রাসেল আহমদ
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪০ পিএম
পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অববাহিকা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (জিবিএম)-এর মেঘনা অংশের অন্তর্ভুক্ত এই হাওরাঞ্চলে শত শত বছর ধরে বন্যার সঙ্গে খাপখাইয়ে বেঁচে রয়েছে হিজল। হাওরাঞ্চলে হিজল শুধু একটি গাছ নয়, হাওরবাসীর জীবনের অংশ, বন্যা অধ্যুষিত জলমগ্ন নিম্নাঞ্চল বা প্লাবনভূমির প্রতীকী সবুজ এই হিজল গাছ।
হাওর জনপদের চিরচেনা বৃক্ষ হিজল যেন প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যের আধার। হাওরের উত্তাল ঢেউ-বানে অশান্ত জলের মাঝেও ভারী পত্রপল্লবে শনশন রণ ঝংকার তুলে অবলীলায় দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছ হাওরাঞ্চলের প্রকৃতিকে করে তোলে অনন্য। কখনও সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল বন, আবার কখনোবা নৈসর্গিক প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে রয় হিজল, যা বর্ষায় হাওরের রূপকে আরও মোহময় করে।
হিজল গাছ হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। প্রকৃতির আপন খেয়ালেই হাওরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত হিজল বন এবং জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বহুভাবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে এই বনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করেছে, আর হিজল গাছ ও হিজল বন তাদের দিয়েছে ছায়া, কাঠ এমনকি বন্যা প্রশমনের স্বাভাবিক সুরক্ষা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে করা নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা পরিবর্তনে হিজলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর আশঙ্কার কথা বলছে।
হিজল মাঝারি আকারের চিরহরিৎ গাছ; উচ্চতা ১০-১৫ মিটার। হিজলের বৈজ্ঞানিক নাম ‘ব্যারিংটোনিয়া অ্যাকুতাংলা’। সংস্কৃত নাম ‘নিচুল’। ফুল শেষে তিতা ও বিষাক্ত ফল ধরে, যা দেখতে অনেকটা হরীতকীর মতো। কাঁচা ফলই বিষাক্ত, তবে শুকনো ফলের বীজ গুঁড়ো করে খেলে কিছু পেটের সমস্যা নিরাময়ে উপকার পাওয়া যায়। এ ছাড়া গাছটিতে নানা ঔষধি গুণ রয়েছে।
হিজলের প্রাকৃতিক বিস্তার মূলত বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল ও ভারতের প্লাবণভূমিতে। তবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা পরিবর্তন ও জলীয় বাষ্পের তারতম্যের কারণে আগামী কয়েক দশকে হিজলের বিস্তার এলাকা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে বলে গবেষকদের পূর্বাভাস। জলবায়ু মডেল বিশ্লেষণ করে তারা জানাচ্ছেন, হিজলের আদর্শ আবাসভূমি ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০.৫৭ শতাংশ কমে যাবে। তাই আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় হিজল অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।
হাওর অঞ্চলে প্রান্তিক মানুষের বড় জীবিকা মাছ ধরা ও মাছ চাষ। আর এই কাজে হিজল গাছের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিজলের ডালপালা পানির দিকে ঝুঁকে থাকে, মাছ চাষিরা এসব ডাল ঘেরে পুঁতে রাখেন। এতে ছোট মাছ শিকারি প্রাণীর হাত থেকে আশ্রয় পায়। চুরি প্রতিরোধেও এই ডাল কার্যকর। হিজলের রুক্ষ বাকলে জন্মানো শ্যাওলাও মাছের প্রিয় খাদ্য।
গবেষণা নিবন্ধের লেখক, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অরুণ জয়থী নাথ বলেন,
‘হিজল সংরক্ষণ প্রকৃতি ও প্রান্তিক মানুষের জীবন দুটোর জন্যই অত্যন্ত জরুরি।’
ভারতের আসামেও হিজলবাগ ও মাছ চাষ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই এ গাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ শুধু পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকও।
হাওরাঞ্চলে বা প্লাবনভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে হিজল হাওরের কান্দা (যে ভূমি বছরের ছয় মাস জলমগ্ন ও ছয় মাস শুকনো থাকে), হাওরের জাঙ্গাল, খাল-বিল, নদী-নালা ও ডোবার ধারে জন্মায়। এসব নিম্নভূমি বর্ষাকালে বন্যা প্লাবিত হয় প্রতি বছর। তবে সাগরপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জমিতে জন্মায় হিজল গাছ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকায়ও রয়েছে হিজল। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকা হিজলের জন্য আদর্শ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে এই ছন্দ ভেঙে যাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত তীব্র খরা ও আকস্মিক বন্যা দুই ধরনের চরম পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। হিজল গাছের বংশবিস্তার এতে বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ বন্যার মৌসুমেই হিজল গাছ তার বীজ ছড়িয়ে দেয়। বীজের উর্বরতা ও পরিমাণনির্ভর করে বাতাসে যথেষ্ট পরিমাণ আর্দ্রতা থাকার ওপর।
অরুণ জয়থী নাথ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে প্লাবনভূমি বা হাওরাঞ্চলই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওঠানামা এখানকার বাস্তুসংস্থানকে ক্রমেই দুর্বল করছে।
গবেষণায় বাংলাদেশ ও ভারতের ২৪ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১,৯৯,০৬৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা হিজলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু ২০৫০ সালে তা নেমে আসতে পারে মাত্র ১,৬৬৯ বর্গকিলোমিটারে।
দেশভিত্তিক বিশ্লেষণ আরও উদ্বেগজনক
বাংলাদেশে এখন ৯৫,৫৪১ বর্গকিলোমিটার এলাকা উপযোগী। ২০৫০ সালে এটি কমে হবে ৩৪,৮০১ বর্গকিলোমিটার।
ভারতে বর্তমানে ১,০৩,৫২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা আদর্শ; ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়াবে ৬৫,৮৬৮ বর্গকিলোমিটার।
হাওরাঞ্চল বা প্লাবনভূমিতে দূষণ, দখল, শিল্পকারখানা স্থাপন ও রাসায়নিক কৃষি সম্প্রসারণ বহু বছর ধরেই চলছে। এতে প্রাকৃতিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে গাছ, মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণের নিরাপদ আবাস।
কানাডার সাসকাচেয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এইচএম তৌহিদূর রহমান বলেন,
উজানে বন উজাড়ে ভূমিক্ষয় বাড়ছে। সেই পলি নিচু প্লাবনভূমিকে ভরাট করে, ফলে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এতে হিজলের মতো জলামগ্নতা-নির্ভর গাছ বাঁচতে পারে না।
তিনি বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন,
আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা দূর করা গেলে পরিকল্পনা ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে হিজল সংরক্ষণ অনেক বেশি কার্যকর হবে।