× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মোজা - একঘেয়ে নাকি চমকপ্রদ

মাহবুবা মিতু

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৭ পিএম

মোজা - একঘেয়ে নাকি চমকপ্রদ

মোজা আমাদের দৈনন্দিন পোশাকের এক অপরিহার্য অংশ, যা সাধারণত জুতার আড়ালে ঢাকা থাকে। মোজাকে আমরা পোশাকের একটি অতি সাধারণ এবং গৌণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ মোজা আমাদের রুচির কথা বলে, বয়সের গল্প বলে, এমনকি মনোজগতের ইঙ্গিতও দেয়। মোজা কেবল পায়ের সুরক্ষা বা উষ্ণতার জন্য ব্যবহৃত একটি সাধারণ অনুষঙ্গ নয়; বরং এটি হাজার বছরের বিবর্তনের সাক্ষী, যা গুহামানবের পশুর চামড়া থেকে শুরু করে আজকের ‘স্মার্ট সক্স’ পর্যন্ত এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।

একসময় যা ছিল কেবল আভিজাত্যের প্রতীক, আজ তা সুরক্ষা বা উষ্ণতার বাইরেও হয়ে উঠেছে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম। আমরা প্রতিদিন তাকে পড়ি, হারাই, খুঁজি, আবার নতুন করে কিনি। কিন্তু কখনও ভাবি না এই ছোট্ট কাপড়ের টুকরোটির যাত্রা কত প্রাচীন, কত বৈচিত্র্যময়। রঙ, নকশা কিংবা গল্পÑ এসব যেন মোজার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিলাস। কালো হলেই চলবে, সাদা হলেই নিরাপদÑ এই সরল সমীকরণেই আটকে আছে আমাদের অধিকাংশ মোজা-চিন্তা। এই ফিচার সেই অবহেলিত পোশাকটিকেই আলোয় আনতে চাই, জানাতে চাই মোজা কি আসলেই একঘেয়ে, নাকি সে নিঃশব্দে আমাদের জীবনের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ হয়ে আছে? 

ইতিহাসের পাতায় মোজা

প্রাচীন যুগ : মোজার ইতিহাস মানবসভ্যতার বিবর্তনের মতোই প্রাচীন। এটি কেবল একটি পোশাক নয়, বরং এটি মানুষের প্রয়োজন, প্রযুক্তি এবং সামাজিক মর্যাদার পরিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী। মোজার জন্ম হয়েছিল নিতান্তই ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকেÑ ঠান্ডা থেকে পা রক্ষা করা এবং জুতার ঘর্ষণ কমানোর জন্য। শুরুর দিকে মোজা আজকের মতো ছিল না। প্রস্তর যুগে মানুষ পশুর চামড়া বা গাছের ছাল দিয়ে পা মুড়ে রাখত। এটি ছিল মোজার আদিমতম রূপ। এরপর আসে প্রাচীন মিসরীয়দের যুগ, যারা মোজাকে একটি শিল্পে পরিণত করে। মিসরে পাওয়া বিশ্বের প্রাচীনতম মোজাটি প্রায় ১৬০০ বছরের পুরনো, যা ‘স্প্লিট-টো’ বা আঙুল আলাদা করা নকশার ছিল। অন্যদিকে প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা পশুর লোম বা মেষের চামড়া দিয়ে মোজা তৈরি করত। 

মধ্যযুগ : মধ্যযুগে এসে মোজা ধীরে ধীরে সামাজিক শ্রেণির প্রতীক হয়ে ওঠে। ইউরোপে উলের বা সিল্কের মোজা পরতেন মূলত অভিজাত শ্রেণি। মোজার রঙ, দৈর্ঘ্য আর কাপড় দেখে বোঝা যেত, পরিধানকারী কতটা প্রভাবশালী। 

শিল্পবিপ্লব : শিল্পবিপ্লব মোজার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাঁক। মেশিনে উৎপাদনের ফলে মোজা সস্তা হলো, সহজলভ্য হলো আর ধীরে ধীরে রাজকীয় আলমারি থেকে নেমে এসে মোজা জায়গা নিল শ্রমিকের পায়েও। এখান থেকেই মোজার পরিচয় বদলাতে শুরু করে লাক্সারি থেকে প্রয়োজনীয়তায়। 

ভারতীয় উপমহাদেশে

মোজার ব্যবহার জনপ্রিয় হয় তুলনামূলকভাবে দেরিতে। আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন মোজা ছিল শীতকালীন বা বিশেষ পোশাকের অংশ। তবে বর্তমানে স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম, অফিসের ফরমাল ড্রেস এই দুই জায়গা মোজাকে আমাদের জীবনে পাকাপাকি করে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোজা হয়ে ওঠে নিয়ম ও অভ্যাসের অংশ। 

একঘেয়েমি ভেঙে চমকপ্রদ ফ্যাশন

মোজার ইতিহাস যেমনই হোক, আধুনিক ফ্যাশন জগতে তা আর নিছক একটি ব্যবহারিক অনুষঙ্গ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোজা ভেঙে ফেলেছে তার চিরাচরিত একঘেয়েমির খোলস, আত্মপ্রকাশ করেছে এক নতুন পরিচয়ে। একসময় মোজা মানেই ছিল সাদা, কালো কিংবা ধূসর রঙের নির্ভরযোগ্য আবরণ। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে পরাই যার একমাত্র দায়িত্ব। আজ সেই ধারণা বদলে গেছে। মোজা এখন ‘স্টেটমেন্ট পিস’, যা পরিধানকারীর ব্যক্তিত্ব, রুচি ও সৃজনশীলতার নীরব ঘোষণা দেয়। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রঙ ও নকশার বিপ্লব। এখনকার মোজায় দেখা যায় জ্যামিতিক প্যাটার্ন, পপ আর্টের ছোঁয়া, কার্টুন চরিত্র এমনকি বিখ্যাত চিত্রকর্মের অনুকরণ। এই ধারার আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো ‘মিসম্যাচিং’ মোজা। এক জোড়া মোজা না মিলিয়ে, ভিন্ন ভিন্ন রঙ বা নকশার মোজা পরার প্রবণতা অনেকের কাছেই এখন স্টাইলের অংশ। এর ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় অপ্রথাগত চিন্তাভাবনা, হালকা রসবোধ ও এক ধরনের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। 

গোড়ালি ঢাকা ছোট মোজা থেকে শুরু করে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা মোজা প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন পোশাকের সঙ্গে তৈরি করছে ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল। পাশাপাশি বাঁশের সুতা বা রিসাইকেল করা উপাদান দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব মোজাও জায়গা করে নিচ্ছে ফ্যাশন সচেতন মানুষের ড্রয়ারে। শুধু রঙ বা নকশাই নয়, মোজার দৈর্ঘ্য ও উপাদানও এখন ফ্যাশনের ভাষা বদলে দিচ্ছে। মোজা কেবল ‘পায়ের জামা’ না, এটা যেন একটা ছোট্ট ক্যানভাস যেখানে মানুষ তার রঙ, পাগলামি, বিদ্রোহ আঁকতে পারে। এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মোজা আজ আর কেবল পায়ের আরামের উপকরণ নয়। তা হয়ে উঠেছে ফ্যাশন জগতের এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী তারকা; যাকে না দেখলেও উপেক্ষা করা যায় না।

