগেরহাট সদর উপজেলার মুক্ষাইট গ্রামের ছোট্ট এক ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস করে ১১ বছরের শিশু রহমতুল্লাহ। পড়ে ক্লাস ফাইভে। অন্য বাচ্চারা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন তার দিনের শুরুই হয় সংগ্রাম আর দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে। রহমাতুল্লাহর বাবা মহিদুল ইসলাম ২৭ বছর ধরে পঙ্গু। ছেলের জন্মের আগেই নারকেল গাছ থেকে পড়ে তার দুই পা অচল হয়ে যায়। আর তার মা পারভিন বেগম ২০০৭ সালের ভয়াবহ সিডরের সেই রাতেই চোখের আলো হারান, ২০ বছর ধরে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ। তিন সদস্যের এই পরিবার এখন আশ্রয় নিয়েছে এক বড় ভাইয়ের দেওয়া ছোট্ট, টিনঝাপসা ভাঙা ঘরে। ঘরে নেই কোনো জমি, নেই কোনো নির্দিষ্ট আয়। আগে তাদের একটি ছোট দোকান ছিল‌, কিন্তু টাকার অভাবে, মালামাল তুলতে না পারায় সেই দোকানটিও অনেক দিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পরিবারটির একমাত্র ভরসা আজ এই ১১ বছরের শিশু রহমাতুল্লাহ।

১১ বছরের শিশু রহমাতুল্লাহ

শিশু বয়স ভুলে বড়দের সব দায়িত্ব

ভোরবেলা বই হাতে নেওয়ার আগেই রহমতুল্লাহকে সামলাতে হয় বাবা-মাকে। বাবাকে ধরে ধরে রোদে বসানো, পানি গরম করে গোসল করানো, গা মুছিয়ে দেওয়া— সবই তার ছোট্ট হাতের কাজ। মায়ের সেবাযত্নও তাকেই করতে হয়। ঘরের সব কাজ থালাবাসন ধোয়া থেকে শুরু করে ডাল-ভাত রান্না সবই সামলায় সে। তারপর ছুটে যায় স্কুলে। স্কুল থেকে ফিরে আবার মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল চেয়ে আনে, যাতে বাবা-মায়ের একবেলা খাবার জোটে। এক শিশুর কাছে এর চেয়ে কঠিন দায়িত্ব আর কীইবা হতে পারে? তবু রহমাতুল্লাহ হাসে। দারিদ্র্য, অন্ধত্ব আর পঙ্গুত্বের অন্ধকার ভেদ করে সে-ই হয়ে উঠেছে পরিবারের একমাত্র আলো। মুক্ষাইট গ্রামের মানুষ তাই তাকে ডাকে অন্ধকার ঘরের আলো রহমতুল্লাহ। স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে। চরম অনিশ্চয়তার মাঝেও রহমাতুল্লাহর স্বপ্ন থেমে নেই। সে চায় বড় হয়ে চাকরি করতে, বাবা-মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে। মায়ের চোখে আলো ফিরিয়ে দিতে না পারলেও অন্তত তাদের জীবনে সুখের আলো জ্বালাতে চায় সে। প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন বলেন, ছেলেটাকে আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখি। নিজের খাওয়া–দাওয়া ঠিকমতো না করেও বাবা-মাকে আগে দেখাশোনা করে। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল আনার মতো কাজও করতে হয় তাকে। আমরা মাঝে মাঝে সাহায্য করি, কিন্তু তার পরিবারের অবস্থা খুবই করুণ। সরকার ও সমাজের ভালো মানুষের সহায়তা খুব জরুরি।

গোটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বেবী রানী সেন বলেন, এ বছর আমাদের স্কুলে রহমতুল্লাহ নামে একটি শিশু ভর্তি হয়েছে। তার বাবা-মা দুজনই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী। ফলে তাকে কেউ ঠিকভাবে দেখাশোনা করতে পারে না। ছোট ছেলে হওয়ায় নিজের পড়াশোনা বা দৈনন্দিন বিষয়গুলো বুঝে সামলানো তার জন্য খুব কঠিন। এজন্য সে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না, পড়ালেখায় মনোযোগও কম। তিনি আরও বলেন, ছেলেটির অবস্থা বিবেচনা করে আমরা শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি স্কুল ড্রেসসহ প্রয়োজনীয় সব শিক্ষা উপকরণ আমরা দেব। তবে শুধু স্কুল নয়, সমাজের অন্যান্য মানুষেরও উচিত এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। 

