মাহমুদা বিশ্বাস
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৬ পিএম
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৭ পিএম
ডিজিটাল যুগে ভাষার ভবিষ্যৎ আর কেবল আবেগ, ঐতিহ্য বা সাহিত্যচর্চার ওপর নির্ভর করে না-এখন তা নির্ভর করে প্রযুক্তির সঙ্গে ভাষার অভিযোজন ক্ষমতার ওপর। যে ভাষা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নিতে পারে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে ভাষা বৈশ্বিক যোগাযোগের কেন্দ্র থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। এই বাস্তবতায় বাংলা ভাষার জন্য এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করলো বাংলাদেশ। দেশের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বাংলা প্ল্যাটফর্ম ‘কাগজ ডট এআই (kagoj.ai)’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। একইসঙ্গে উন্মোচন করা হয়েছে নতুন বাংলা ফন্ট ‘জুলাই’, যা দাপ্তরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক লেখালেখিকে আরও আধুনিক, সহজ ও মানসম্মত করে তুলবে।
এই দুটি উদ্যোগ একসঙ্গে বাংলা ভাষার ডিজিটাল সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ‘কাগজ ডট এআই’ যেখানে বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে বাস্তব রূপ দিচ্ছে, সেখানে ‘জুলাই’ ফন্ট বাংলা লেখার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার একটি কার্যকর সমাধান হয়ে উঠছে।
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব
সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে এই দুটি সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব ‘কাগজ ডট এআই’ ও ‘জুলাই’ ফন্টের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জহিরুল ইসলাম, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ভাষাবিদ ও গবেষকরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানজুড়ে একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে-এটি কেবল একটি প্রযুক্তি পণ্যের উদ্বোধন নয়, বরং বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলধারায় নিয়ে আসার একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
“বাংলাকে প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতেই এই উদ্যোগ”
উদ্বোধনী বক্তব্যে ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন, “বাংলা ভাষাকে শুধু আবেগের জায়গায় রেখে দিলে চলবে না। এটিকে প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতেই ‘কাগজ ডট এআই’ তৈরি করা হয়েছে।” প্ল্যাটফর্মটি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর গত দুই সপ্তাহে প্রায় চার হাজার ব্যবহারকারী এটি ব্যবহার করেছেন এবং প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল পাওয়া গেছে। ব্যবহারকারীদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করেছে।
তিনি আরও বলেন, খুব শিগগিরই বাংলা ভাষাকে আরও উন্মুক্ত করতে এপিআই (API) উন্মুক্ত করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে সোর্স কোড ওপেন সোর্স করা হবে। এর ফলে দেশি ও আন্তর্জাতিক ডেভেলপাররা বাংলা ভাষাভিত্তিক নতুন অ্যাপ্লিকেশন, সেবা ও গবেষণার সুযোগ পাবেন।
কীভাবে কাজ করবে ‘কাগজ ডট এআই’
‘কাগজ ডট এআই’ একটি সমন্বিত বাংলা এআই প্ল্যাটফর্ম, যা মূলত বাংলা ভাষাভিত্তিক লেখালেখি ও ভাষা প্রক্রিয়াকরণকে সহজ করার জন্য তৈরি।
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা-বাংলা কনটেন্ট লেখা ও সম্পাদনা,দাপ্তরিক নথি ও আবেদনপত্র তৈরি,প্রতিবেদন ও প্রাতিষ্ঠানিক চিঠিপত্র প্রস্তুত,ভাষা বিশ্লেষণ ও কনটেন্ট জেনারেশন -এর মতো কাজগুলো দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করতে পারবেন।
বিশেষ করে সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এবং কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এটি একটি কার্যকর ডিজিটাল সহকারী হিসেবে কাজ করবে। বাংলা ভাষায় দাপ্তরিক কাজের যে সময়সাপেক্ষতা ও জটিলতা ছিল, এই প্ল্যাটফর্ম তা অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নৃগোষ্ঠীগত ভাষা সংরক্ষণে বড় পরিকল্পনা
এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীগত ভাষা সংরক্ষণ। ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব জানান, প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর ভাষা থেকে পর্যায়ক্রমে ১০ হাজার মিনিটের ওরাল ডেটা সংগ্রহ করা হবে।
এই ডেটার ভিত্তিতে তৈরি হবে শক্তিশালী বাংলা ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LML)। এর মাধ্যমে শুধু বাংলা নয়, দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র ভাষাগুলোও ডিজিটাল ও সাইবার স্পেসে সংরক্ষণের সুযোগ পাবে। ভাষাবিদদের মতে, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অমূল্য সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পদ হয়ে থাকবে।
‘জুলাই’ ফন্ট: দাপ্তরিক বাংলার নতুন মানদণ্ড
একই অনুষ্ঠানে উন্মোচন করা হয় নতুন বাংলা ফন্ট ‘জুলাই’। এটি বিশেষভাবে দাপ্তরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটারভিত্তিক বাংলা লেখায় অক্ষরের গঠন, স্পেসিং ও পাঠযোগ্যতা নিয়ে নানা সমস্যা ছিল। ‘জুলাই’ ফন্ট সেই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করার লক্ষ্যেই তৈরি।