মোজার মনস্তত্ত্ব

পোশাকই মনোভাব গঠন করে। মনোবিজ্ঞানের ‘এনক্লোদেড কগনিশন’ তত্ত্ব বলেÑ আমরা যা পরি তা আমাদের চিন্তাভাবনা, আচরণ ও মনোভাবকে প্রভাবিত করে। এই প্রেক্ষাপটে মোজা শুধু পোশাক নয়, এটি আমাদের মানসিকতার একটি সক্রিয় প্রকাশক। মোজা শুধু ফ্যাশনের অনুষঙ্গ নয়, অনেক সময় তা মানুষের মানসিকতার নীরব ভাষাও বটে। আমরা কী ধরনের মোজা পরি, সেই পছন্দের ভেতর লুকিয়ে থাকে আমাদের স্বভাব, নিরাপত্তাবোধ আর নিজেকে প্রকাশ করার ধরন। যারা প্রতিদিন একই রকম কালো বা গাঢ় রঙের মোজা পরেন, তাদের মধ্যে সাধারণত শৃঙ্খলা আর স্থিরতার প্রতি ঝোঁক দেখা যায়। তারা ঝামেলা এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন, পোশাকে বাড়তি মনোযোগ দিতে চান না। মোজা তাদের কাছে আরামের প্রতীক, আলাদা করে কিছু বলার মাধ্যম নয়। অন্যদিকে যারা রঙিন, নকশাদার বা অদ্ভুত প্যাটার্নের মোজা বেছে নেন, তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা আর খেলাচ্ছল মনোভাব বেশি লক্ষ করা যায়। তারা জানেন, এই মোজা হয়তো সবার চোখে পড়বে না, তবু নিজের জন্যই সেটুকু আনন্দ রাখতে চান। অনেক সময় এটি হয়ে ওঠে আত্মপ্রকাশের নিরাপদ জায়গা, যেখানে বড় কোনো ঝুঁকি না নিয়েও নিজের আলাদা সত্তাটা ধরে রাখা যায়। মিসম্যাচড মোজা পরা মানুষদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও মজার। এক পায়ে এক রঙ, অন্য পায়ে আরেক রঙ এই ইচ্ছাকৃত অসম্পূর্ণতা অনেক সময় নিখুঁততার চাপ থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়। এরা সাধারণত জীবনের ছোটখাটো বিশৃঙ্খলাকে সহজভাবে নিতে পারেন, নিয়ম ভাঙতে ভয় পান না। আবার এমনও মানুষ আছেন, যারা বিশেষ দিন বা বিশেষ মনের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে মোজা বেছে নেন। কোনো আনন্দের দিনে উজ্জ্বল রঙ, মন খারাপের দিনে নিরপেক্ষ রঙ এই অভ্যাস দেখায়, মোজা তাদের কাছে কেবল কাপড় নয়, অনুভূতির সঙ্গীও। বাইরের জগতে না বললেও নিজের সঙ্গে নিজের এই ছোট বোঝাপড়াটুকু তারা ধরে রাখতে চান।

এভাবে দেখলে বোঝা যায়, মোজা কখনোই একঘেয়ে নয়। আমরা হয়তো তাকে গুরুত্ব দিই না, কিন্তু সে নীরবে আমাদের মানসিক অবস্থা, রুচি আর ব্যক্তিত্বের গল্প বলে যায় প্রতিদিন, প্রতিটি পায়ে।

বয়সভেদে মোজার ভাষা 

শিশু বয়সে মোজা এক রঙিন আশ্রয়। নরম সুতায় বোনা কার্টুন চরিত্র বা জ্বলজ্বলে নকশাগুলো শিশুদেরও বেশ পছন্দের। কিশোর বয়সে, মোজা হয়ে ওঠে স্কুলের ইউনিফর্ম বা সামাজিক নিয়মের ফাঁক গলে নিজস্বতার প্রথম দূত। উজ্জ্বল রঙ, সাহসী প্যাটার্ন কিংবা ইচ্ছাকৃত অমিল প্রতিটি বৈশিষ্ট্য চিহ্ন বিদ্রোহের ক্ষুদ্র কিন্তু বলিষ্ঠ মাধ্যম।

