নুপা আলম
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৪ পিএম
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:২৬ পিএম
প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, যেটা বাংলাদেশের মানচিত্রে সর্ব দক্ষিণে অবস্থান। যেটি কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের ১২০ কিলোমিটার শেষ হয়েছে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায়। ওখান থেকেও দ্বীপটির দূরত্ব ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে।
আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্টমার্টিন দ্বীপের তিন দিকের ভিত শিলা; যা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে। এ দ্বীপ উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৫.৬৩ কিলোমিটার লম্বা। দ্বীপের প্রস্থ কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। দ্বীপটির পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত অগণিত শিলাস্তূপ আছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের গড় উচ্চতা ৩.৬ মিটার। সেন্টমার্টিনের পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার প্রবাল প্রাচীর। ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তর অংশকে বলা হয় নারিকেল জিঞ্জিরা বা উত্তরপাড়া। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় দক্ষিণপাড়া এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বদিকে বিস্তৃত একটি সংকীর্ণ লেজের মতো এলাকা। সংকীর্ণতম অংশটি গলাচিপা নামে পরিচিত। দ্বীপের দক্ষিণে ১০০ থেকে ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের ছোট দ্বীপ আছে; যা স্থানীয়ভাবে ছেঁড়াদিয়া বা সিরাদিয়া/ছেঁড়া দ্বীপ নামে পরিচিত। এটি একটি জনশূন্য দ্বীপ। ভাটার সময় এই দ্বীপে হেঁটে যাওয়া যায়।

দ্বীপের জীবন ও প্রকৃতির নিবিড় বন্ধন
সাগরের স্বচ্ছ নীলজলের বুকে জেগে থাকা একটি প্রবালদ্বীপ যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা একটি নিখুঁত চিত্রকর্ম। সাদা বালুর বুকে আছড়ে পড়া নীল ঢেউ, দিগন্তজোড়া আকাশ আর নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা, প্রাকৃতিক নানা বিস্ময়কর সৌন্দর্যের দ্বীপটি। যেখানে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দ্বীপের রূপ বদলে যেতে থাকে। সূর্য যখন সমুদ্রের বুক চিরে উঠে আসে, তখন জলরাশি রূপ নেয় রুপালি আর সোনালি আলোর মিশেলে। ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে যায় পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। শহুরে কোলাহল থেকে বহু দূরে, এখানে এসে মানুষ যেন নিজের ভেতরের শব্দই বেশি শুনতে পায়।
সেন্টমার্টিন কেবল পর্যটকদের জন্য নয়, এটি কয়েক হাজার মানুষের স্থায়ী ঠিকানাও বটে। জেলেদের ভোর শুরু হয় সূর্য ওঠার আগেই। ছোট নৌকায় সমুদ্রে পাড়ি দেন তারা, ফেরেন সন্ধ্যার আগে মাছভর্তি ঝুড়ি নিয়ে। নারকেল বাগান, শুঁটকি শুকানো, ছোট দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সব মিলিয়ে দ্বীপের অর্থনীতি ঘুরে চলে পর্যটন ও মৎস্যনির্ভর জীবনের ওপর।
প্রবাল দ্বীপ হওয়ায় সেন্টমার্টিনের পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানকার নীলজল, সামুদ্রিক শৈবাল, রঙিন মাছ, ছোট-বড় কাঁকড়া, শামুক আর ঝিনুক সবই একটি নাজুক বাস্তুতন্ত্রের অংশ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক দূষণ, অতিরিক্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠার ফলে এই পরিবেশ আজ বড় ধরনের হুমকির মুখে।
ছেঁড়াদ্বীপ : নীলজলের গোপন কবিতা
সেন্টমার্টিনে গেলেই যেন আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া হয় ছেঁড়াদ্বীপের দিকে। ভাটার সময় হেঁটে বা ট্রলারে করে যাওয়া যায় এই নির্জন দ্বীপে। সেখানে নেই কোনো স্থায়ী বসতি, নেই কোলাহল। শুধু বিস্তীর্ণ বালুচর, নীলজল আর নিঃসঙ্গতা। সূর্যাস্তের সময় ছেঁড়াদ্বীপ যেন এক নিখুঁত রঙিন ফ্রেম লাল, কমলা আর বেগুনি রঙে ধরা দেয় আকাশ।
অনেক পর্যটকের কাছেই ছেঁড়াদ্বীপ মানে জীবনের সবচেয়ে শান্ত কয়েক ঘণ্টা। কেউ বসে থাকে পাথরের ওপর, কেউ পানিতে পা ভিজিয়ে, কেউ আবার নীরবে সূর্য ডোবার দৃশ্যধারণ করে ক্যামেরায়।
যাতায়াত : দীর্ঘ পথ, তবে অভিজ্ঞতায় ভরা
একসময় টেকনাফ জেটিঘাট থেকে ট্রলার বা পর্যটকবাহী জাহাজে সেন্টমার্টিন যাওয়া যেত। এখন সেই সুযোগ নেই। তার কারণ টেকনাফের নাফ নদের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখন আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর সংঘাত চলছে। ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে কক্সবাজার শহর থেকেই জাহাজে যাত্রা করতে হয়। একসময় নভেম্বর থেকে মার্চ এই পাঁচ মাসই এই দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু পরিবেশগত কারণে সরকারি সিদ্ধান্ত মতে নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। দ্বীপে এখন কেবল ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি এই দুই মাস রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে। একই দুই মাসই মূলত কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়াস্থ বিআইডব্লিউটিএর ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে জাহাজ।
-69425ce16648b.jpg)
সকালের জাহাজে উঠলে দীর্ঘ জলপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৭ ঘণ্টা। এই যাত্রাপথই অনেকের কাছে রোমাঞ্চ। সমুদ্রে ১৩০ কিলোমিটার নীলজলের বুকে ছুটে চলা জাহাজ, মাঝেমধ্যে উড়ন্ত সামুদ্রিক পাখি, আকাশ-জল একাকার হয়ে যাওয়ার দৃশ্য সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। যেখানে পথে পথে নৌযান, মাছ শিকারের দৃশ্য আর বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের ১২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শিল্পীর আঁকা ছবির মতো বসতি আর পাহাড়।
ফলে পর্যটকদের কাছে ভ্রমণ হয়ে ওঠে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার। তাই ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রফিকুল আনোয়ার বলছিলেন, ‘এখানে এসে মনে হয় যেন বাংলাদেশ নয়, কোনো বিদেশি দ্বীপে চলে এসেছি। এত নীল পানি, এত শান্ত পরিবেশÑ শহরে এসব কল্পনাও করা যায় না।’
রাইসা অর্পনা নামের এক তরুণী পর্যটক জানান, জীবনে প্রথমবার সমুদ্র এত কাছ থেকে দেখলাম, ঢেউ ছুঁয়ে আছে পায়ের আঙুল। মনে হয় সব দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে যাচ্ছে।
অনেকের কাছে সেন্টমার্টিন মানে প্রেমের ঠিকানা, কারও কাছে নিঃসঙ্গতা কাটানোর আশ্রয়, আবার কারও কাছে এটি শুধুই অ্যাডভেঞ্চারের স্বর্গ। সূর্যাস্তের সময় সৈকতে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখে তখন এক ধরনের প্রশান্তি দেখা যায়, যা শহুরে জীবনে দুর্লভ।
যত মোহ তত শঙ্কা
যতটা মোহময় সেন্টমার্টিন, ততটাই শঙ্কার। প্রতি বছর লক্ষাধিক পর্যটকের আগমনে দ্বীপের পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্ট সব মিলে সৈকত ও সমুদ্র দূষিত হচ্ছে। প্রবাল ভাঙা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, পানির মান নষ্ট হওয়াÑ এসব এখন বড় বাস্তবতা।
এসব বিবেচনায় সেন্টমার্টিন দ্বীপের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ব্যাপারে গত ২২ অক্টোবর ১২টি নির্দেশনাসহ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।
সরকারি সিদ্ধান্ত মতে, বঙ্গোপসাগরের বুকে আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস দ্বীপটিতে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন পর্যটকরা। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিনে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে পর্যটকদের মানতে হবে সরকারের ১২টি নির্দেশনা।
সরকারি প্রজ্ঞাপন মতে, নভেম্বরে পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় দ্বীপটি ভ্রমণ করতে পারবেন। রাত যাপন করতে পারবেন না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি দুই মাস রাত যাপনের সুযোগ থাকবে।
এ ছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ১২টি নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচলের অনুমতি পাবে না। পর্যটকদের অবশ্যই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। সেখানে প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোড সংযুক্ত থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।
তথ্য অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সেন্টমার্টিন দ্বীপে যেতে পারবেন পর্যটকরা। আগামী বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার ৯ মাসের জন্য দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। দ্বীপে ভ্রমণের সময়সূচি এবং পর্যটক উপস্থিতিও এবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করতে পারবেন না।
পর্যটকদের ভ্রমণকালে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষেধ। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
ভ্রমণকালে নিষিদ্ধ পলিথিন বহন করা যাবে না এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক, যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুই বছর ধরেই এমন সিদ্ধান্তের আলোকে দ্বীপের পরিবেশ বদলে যাওয়ার কথা বলেছেন অনেকেই।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে সরকার সেন্টমার্টিনে পর্যটক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিÑ এ চার মাস সেখানে পর্যটক সীমিত থাকবে। নভেম্বরে পর্যটকরা যেতে পারবেন, কিন্তু রাত্রিযাপন করতে পারবেন না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি পর্যটক সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন না। ফেব্রুয়ারি মাসে সেন্টমার্টিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজে পর্যটক যাওয়া বন্ধ রাখা হবে। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে বাস্তবায়নও করা হচ্ছে। পর্যটক সীমিতকরণের পর সেন্টমার্টিন দ্বীপে একদিকে যেমন ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার কমে গেছে, অপরদিকে দ্বীপের সার্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ সংরক্ষণ হচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
সেন্টমার্টিন : কেবল একটি ভ্রমণ নয়
সেন্টমার্টিন কোনো সাধারণ পর্যটন স্পট নয়, এটি এক অনুভূতির নাম। এখানে এসে মানুষ শুধু সমুদ্র দেখে না, দেখে নিজের ভেতরের এক টুকরো নির্জনতা। নোনা হাওয়ার স্পর্শে ক্লান্ত মন হালকা হয়ে যায়, ঢেউয়ের তালে তালে সব দুশ্চিন্তা যেন মুছে যেতে থাকে।
বিদায়ের সময় তাই অনেককেই দেখা যায় নীরব হয়ে পড়তে। কেউ শেষবারের মতো সমুদ্রে পা ডোবায়, কেউ নারকেল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে দূরের নীল দিগন্তে। মনে মনে সবাই জানে এই দ্বীপটা শুধু স্মৃতির ভেতর নয়, ফিরে যাওয়ার আকুতির ভেতরও রয়ে যাবে।