সাদিয়া ইসলাম স্মরণী
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:০৭ পিএম
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার বহু মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স নামে পরিচিত একটি হজমজনিত সমস্যায় ভুগছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ। চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতা কম থাকায় অনেকেই এই সমস্যাকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা খাদ্যে অরুচি ভেবে অবহেলা করেন। ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টির ঝুঁকিও বাড়ে।
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কী
দুধে থাকা ল্যাকটোজ একটি প্রাকৃতিক চিনি। এই ল্যাকটোজ ভাঙার কাজ করে ল্যাকটোজ নামের একটি এনজাইম, যা মানবদেহের ক্ষুদ্রান্ত্রে তৈরি হয়। কারও দেহে পর্যাপ্ত ল্যাকটোজ না থাকলে ল্যাকটোজ ঠিকমতো হজম হয় না। এর ফলেই হয় ইনটলারেন্স। দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া, পেটে ক্র্যাম্প, বমিভাব এমনকি অস্বাভাবিক গ্যাস হওয়া এই সমস্যার সাধারণ উপসর্গ।

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের ধরন
প্রাইমারি ল্যাকটোজ ডেফিসিয়েন্সি : বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ল্যাকটোজ কমে যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় বিষয়টি সবচেয়ে সাধারণ।
সেকেন্ডারি ল্যাকটোজ ডেফিসিয়েন্সি : ডায়রিয়া, অন্ত্রের ইনফেকশন, সিলিয়াক ডিজিজ, আইবিডি বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে অস্থায়ীভাবে ল্যাকটোজ কমে যায়।
কনজেনিটাল ল্যাকটোজ ডেফিসিয়েন্সি : জন্মগতভাবে খুব বিরল একটি অবস্থা।
কেন হয় এবং কারা বেশি আক্রান্ত
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের দেহে ল্যাকটোজ উৎপাদন কমে আসে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক একটি জৈবিক পরিবর্তন বলে বিবেচিত। গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের মধ্যে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত সমস্যা দেখা যায় না। কারণ তাদের দেহে ল্যাকটোজের পরিমাণ বেশি থাকে। কিশোর বয়সের পর ল্যাকটোজ কমতে শুরু করলে ধীরে ধীরে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া যারা দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেছেন, যাদের অন্ত্রে ইনফেকশন বা আইবিএস আছে, তাদের মধ্যেও সমস্যা বেশি দেখা যায়।
ডায়াগনস্টিক টেস্ট
কিছু টেস্টের মাধ্যমে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যেমন :
১. হাইড্রোজেন ব্রেথ টেস্ট
২. ল্যাকটোজ টলারেন্স টেস্ট
৩. স্টুল অ্যাসিডিটি টেস্ট (শিশুদের জন্য)
কিছু ভুল ধারণা থেকে অনেকেই মনে করেন, দুধ খেলেই গ্যাস্ট্রিক হয়, দুধ না খেলে শরীর দুর্বল হবে, সব দুধই হজমে কঠিন।
এই ভুল ধারণাগুলো ভাঙা জরুরি। কারণ সঠিক তথ্য জানলে রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়। খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সচেতন সিদ্ধান্তই ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
কীভাবে প্রতিকার সম্ভব
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তনে সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ল্যাকটোজ কমানো
দুধ পুরোপুরি বাদ দিতে হয় না। অনেকেই স্বল্পমাত্রায় দুধ সহ্য করতে পারেন। দুধ একসঙ্গে বেশি না খেয়ে অল্প করে পান করলে আরাম পাওয়া যায়।
দই ও ইয়োগার্ট
ফারমেন্টেড ডেইরি পণ্যে ল্যাকটোজ কম থাকে এবং এগুলো হজমে সহজ। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্টদের জন্য দই সাধারণত নিরাপদ।
ল্যাকটোজ ফ্রি দুধ
এখন বাজারে ল্যাকটোজমুক্ত বা ল্যাকটেজ এনজাইমযুক্ত দুধ পাওয়া যায়। যাদের সমস্যা বেশি তারা এগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর বিকল্প উৎস
যারা দুধ কম খাবেন তাদের জন্য শাকসবজি, মাছের কাঁটা, বাদাম, ডিম, ধনেপাতা, টফু, ডাল খুব ভালো উৎস।
এনজাইম সাপ্লিমেন্ট
চিকিৎসকের পরামর্শে ল্যাকটেজ এনজাইম ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে দুধ খাওয়ার আগে এটি অনেকের ক্ষেত্রে কার্যকর।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন
হঠাৎ ফ্যাটি বা জাঙ্ক ফুড কমানো, প্রচুর পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম হজমশক্তি ভালো রাখে। দীর্ঘমেয়াদি পেটের রোগ থাকলে চিকিৎসকের ফলোআপ প্রয়োজন।
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কোনো ভয়ানক রোগ নয়। তবে অবহেলা করলে দীর্ঘমেয়াদে দেহে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। যেমন : দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া থেকে পুষ্টিহীনতা, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি ঘাটতিসহ শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে গ্রোথ ইস্যুর মতো ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গ বুঝতে পারলেই সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়