প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে, মোজা লুকিয়ে রাখা এক টুকরো ব্যক্তিগত রাজ্য। অফিসের ফরমাল পোশাকের নিচে লুকিয়ে থাকা রঙিন বা হাসির নকশার মোজা দায়িত্বের জগতে জীবনের জটিলতার মাঝেও নিজের স্বাদের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।

প্রৌঢ় বয়সে মোজা সব ছাপিয়ে হয়ে ওঠে কোমল যত্নের প্রতীক। তখন নকশা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হয় উষ্ণতা, আরাম ও নরম স্পর্শ। এভাবে একজোড়া সাধারণ মোজাও হয়ে ওঠে জীবনের নীরব সাক্ষী। বয়সের ভিন্ন পরতে ভিন্ন অর্থ ধারণ করে, আমাদের পরিণত হওয়ার গল্প বলে চলে।

মোজার দাম ও প্রাপ্তিস্থান

সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মোজার দাম আর সহজলভ্যতা দুটোই পেয়েছে নতুনরূপ ও বিস্তৃতি। সাধারণ কটন মোজা এখনও পাওয়া যায় তুলনামূলক কম দামে, বিশেষ করে স্থানীয় বাজারগুলোয়। স্কুল বা দৈনন্দিন ব্যবহারের সাদামাটা মোজা সাধারণত সহজলভ্য এবং বাজেটবান্ধব। অন্যদিকে নকশাদার, থিমভিত্তিক বা উন্নত মানের সুতা দিয়ে তৈরি মোজার দাম কিছুটা বেশি হলেও তা আর বিলাসের পর্যায়ে পড়ে না। মোজা এখন এমন এক ফ্যাশন অনুষঙ্গ, যেখানে অল্প খরচেও নিজের রুচির প্রকাশ সম্ভব।

ঢাকায় মোজা কিনতে সবচেয়ে পরিচিত জায়গা হলো নিউমার্কেট, চকবাজার, গাউছিয়া বা ফুটপাতের দোকানগুলো। এসব জায়গায় একদিকে যেমন কম দামের সাধারণ মোজা পাওয়া যায়, তেমনি খুঁজলে রঙিন ও নকশাদার মোজাও মিলতে পারে। তবে মানের তারতম্য এখানে বেশি, তাই কাপড় আর সেলাই ভালো করে দেখে নেওয়ার অভ্যাস জরুরি। শীতকালে এসব বাজারেই উলের বা মোটা মোজার ভালো সংগ্রহ দেখা যায়।

যারা একটু ভিন্নধর্মী বা স্টেটমেন্ট মোজা খুঁজছেন, তাদের জন্য ব্র্যান্ডেড দোকান ও অনলাইন প্লাটফর্ম এখন বড় ভরসা। দেশীয় কিছু ফ্যাশন ব্র্যান্ড এবং অনলাইন শপে পাওয়া যাচ্ছে থিমভিত্তিক, মিসম্যাচড বা পরিবেশবান্ধব মোজা। অনলাইনে কেনাকাটার সুবিধা হলো ডিজাইন দেখার সুযোগ বেশি, রঙ ও প্যাটার্নের বৈচিত্র্যও তুলনামূলক বেশি। তবে ছবি আর বাস্তব পণ্যের মিল যাচাই করার জন্য রিভিউ দেখা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

মোজা নীরব এক সহচর, যা ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকে শুরু হয়ে আজ ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ হয়ে উঠেছে। এর রঙ, নকশা ও দৈর্ঘ্য প্রতিটি বয়সে ভিন্ন গল্প বলে শিশুর আনন্দ, কিশোরের বিদ্রোহ, প্রাপ্তবয়স্কের স্বাধীনতা, বয়স্কের কোমল যত্ন বই ধরা পড়ে এই ছোট্ট বস্তুতে। এটি এখন কেবল আরামদায়ক পোশাক নয়, ব্যক্তির রুচি ও সৃজনশীলতার নীরব আয়নাও বটে।


ছবি - সক এন' রোল 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা