× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জেলের জালে জীবিকার লড়াই

মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:১৬ পিএম

জেলের জালে জীবিকার লড়াই

শীতের শান্ত সাগরে আবারও ফিরেছে বড় টানা জালের মৌসুম। এ মৌসুমে নির্ধারিত এলাকায় জেলেরা বৈধ সময় ও নিয়ম মেনে টানা জাল ব্যবহার করে মাছ আহরণ করে থাকেন। বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা টেকনাফ উপকূলে ভোরের আলো ফোটার আগেই জেলেদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। জীবিকার টানে দলবদ্ধভাবে সাগরে নামা এসব জেলের টানা জালে ধরা পড়ছে নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। এতে আশার আলো দেখছেন জেলেরা।

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন উপকূলে নিবন্ধিত জেলে আছেন সাড়ে ১০ হাজার। তার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন। বাকি সাত হাজার উপকূলের কাছাকাছি সাগরেই মাছ ধরেন। এসব জেলের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫৩২টি নৌযান রয়েছে। বেশিরভাগ জেলে মূলত অন্যের নৌযানে কামলা খাটেন। তাদের মধ্যে কেউ ২০ বছর ধরে মাছ ধরছেন; কারও অভিজ্ঞতা ৩০-৪০ বছরের। তারা সাগরে নামলে ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেন আর বাড়ি ফেরেন দারিদ্র্যের সঙ্গে। বয়স বাড়লেও পেশা বদলানোর সুযোগ নেই; সমুদ্রই তাদের একমাত্র ভরসা।

১২ বছর বয়স থেকে সাগর উপকূলে মাছ ধরছেন নুর আহমেদ (৫৫)। তিনি টেকনাফের মেরিন ড্রাইভের তুলাতুলি সাগর পাড়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি নৌকার মালিক এবং মাঝিও। ৪২ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছি। এটি আমার বাপ-দাদার পেশা। আমরা ডোবা জাল, ভাসা জাল ও টানা জাল দিয়ে উপকূলের কাছাকাছি সাগরে মাছ ধরি। গোটা জীবন পার করে দিলাম, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা কখনও পাইনি। সাগরে গিয়ে সংসারে সচ্ছলতা আনতে পারিনি। আমাদের এলাকার প্রায় প্রতি ঘর থেকে পুরুষরা সাগরে যান। চার দশকেও সংসারে সচ্ছলতা আনতে পারিনি। সব সময় দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছি আমরা।’

সাধারণত শীতের শেষভাগ থেকে গ্রীষ্মের শুরু পর্যন্ত সমুদ্র শান্ত থাকলে টানা জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। প্রতিটি জালে গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন জেলে একসঙ্গে কাজ করেন। এ সময় গভীর সমুদ্রে মাছের পরিমাণ কম থাকায় অধিকাংশ জেলেই টানা জাল নিয়ে উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরায় যুক্ত হন।

দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগেই বঙ্গোপসাগরের টেকনাফ উপকূলে জড়ো হয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ছেন জেলেরা। শান্ত সমুদ্র আর কম ঢেউয়ের সুযোগে বিশাল আকৃতির টানা জাল ফেলে সাগর থেকে মাছ ধরে দলবদ্ধভাবে কূলে টেনে আনছেন তারা।

এই মৌসুমে টানা জালে রূপচাঁদা, ছুরি, পুপা, ফাইসা, চিংড়ি, চাবিলা, সুন্দরী, লাল কোরাল, দাতিলা, কালো চাঁদাসহ নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে। স্থানীয় বাজারে এসব মাছের বেশ চাহিদা রয়েছে।

টানা জালের মাঝি মো. আবদুল হক, তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে সমুদ্রে মাছ ধরছেন। তার পূর্বপুরুষরাও জেলে ছিলেন এবং আগের প্রজন্মের কাছ থেকেই তিনি এই পেশার কৌশল শিখে মাঝি হয়েছেন। টানা জালে মাছ ধরতে সাধারণত ২০-২৫ জন জেলে প্রয়োজন হয়। খুঁটির সঙ্গে জাল পেঁচিয়ে ধীরে ধীরে টেনে কূলে আনা হয়।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মাছ উপকূল থেকে দূরে সরে গেছে। পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির হাতে জেলেরা আটক হওয়ার আশঙ্কায় বড় বড় ট্রলিং বোটগুলো উপকূলের কাছাকাছি মাছ ধরছে। এতে টানা জাল দিয়ে জেলেরা আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। এখন যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়।’

অন্য এক জেলে জানান, তারা ভোরে সমুদ্রে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসেন। সারা দিন প্রচণ্ড কষ্ট করতে হয়। সিজনে বড় মাছ পাওয়া গেলে বিক্রি করে কিছুটা ভালো আয় করা সম্ভব হয়। পরিবারের খাদ্যের জোগান দিতে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে তাদের। আর কিছুদিন পর হয়তো বেশি মাছ পাওয়া যাবে।

স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ আহমেদ বলেন, ‘বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে টেকনাফে হাজারো জেলে জীবিকা নির্বাহ করেন। টেকনাফকে শুধু মাদকের জন্য নয়, বরং মাছের স্বর্গরাজ্য হিসেবেও পরিচিত করা উচিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাছের ব্যাপারিরা এখানে মাছ কিনতে আসেন এবং বঙ্গোপসাগরের মাছ সারা বাংলাদেশে সরবরাহ হয়।

সৈকতের কাছে টানা জালে মাছ শিকারে ব্যস্ত ছিলেন জেলে ও নৌকার মালিক আবদুর রশিদ বলেন, ‘৩২ জন জেলেকে দুই ভাগ করে ভোর থেকে টানা জালে মাছ ধরছি। বেলা ৩টা পর্যন্ত দুবার জাল টানা শেষ হয়েছে আমাদের। প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাছ বিক্রি করেছি।’ মাঝি বলেন, ‘মাছ তীরে আনার পর সেখানেই বিক্রি হয়ে যায়। কিছু মাছ তারা কাঁচাবাজারে নেন, কিছু শুঁটকির জন্য পাঠিয়ে দেন শুঁটকি মহালে। অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রভাব টেকনাফে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এখানে গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতÑ এই তিনটি ঋতু। পুরোপুরি শীত আসলে প্রচুর মাছ ধরা পড়ার আশা আছে। মূলত ২২ ও ৫৮ দিন মাছ ধরা বন্ধের সময় জেলেরা সরকারিভাবে চাল সহায়তা পান। সামনে সহায়তা আরও বাড়াবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা