ছবি : নাকিব নিজাম
নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত হাতিয়া উপজেলার ছোট একটি দ্বীপ এটি। চর ওসমান, বাউল্লার চর, কামলার চর ও মৌলভীর চর- এই চার চর নিয়ে গঠিত নিঝুম দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একর। ট্রলার নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে দুটি চর ঘুরে দেখি। চৌধুরী খালের অপরূপ দৃশ্য মোহিত করে আমাদের। লিখেছেন গোলাম কিবরিয়া
বছরের শেষ। শীতের এই সময়ই ঘুরে বেড়ানোর প্রকৃত সময়। সমুদ্র, পাহাড় যেখানেই ছুটবেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবেন। সেই সুবাদে এবার ঘুরে আসুন নিঝুম দ্বীপ থেকে। দ্বীপের সৌন্দর্য আপনার ভেতরের শিশুসুলভ চঞ্চলতাকে ফুটিয়ে তুলবে। দেশের ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে এই নিঝুম দ্বীপ।
নোয়াখালীর অন্তর্গত হাতিয়া উপজেলার ছোট একটি দ্বীপ এটি। বঙ্গোপসাগরের বুকে মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে উঠেছে। হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপ। চর ওসমান, বাউল্লার চর, কামলার চর ও মৌলভীর চর- এই চার চর নিয়ে গঠিত নিঝুম দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একর।
১৯৪০ সালে দ্বীপটি সাগরের মাঝখানে জেগে ওঠে। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার জাতীয় উদ্যান হিসেবে একে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৩ সালে দ্বীপটি হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়ন থেকে আলাদা করা হয়। এরপর এটি স্বতন্ত্র একটি ইউনিয়নের মর্যাদা পায়।
সদরঘাট থেকে নিঝুম দ্বীপ সরাসরি যাওয়ার কোনো লঞ্চ নেই বিধায় এমভি তাশরীফে চড়ে হাতিয়ায় রওনা হই। সন্ধ্যা ৬টায় লঞ্চযাত্রা শুরু হয়। প্রায় ১৫ ঘণ্টা ছিল যাত্রাপথ। রাতভর আড্ডা আর গানে সময়টা বেশ উপভোগ্য ছিল। মাঝে মনপুরায় যাত্রাবিরতি ভালোই লেগেছে। দীর্ঘযাত্রা শেষে হাতিয়ায় পৌঁছাই। সকালের নাশতা শেষে ট্রলারে করে গন্তব্যের উদ্দেশে আবার যাত্রা। এটাও ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। ঘাট থেকে নেমে এক পলকে দেখে নিলাম দ্বীপটি। নিঝুম দ্বীপ নিয়ে যে কল্পচিত্র, তা মেলাতে সামনে যাত্রা। সারি সারি কেওড়াগাছ রাস্তার পাশ দিয়ে চলে গেছে আরও গভীরে। একটু এগিয়ে গেলে কেওড়ার বন হালকা হতে থাকে। এরপর আবার শূন্য প্রান্তর। রাস্তার দুধারে শস্যক্ষেত।
নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার দ্বীপটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৩ সালে দ্বীপটি জাহাজমারা ইউনিয়ন থেকে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র ইউনিয়নের মর্যাদা লাভ করে। দ্বীপের পূর্ব নাম ‘চর ওসমান’, ওসমান নামের একজন তার মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম এখানে বসত গড়েন। তার নামেই এই নামকরণ। প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৪০ সালের দিকে জেগে ওঠে। ১৯৫০ সালের দিকে জনবসতি গড়ে ওঠে। দ্বীপের মাটি চিকচিকে বালুকাময়, তাই জেলেরা নিজ থেকে নামকরণ করেছেন বালুর চর। দ্বীপটিতে বালুর ঢিবি বা টিলার মতো ছিল বিধায় স্থানীয় লোকজন একে বাইল্যার ডেইল বা বাইল্লারচর বলেও ডাকত।
বাংলাদেশ বনবিভাগ সত্তরের দশকে নিঝুম দ্বীপে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। দ্বীপটি বর্তমানে হরিণের অভয়ারণ্য। ১৯৯৬ সালের হরিণশুমারি অনুযায়ী হরিণের সংখ্যা ২২ হাজার। যদিও সময়ের হিসেবে দিনকে দিন হরিণের সংখ্যা কমে আসছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, হরিণের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। কুকুর বনের হরিণ ধরে ধরে খাচ্ছে। বর্ষায় কিছু হরিণের খুরারোগ হয়। সেসময় হরিণগুলোর হাঁটতে কষ্ট হয়। এ ছাড়া দ্বীপে হরিণের জন্য সুপেয় মিঠাপানির অভাব রয়েছে। বড় জোয়ার হলেও কিছু হরিণ মারা যায়।
নোনা পানিবেষ্টিত নিঝুম দ্বীপ কেওড়াগাছের অভয়ারণ্য। ২০০১ সালে এ দ্বীপকে সরকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। এর বনায়ন করে বন অধিদপ্তর। মূলত চার জাতের গাছ এখানে লাগানো হয়। এগুলো হলো কেওড়া, গেওয়া, বাইন আর কাঁকড়া। কেওড়া, গেওয়া আর দূর্বাঘাস হরিণের প্রধান খাবার।
হরিণ ও মহিষ ছাড়া অন্য কোনো হিংস্র প্রাণী নেই। শীত মৌসুমে অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় নিঝুম দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপে আপনি একই সঙ্গে পাবেন বন, সমুদ্র ও দ্বীপ- তিন ধরনের ল্যান্ডস্কেপ। আপনি সেন্টমার্টিন দ্বীপের মতো অনুভূতি পাবেন, কারণ এটা চারদিক সমুদ্রবেষ্টিত। সুন্দরবনের অনুভূতি পাবেন, কারণ এখানে ম্যানগ্রোভ বন ও হরিণ দেখা যায়। এখানে ক্যাম্পিং করা বেশ আনন্দের। আপনাকে ক্যাম্পিংয়ের জন্য স্থান নির্বাচনে তেমন চিন্তাভাবনা করতে হবে না। পুরো দ্বীপেই প্রায় সব জায়গায় আপনি ক্যাম্পিং করতে পারেন চাইলে।
ট্রলার নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে দুটি চর ঘুরে দেখি। চৌধুরী খালের অপরূপ দৃশ্য মোহিত করে আমাদের। এখানে গোধূলিলগ্নের কথা স্মৃতি থেকে মুছবে না কখনও। এরপর আবার তীরে ফেরা। সন্ধ্যা যে ঘনিয়ে এলো। রাতের আঁধারে নিঝুম দ্বীপ অনেক বেশি নিশ্চুপ। যদিও স্থানীয় নামার বাজারে গেলে তা বোঝার উপায় নেই। বাজারে মিষ্টি, চা ও খেজুরের রস খেলো, কেউ কেউ নদীর তীর ঘুরে এলো, রাত ৮টায় সবাই একত্রিত হয় তাঁবুর পাশে। চলছে বারবিকিউর আয়োজন। মাঝে আগুন করে গোল হয়ে সবার আড্ডা। রাত বাড়তে থাকে। আড্ডার মাঝে আগুনের উত্তাপও কমতে থাকে। সবাই মিলে এবার ফানুস ওড়াই। এই ফানুস আকাশের সীমানায় গিয়ে মিলিয়ে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা, গান, বারবিকিউ আমাদের নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট। আমরা তাঁবুতে গিয়ে শুয়ে পড়ি।
পরদিন সকালে উঠে নাশতা। এরপর অনেকটা সৌভাগ্যক্রমে হরিণের দেখা পাওয়া। আমরা ফেরার প্রস্তুতি নিই। ট্রলারে করে হাতিয়ায় এসে দুপুরের খাবার সেরে নেওয়া হয়। তারপর এমভি তাশরীফ করে ঢাকার সদরঘাট।
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলা ও নিঝুম দ্বীপকে ঘিরে বিশেষ পর্যটন জোন গড়ে তোলা হচ্ছে। এজন্য ওই অঞ্চলে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের সুবিধার্থে সেখানে রেস্তোরাঁ, কটেজ ও ক্রুজ ভেসেল সংগ্রহে একটি প্রকল্প নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে ওই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে।
কী কী দেখবেন
নিঝুম দ্বীপ যাবেন আর হরিণ দেখবেন না? হরিণ দেখতে বিকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে কবিরাজের চরের কাছে চৌধুরীর খাল দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটতে হবে। সেখানে হরিণের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রলার রিজার্ভ করে বেরিয়ে পড়বেন। এখানে সন্ধ্যায় কবিরাজের চরে সূর্যাস্তের সঙ্গে হাজার মহিষের পাল আপনার দৃষ্টি কাড়বে।
আর কমলার দ্বীপে কমলার খালে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের কাছ থেকে তাজা ইলিশ কিনতে পারেন। নামার বাজার থেকে নামা বাজার সি বিচ হেঁটে যেতে ১০ মিনিট সময় লাগে। নামা বাজার সি বিচ থেকে সূর্য উদয় ও সূর্যাস্ত দেখা ছাড়াও বারবিকিউ করতে পারবেন।
দমার চরের দক্ষিণ দিকে নতুন সি বিচটি ভার্জিন আইল্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই আইল্যান্ডে নাম না জানা অনেক পাখির দেখা মিলে। চোয়াখালিতে নিঝুম রিসোর্টের বারান্দা থেকেও মাঝেমধ্যে হরিণের দেখা পাওয়া যায়। এ ছাড়া যদি হাতে সময় থাকে, তবে ট্রলার রিজার্ভ নিয়ে ভোলার ঢালচর, চর কুকরি-মুকরিতে একটি দিন কাটিয়ে আসতে পারেন।
কখন নিঝুম দ্বীপ যাবেন?
শীতকাল অর্থাৎ অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময়। বছরের অন্য সময় মেঘনা নদী ও সাগর বেশ উত্তাল থাকে, তাই ওই সময় নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে সতর্ক থাকা উচিত।
যেভাবে যাবেন
কয়েকভাবে নিঝুম দ্বীপে যেতে পারেন। ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে করে সোজা চলে যাবেন হাতিয়া। হাতিয়া থেকে বোট বা ট্রলারে যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপ বন্দরটিলা। বন্দরটিলা হলো নিঝুম দ্বীপের প্রধান সৈকত। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় লোকদের জন্য হাতিয়া দিয়ে গাড়িতে চড়ে দ্বীপের শেষ মাথায় চলে গেলে সেখান থেকে সামুদ্রিক অংশ নদীর মতো নৌকা পার হয়ে উঠতে হবে নিঝুম দ্বীপে। তারপর দ্বীপের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত নৌকা, ট্রলার, রিকশা, ভ্যান বা হেঁটে পার হওয়া যাবে। এ ছাড়া বাসে চড়ে নোয়াখালী, মাইজদী বা সোনাপুর যেতে পারেন। সেখান থেকে সিএনজিতে যেতে হবে ঘাটে। ঘাট থেকে নৌকা, স্পিডবোট বা ট্রলারে চড়ে হাতিয়া হয়ে বা সরাসরি যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপ। তবে সকাল ৮টার মধ্যে পৌঁছে যেতে পারলে যেতে পারবেন সি-ট্রাকে। সি-ট্রাকে উঠে হাতিয়া হয়ে নিঝুম দ্বীপ।
মনে রাখুন
নামার বাজারে হোটেলগুলোতে পাওয়া যাবে সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি, যা পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। যাত্রা শুরুর আগে অবশ্যই আবহাওয়ার বিষয়ে জানতে হবে। সেখানে বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর ও সোলারের ওপর নির্ভরশীল। যাত্রাকালে পরিমিত কাপড়, মোবাইল চার্জার, ক্যামেরা ও মোবাইলের জন্য অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক ও টর্চ সঙ্গে রাখতে হবে।
ছবি : নাকিব নিজাম