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থান্দার কামরুজ্জামান বলেন, রহমতুল্লাহর মতো শিশু আমাদের সমাজে খুবই বিরল। তার দায়িত্ববোধ ও সংগ্রাম সত্যিই অবাক করার মতো। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। পরিবারটিকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হবে।

ছয় প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে মায়ের লড়াকু সংগ্রাম

মনিরুজ্জামান বাবলু, চাঁদপুর 

পরিবারের আদর সন্তান হয়ে জন্মেছেন তারা। অন্যান্য পরিবারের সন্তানদের মতো তারাও হাঁটতে পারত, দৌঁড়াতে পারত, একই সঙ্গে খেলাধুলাও করতে পারত। তবে আচমকা এক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন লাঠি তাদের ভরসা। ১০-১২ বছর বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন একে একে পরিবারের ছয় সন্তানই প্রতিবন্ধী। তাদের চলাফেরার একমাত্র সঙ্গী এখন হাতের লাঠি। দুই বছর আগে বাবা মারা যান। তারপর থেকে মায়ের লড়াকু জীবন সংগ্রাম। তারা অন্যের জায়গায় একটি টিনশেডে বসবাস করছেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বড়ালি গ্রামের আজিম বাড়িতে।

মা ফুলবানুর সঙ্গে ছয় প্রতিবন্ধী সন্তান

বড়ালী গ্রামের মৃত মনোহরের সাত সন্তান। পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে। তাদের মধ্যে ৫ ছেলে মো. নুর ইসলাম হোসেন (৪৫), মো. তাজুল ইসলাম (৪০), মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (৩৫), মো. বিল্লাল হোসেন (৩২), মো. আব্দুর রব (২৮) ও এক মেয়ে মোসা. রেহেনা আক্তার (১৮) শারীরিক প্রতিবন্ধী। ১০-১২ বছর বয়সেই একে একে তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার ক্ষমতা হারান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা দুই বছর আগে মারা যান। নিয়তি তাদের ফেলে দেয় ঘোর অন্ধকারে। মা ফুলবানু এখন ছয় সন্তান নিয়ে ঘুরছেন দিগ্বিদিক। রান্না করার লাকড়ি থেকে শুরু করে সবই দ্বারে দ্বারে হাত পেতে ফিরেন ঘরে। ছয় সন্তানের খাবার থেকে গোসল সবই তার ওপর নির্ভর। আরেক মেয়ে ঢাকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসাসহ মৌলিক চাহিদার সবই তাদের বিপরীতমুখী। মানবেতর জীবনের প্রতিচ্ছবি এখন এই পরিবার। মা ফুলবানু, মেয়ে রেহানা আক্তার ও নুর ইসলাম হোসেন বলেন, ছোটবেলায় স্বাভাবিক চলাফেরা ছিল তাদের। ১০-১২ বছর বয়সে শরীরে জ্বর হয়, এরপর থেকে তাদের শারীরিক গঠন পরিবর্তন হতে থাকে। এখন তাদের চলাফেরা করতেও কষ্ট হয়। অন্যের জায়গার ওপর ভাঙা ঘরে বসবাস করছেন সবাই। অসুস্থ ভাইদের মধ্যে রাস্তার পাশে জাহাঙ্গীর হোসেন অস্থায়ী চায়ের দোকান আর বিল্লাল হোসেন নিজ বসতঘরে বিক্রি করেন বাচ্চাদের খাবার খেলনা। তাদের এই সামান্য বেচাকেনায় সংসার খরচ তো দূরের কথা নিজেদের ওষুধ কেনার সামর্থ্য হয় না। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বিত্তবানদের কাছে একটি ঘর, চলাচলের জন্য হুইলচেয়ার ও দোকানের মালামালের জন্য কিছু মূলধন সহায়তা চেয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের এই রোগটিকে জেনেটিক ডিজর্ডার বলা হয়। এটা ছোটকাল থেকে হয়ে থাকে। মেডিকেলশাস্ত্রে এটার খুব একটা চিকিৎসা নেই বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান জুয়েল। এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলার নবাগত জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, এত দিন পর্যন্ত এত ঘরবাড়ি কত কিছু দেওয়া হলো মানুষকে। কিন্তু তাদের জুটল না একটা ঘর। তাদের পাশে দাঁড়ানো ও একটা ঘর করে দেওয়াটাই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। খুব শিগগিরই উপজেলা বা যেকোনো মাধ্যমে তাদের বাড়ি পরিদর্শন শেষে একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।  

