সাইদুল ইসলাম মন্টু
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২১ পিএম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২৮ পিএম
জলবায়ু সুশাসনের অভাবে নদীভাঙন প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রতি বছরই ফসলি জমি, বসতি ও রাস্তা বিষখালী নদীগর্ভে বিলীন হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে জনগোষ্ঠী। বেতাগী উপজেলার সড়িষামুড়ি ইউনিয়নের কালিকাবাড়ী গ্রাম থেকে তোলা
জলবায়ু সুশাসনের অভাবে জলবায়ু শক্তিশালীকরণ লড়াইয়ে বিষখালী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বরগুনার বেতাগী উপজেলা এখানও পিছিয়ে পড়ছে। স্থানীয় সরকারের সঠিক ভূমিকা পালন, নারীদের অংশগ্রহণে অনুপস্থিতি, ইউপিতে সীমাবদ্ধতা ও নানা চ্যালেঞ্জে তৃণমূল পর্যায়ে জলবায়ু কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আরও অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারী নেতৃত্ব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বাধা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকল্প নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি, প্রভাব বিস্তার, সুশীল সমাজ, সক্রিয় ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি।
এবারে ব্রাজিলের বেলেম শহরে (১০ নভেম্বর থেকে আগামী ২১ নভেম্বর-২০২৫) জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ৩০’-এ জলবায়ু সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাস্তবে রূপ দিতে গুরুত্বারোপ ও বিশ্ববাসী উপকূলের বৈশ্বিক জলবায়ূ সংকট মোকাবিলায় সুশাসনের পথ খুঁজেছেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের তথ্যমতে, একটি পৌরসভাসহ ৭টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ১১ লাখ ১৭ হাজার ১৪৫ জন জনসংখ্যা অধ্যূষিত দেশের উপকূলীয় বেতাগী উপজেলার মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের তালবাড়ী গ্রাম। জলবায়ু পরিবর্তনে বিষখালী নদীর ভাঙন যাদের নিত্যসঙ্গী। ভাঙনরোধে ওই এলাকায় একাধিকবার প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও জলবায়ু সুশাসনের অভাবে নদীগর্ভে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি হারিয়ে গেছে। নতুন করে আরও ১২টি বসতি ভাঙনের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগী পঞ্চাশোর্ধ্ব নুরজাহান বেগমের আক্ষেপ, ‘ভাঙনে মোগো সব শ্যাষ অইয়া গ্যাছে। যেডু আছে হেইয়া লইয়া এ্যাহন মোরা আতোঙ্কের মধ্যে কাডাইতেছি, দ্যাহার কেউই নাই।’
সরেজমিনে উঠে আসে জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালী করতে এ উপজেলার বিবিচিনি, বেতাগী, হোসনাবাদ, মোকামিয়া, বুড়ামজুমদার, কাজিরাবাদ ও সড়িষামুড়িÑ এই সাতটি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সবকটিতেই জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থানীয়ভাবে অংশগ্রহণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়া।
উপজেলার সড়িষামুড়ি ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি গ্রামের ভুক্তভোগী আবদুর রব বলেন, জলবায়ু সুশাসনের অভাবে এ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দকৃত সহায়তা (যেমন কৃষি সহায়তা) অব্যবস্থাপনার শিকার এবং সঠিকভাবে জনসাধারণের হাতে পৌঁছয় না।
উপজেলার বুড়ামজুমদার ইউনিয়ন পরিষদের সচিব নিতাই চন্দ্র দাস জানান, ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব সীমিত রাজস্ব আয়, অপর্যাপ্ত বাজেট, রাজনৈতিক প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে সচেতনতার অভাব, প্রকল্পের অর্থায়নে অস্বচ্ছতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবে জলবায়ু সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তারা পিছিয়ে রয়েছেন।
জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালী করতে কর্মকর্তাদের, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে সমন্বিত নীতি, স্বচ্ছ অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার এবং জলবায়ু স্থানান্তরিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। তা ছাড়া জলবায়ু সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালাও রয়েছে। এর মধ্যে আইনি কাঠামো তৈরি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।
মো. জহিরুল ইসলাম তিনি বেতাগী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালী করতে তার বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের অর্থায়নে অনিয়ম ও অব্যবহার এবং নিম্নমানের নির্মাণ কাজ জলবায়ু সুশাসনের পথে বড় বাধা, তাই এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।
বিবিচিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নওয়াব হোসেন নয়ন তিনি জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালী করতে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বেতাগী উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সেবাপ্রদানকারী ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, জনগণের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন ও সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয়ভাবেও জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালীকরণে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন, বিভিন্ন অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, কার্যকর গবেষণা এবং ঝুঁকি নিরূপণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত কার্যক্রমকে শক্তিশালী না করা। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারে অনিশ্চয়তা এবং এর অতিরিক্ত ব্যবহার সীমিত করার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে।
স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও উপজেলা প্রশাসক হরেকৃষ্ণ অধিকারী জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালী করার জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও বরাদ্দের ওপর জোর দিয়েছেন, যা প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
তিনি মনে করেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব রাজস্ব আয়ের ক্ষমতা প্রদান করা, বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভর এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসবের ফলে এখানকার কৃষি, জীবন-জীবিকা এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সুশাসনের অভাবে দিন দিন আরও ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। এক্ষেত্রে সুশাসন ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলে আগামীতে ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াহ আকার ধারণ করতে পারেÑ এমনই আশঙ্কা তাদের।
জলবায়ু সুশাসন শক্তিশালীকরণ ও নতুন গতিশীলতা আনায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় পর্যায়ে নীতিমালা ও পরিকল্পনায় সামঞ্জস্য বিধান, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জলবায়ু তহবিলের উৎস, অর্থ ব্যবহার ও বণ্টনে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে বলে স্থানীয় ভুক্তভোগী, জনপ্রতিনিধি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিয়োজিত সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনায় তারা এমনই অভিমত ব্যক্ত করেন।
স্থানীয়ভাবে জলবায়ূ সংশ্লিষ্টদের আশাবাদ এসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর জলবায়ু সুশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায় আরও শক্তিশালী করে তুলতে ও নতুন গতিশীলতা আনতে পারে।