রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:২৭ পিএম
বরগুনার আমতলী উপজেলার ছোট্ট এক উপকূলীয় গ্রাম চুনাখালীতে কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছেন নৌকা তৈরির শ্রমিকরা।
বরগুনার আমতলী উপজেলার ছোট্ট একটি উপকূলীয় গ্রাম চুনাখালী। চারপাশে নদী-খাল ঘেরা এই গ্রাম আজ ‘নৌকার গ্রাম’ নামে দেশজুড়ে পরিচিত। নদীঘেরা এই উপকূলীয় গ্রাম থেকে তৈরি হতো দেশের নানা প্রান্তে ব্যবহৃত হাজারো কাঠের নৌকা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কাজেই চলত গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের জীবিকা। কিন্তু কাঠের দাম বৃদ্ধিতে দিন দিন চাহিদা কমে যাচ্ছে, আর্থিক সংকট ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে এখন ভেঙে পড়ছে সেই পুরনো ঐতিহ্য।
গ্রামের ৯ শতাধিক পরিবারের মধ্যে শতাধিক বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির পেশায় জড়িত ছিল। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল। বছরে প্রায় কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হতো এখানকার কারিগরদের হাতে তৈরি পণ্যে এখন তা সংকটের মুখে।
একসময় গ্রামের ভেতর ঢুকলেই কানে আসে ঠকঠক শব্দে যেন কাঠের সঙ্গে মানুষের জীবনের তালমিলানো এক ছন্দ। সূর্য ওঠার আগেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন কারিগররা, এখানকার প্রতিটি ঘাটে দেখা যেত নৌকা তৈরির ব্যস্ততা। কাঠ কাটা, পেরেক ঠোকার শব্দ, গায়ের ঘাম মুছতে থাকা কারিগরদের মুখে ছিল হাসি। এখন সেই চিত্র উধাও। নৌকা কারিগররা আজ কাজের অভাবে দিশাহারা। আগে এখানে তৈরি হতো মাছ ধরার ট্রলার, যাত্রীবাহী নৌকা, পণ্য পরিবহনের বড় বড় কাঠের বোট, যেগুলো চলে দেশের নানা নদ-নদীতে।
গ্রামীণ জীবনে নৌকা শুধু যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না, ছিল আনন্দ, ভালোবাসা ও আশা-নিরাশার প্রতীক। বর্ষায় যখন চারদিক জলে ভরে যেত, তখন নৌকা মানেই ছিল স্বাধীনতা আর এখন নদীপথও আর আগের মতো নেই। চুনাখালী ও আশপাশের নদীর অনেক অংশ ভরাট বা শুকিয়ে গেছে। খনন বন্ধ থাকায় নৌকা চলাচল ও মাছ ধরা সবই কমে গেছে। এ ছাড়া আধুনিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও ফাইবার বোট আসায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকার বাজার সংকুচিত হচ্ছে।
গ্রামের বয়স্করা জানান, আট-দশ বছর আগেও চুনাখালী গ্রামের শতাধিক পরিবার নৌকা তৈরির পেশায় জড়িত ছিল। বর্তমানে সে সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৪-১৫ পরিবারে। বাকিরা অন্য পেশায় পাড়ি দিয়েছেন।
গ্রামের প্রবীণ কারিগর আব্দুল জলিল (৬৫) বলেন, আগে বছরের অর্ধেক সময় নৌকা বানানোর কাজ চলত। এখন মাসের পর মাস বসে থাকতে হয়। কাঠের দাম বেড়েছে, লোকের হাতে টাকাও নেই। ফলে অর্ডারও খুব কম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও চুনাখালীতে বছরে কোটি টাকার বেশি মূল্যের নৌকা তৈরি হতো। এখন সেই পরিমাণ কমে গেছে অর্ধেকে। আগে যে কারিগররা সারা বছর ব্যস্ত থাকতেন, এখন অনেকে বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন। নৌকা কারিগর মোজাম্মেল মাদবর বলেন, এখন নৌকা তৈরিতে কাঠ, লোহা ও অন্যান্য উপকরণের দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে, খরচ তুলতে পারা যায় না। বিক্রিও আগের মতো হয় না। তা ছাড়া অনেকেই এনজিওর কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কাজ শুরু করলেও পরে সুদের চাপে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়।
খরচ বাড়ছে, লাভ কমছে
নৌকা তৈরিতে ব্যবহৃত কাঠ- চাম্বল, মেহগনি, রেইনট্রি সবকিছুর দাম গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। একদিকে কাঠের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি ও রঙ-টারকোলের খরচ বেড়ে গেছে। চুনাখালীর প্রবীণ কারিগর মজিবর মাঝি বলেন, ‘আগে একটা মাঝারি নৌকা ৩০ হাজার টাকায় বানানো যেত, এখন কাঠ আর লোহার দামেই লাগে তার দ্বিগুণ।’ সেগুন, গামার, কড়ই এসব কাঠ পাওয়া যাচ্ছে না। বন কমেছে, দাম বেড়েছে। ফলে অর্ডার পেলেও কারিগররা পিছিয়ে পড়ছেন।
প্রাচীন ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কা
চুনাখালী গ্রামের শতাধিক পরিবার বংশপরম্পরায় এই পেশায় যুক্ত। কিন্তু নতুন প্রজন্মের আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। অনেকে ঢাকায় বা খুলনায় গিয়ে অন্য কাজ করছেন। গ্রামের তরুণ সোহাগ হাওলাদার বলেন, ‘বাবা-দাদারা এই পেশায় সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু এখন টিকে থাকা কঠিন। নৌকা বানিয়ে লাভ হয় না, উল্টো ধার করতে হয়।’
ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের প্রতিযোগিতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মাছ ধরার বড় ট্রলার ও ফাইবার বোট এসেছে। এগুলো দ্রুতগামী, কিন্তু দামি। এতে গ্রামীণ কাঠের নৌকার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। কারিগরদের হাতে বানানো নৌকার ঐতিহ্য হারাচ্ছে একে একে।
সরকারি সহায়তার দাবি
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব। চুনাখালীর নৌকা শুধু ব্যবসা নয়, এটা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সরকার যদি নৌকা শিল্পকে ‘স্থানীয় হস্তশিল্প’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে গ্রামটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
নদীর পাড়ে নিঃশব্দ গ্রাম
এখন চুনাখালীর নদীর পাড়ে আগের মতো কাঠ কাটা, হাতুড়ির শব্দ আর দেখা যায় না। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষের এই নৌকা তৈরির ঐতিহ্য। তবু কিছু কারিগর আশা ছাড়েননি। তারা বলছেন, যতদিন নদী থাকবে, ততদিন চুনাখালীতে নৌকা তৈরির ধ্বনি শোনা যাবে। নৌকা আমাদের জীবনের অংশ। এক দিন হয়তো ব্যবসা থাকবে না, কিন্তু এই কাজ আমরা ছাড়ব না,’Ñ বললেন প্রবীণ কারিগর মজিবর শেখ।
চুনাখালী শুধু একটি গ্রাম নয়, এটা এক ঐতিহ্যের নাম, এক জীবনধারার প্রতিচ্ছবি। কাঠের টুকরোয় গড়া সেই স্বপ্ন আজও নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে বেঁচে আছে। নৌকা শুধু চলাচলের বাহন নয়, এটি বাংলাদেশের নদীমাতৃক সংস্কৃতির প্রাণ। সংকট মোকাবিলা না করলে একটি ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।