চোখে না দেখলেও থেমে নেই জীবন 

হাসান লিটন, ‎চরফ্যাশন (ভোলা)

মানুষ চোখে দেখে পথ খোঁজে, আর তিনি অন্ধকারেই দেখেছেন সম্ভাবনার আলো। জন্ম থেকে দৃষ্টিহীন, তবুও জীবনযুদ্ধে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা এক মানবিক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ভোলার চরফ্যাশন পৌরসভা ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত আবুল কাসেম সিকদারের ছেলে আবু সুফিয়ান (৩৩)। তিনি শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তৈরি করেছেন নিজের কর্মক্ষেত্র, নিজের সম্মানের জায়গা।

দৃষ্টিহীন আবু সুফিয়ান

চরফ্যাশন কলেজ রোডের পাশে প্রেস ক্লাব সংলগ্ন ভ্যান গাড়িতে করে ছোট একটি ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান পরিচালনা করছেন তিনি। শুক্রবার দুপুরের দিকে দেখা যায়, তিনি টিউবওয়েল থেকে পানি এনে নিজেই চা তৈরি করছেন। পরে কাস্টমারের কাছে চা, পান, সিগারেট, বিস্কুটসহ যাবতীয় পণ্য হাসিমুখে বিক্রি করছেন। এ সময় কথা হয় আবু সুফিয়ানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি জন্মের পর থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। কখনও দুই চোখে মা-বাবাকে দেখতে পাইনি। শুধু কথা বলার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ছয় বছর আগে বিয়ে করেছি, স্ত্রীর মুখও দেখতে পাইনি কিন্তু কথা বলেছি। আমার দাম্পত্য জীবনে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাদের মুখও আমি দেখিনি। আমার বিয়ের ৩ বছর পর আমার স্ত্রী আমার দৃষ্টি নেই বলে বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ১৮ বছর বয়স থেকেই আমি কারও কাছে ভিক্ষা না চেয়ে আত্মসম্মান বজায় রাখতে চায়ের দোকান করছি।

‎তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন দুপুরের পর বাড়ি থেকে বের হয়ে পায়ে হেঁটে হেঁটে, লাঠি নিয়ে খোঁজখুঁজি করে, স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে চরফ্যাশনে নিজের দোকানে হাজির হই। এরপর দোকান খুলে নিজেই টিউবওয়েল থেকে পানি এনে চা তৈরি করি। আমার চায়ের দোকানে নিয়মিত ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিক্রি হয়, যার থেকে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লাভ হয়। এই সামান্য আয়ের মধ্য দিয়েই আমি নিজেসহ সন্তান ও মা-বোনের ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছি। আমি সব ধরনের টাকা হাতের অনুমানের মাধ্যমে চিনতে পারি। আমাদের সমাজের মানুষ যেন শিখে যে, দৃষ্টি না থাকলেই মানুষ থেমে যায় না। যদি ইচ্ছাশক্তি থাকে, সবকিছু সম্ভব। আমি চাই সমাজ আমাদের মতো মানুষের মূল্যায়ন এবং সহায়তা করুক। পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. তানভির বলেন, চোখে না দেখে কেউ নিজের দোকান চালাতে পারেÑ সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আবু সুফিয়ান কাছ থেকে কেউ যদি চা, পান, সিগারেট ক্রয় করে, তাহলে সে সহজেই তা দিতে পারে। আমি নিজে সম্প্রতি তার দোকান থেকে একটি চা ও একটি পান খেয়েছি এবং ১০০ টাকার নোট দিয়েছি। তিনি হাত দিয়ে টাকা পরীক্ষা করে ৯০ টাকা সঠিকভাবে আমাকে ফেরত দিয়েছেন। এটি তার দক্ষতা ও সততার প্রমাণ। তার ধৈর্য, মনোবল ও পরিশ্রম আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা সবাই তাকে সম্মান করি। সদরের বাসিন্দা শামিম হোসেন বলেন, দৃষ্টিহীন হয়ে থাকলেও তিনি পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। সরকার যেন তার পাশে দাঁড়ায়, যাতে তার সংগ্রাম আরও সমৃদ্ধ হয়। চরফ্যাশন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মামুন হোসেন বলেন, আবু সুফিয়ানকে ভাতার আওতায় আনা হবে এবং তার দোকান উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা করা হবে।

দুহাত নেই, ইচ্ছেশক্তিতেই চলছে রুবেলের সংগ্রামী জীবন

মোকছেদুল মমিন মোয়াজ্জেম, হিলি (দিনাজপুর)

অদম্য ইচ্ছেশক্তি, মনোবল ও পরিশ্রমকে সঙ্গী করে সংগ্রামী পথচলা চালিয়ে যাচ্ছেন দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলার জালালপুর গ্রামের দুই হাতবিহীন যুবক রুবেল হোসেন। ভিক্ষার থালা নয়, গলায় ঝোলানো ডিমের ডালা নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় রাস্তায় নামেন তিনি। নিজের পরিশ্রমেই সংসারের চাকা ঘোরাতে চান এই অদম্য পঙ্গু মানুষটি। ২৫ বছর বয়সী রুবেলের জীবন শুরু হয় এক দুঃসহ দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগে, মাত্র ৮ বছর বয়সে বর্ষায় মাঠে গরু আনতে গিয়ে স্পর্শ করেন ঝড়ে ছিঁড়ে পড়ে থাকা বিদ্যুতের তারে। এতে তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। স্থানীয়রা মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, বাঁচাতে হলে দুই হাত কেটে ফেলতেই হবে। তখন থেকেই শুরু হয় রুবেলের নতুন জীবন, সংগ্রামের জীবন। রুবেলের বাবা বহু আগেই মারা গেছেন। অসহায় মা-ই তাকে বড় করেছেন নানা কষ্ট সহ্য করে। হাত না থাকায় নিজের শরীরের প্রয়োজনীয় কোনো কাজই তিনি নিজে করতে পারেন না। খাওয়া-দাওয়া থেকে গোসল, এমনকি পোশাক পরিবর্তন, সবই করেন রুবেলের মা বা প্রতিবেশীরা।

দুই হাতবিহীন যুবক রুবেল হোসেন

শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও কখনও ভিক্ষার পথে হাঁটেননি রুবেল। ছোটবেলা থেকেই দুই পায়ে ভর করে পালন করেছেন ছাগল। নিজের পরিশ্রমের ওপরই ছিল তার বিশ্বাস। বিয়েও করেছেন, সংসারে এসেছে এক কন্যা সন্তান। সংসারের চাহিদা বাড়ায় এখন ডিমের ব্যবসা করছেন তিনি। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই গলায় ডিম ভর্তি ডালা ঝুলিয়ে হিলি শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ঘুরে বিক্রি করেন সিদ্ধ ডিম। তার দুই হাত নেই, ফলে ডিমের খোসা ছড়িয়ে ক্রেতাকে দেওয়ার মতো কোনো উপায়ও নেই। তবুও মানুষ তাকে ফেলে যায় না। বরং নিজেরাই ডালা থেকে ডিম নিয়ে খোসা ছিঁড়ে খান, দামটা দিয়ে দেন রুবেলের পকেটে। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি ডিম বিক্রি করে তিনি আয় করেন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। হঠাৎ তাকে দেখে থমকে দাঁড়ান পথচারীরাও। বিস্ময়ের সঙ্গে মিশে থাকে মায়া, আর থাকে শ্রদ্ধা, কারণ ভিক্ষা নয়, নিজের সামর্থ্য ও পরিশ্রমের ওপর ভর করেই তিনি গড়ছেন নিজের স্বপ্ন। পাঁচবিবি থেকে কাজে হিলিতে আসা আইনুল হক বলেন, দূর থেকে দেখে ভাবলাম শীতের দিনে একটু ডিম খাব। কাছে এসে দেখি যুবকের দুহাতই নেই। নিজেই ডালা থেকে ডিম নিয়ে খোসা ছিঁড়ে খেলাম। সে চাইলে ভিক্ষা করতে পারত, কিন্তু করছে না। তার ইচ্ছেশক্তিকে আমি স্যালুট জানাই। নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে রুবেল বলেন, ছোটবেলায় কারেন্টে দুই হাত গেছে। মা অনেক কষ্ট করে আমাকে বড় করেছে। দুই বছর হলো বিয়ে করেছি, একটা মেয়ে হয়েছে। সংসারে খরচ বাড়ছে তাই বসে থাকলে হবে না। ডিমের ব্যবসা করছি। মানুষ খুব ভালো, সবাই দয়া করে আমাকে সাহায্য করে। ছোটবেলা থেকে পরিশ্রম করে আসছি, কখনও কারও কাছে হাত বাড়াইনি। অনেক আগে থেকেই পঙ্গু ভাতা পাই। ব্যবসা আর ভাতার টাকায় আল্লাহর রহমতে সংসার ভালোই চলছে।
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা