এহসানুল হক সুমন
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩৯ পিএম
রংপুর নগরীর লালবাগ। ব্যস্ততম তিন মাথার মোড়ে একটি বাঘের ভাস্কর্য। ধারালো দাঁত বের করে হা করে আছে বাঘটি। লালবাগ হাটে চলাচলের সময় পথচারী, শতবর্ষী কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের নজরে আসে এ বাঘের ভাস্কর্য। সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল, হয়তো একসময় লালবাগে থাকত লাল রঙের বাঘ। কিন্তু নাম লালবাগের সঙ্গে লাল বাঘের বিস্তর ফারাকে খটকা লেগে যায় সচেতনদের মনে। শিক্ষাবিদ ও লেখকদের মতে, লালবাগ নামকরণ করা হয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শহীদ শাহজাদি লালবিবির নামে। লালবিবির ফুলের বাগিচা থাকায় এলাকার নাম হয় লালবাগ।
রংপুরের ইতিহাস লেখক ও শিক্ষাবিদরা জানান, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ফুলচৌকি গ্রামের বাসিন্দা নুরুল উদ্দিন মোহাম্মদ বাকের জং (নূরল দীন) একজন জমিদার ছিলেন। তার দুই কন্যা ছিলেন শাহজাদি লালবিবি ও শাহজাদি চাঁদবিবি। লালবিবি নুরুল উদ্দিন মোহাম্মদ বাকের জংয়ের মতো বিপ্লবী ছিলেন। তবে ফুলের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। সেই থেকে লালবিবি লালবাগ এলাকায় একটি ফুলের বাগান করেন। সেই বাগানে নানা রঙ0, সুবাসের দুর্লভ ফুলের সমারোহ ঘটায়। সেটি পরিণত হয় বিশাল বাগিচায়। নুরুল উদ্দিন মোহাম্মদ বাকের জং ১৭৬০ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ইংরেজদের সঙ্গে অসংখ্যবার যুদ্ধ করেছেন। সর্বশেষ লালমনিরহাটের আদিতমারীর মোগলহাটে ব্রিটিশ সেনাদের অতর্কিত হামলায় তিনি আহত হন। এরপর তাকে রাজধানী ফুলচৌকিতে আনা হয়। ১৭৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি নিজ বাসভবনে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর কৃষক-প্রজাদের সংগঠিত করে ইংরেজদের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন কন্যা লালবিবি। ১৮৩২-৩৩ সালে রংপুর নগরীর মীরগঞ্জ তামপাট এলাকায় প্রজা-ফকির বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে ইংরেজের যুদ্ধ হয়। সেখানে লালবিবিসহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের হত্যা করা হয়। তামপাটের ওই এলাকায় লালবিবিকে সমাহিত করা হয়। সেই এলাকাটির নামকরণ করা হয় সমরদীঘি। লালবিবির মৃত্যুর পর নগরীর লালবাগের নামকরণ করা হয়। কিন্তু কালের পরিক্রমায় লালবাগের সঠিক ইতিহাস বিকৃত হয়ে যায়। ২০১৫ সালে রংপুর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র লালবাগ হাটের প্রবেশমুখে একটি বাঘের ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। এরপর থেকে অনেকেই মনে করেন সেখানে অতীতে বাঘ ছিল। এতে করে এই প্রজন্মের কাছে লালবিবির আত্মত্যাগের ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে।
কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী সামির হোসেন বলেন, লালবাগ শুনতে লাল বাগিচা বা লাল বাগান শোনা গেলেও রাস্তায় একটি লাল বাঘের ভাস্কর্য করা হয়েছে। এটি দেখে অনেকে ভাবতে পারেন হয়তো এখানে বাঘ থাকত। কিন্তু আমরা শিক্ষার্থীরা লালবাগ নামে বাগান বুঝতে পারছি। লালবিবির মতো একজন সংগ্রামী, সাহসী নারী এখানে ফুলে বাগিচা গড়ে তুলেছিলেন। অথচ দায়িত্বশীল মানুষরা সেই ইতিহাস বিকৃত করেছে। আমি চাই বাঘের ভাস্কর্যটি ভেঙে সেখানে লালবিবির নামে কোনো কিছু করা হোক।
কারমাইকেল কলেজের সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, নুরুল উদ্দিন মোহাম্মদ বাকের জংয়ের বড় কন্যা ছিলেন লালবিবি। তিনি শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহর মা এবং সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের স্ত্রী। কথিত রয়েছে লালবাগে নবাব কন্যার একটি বিশাল ফুলের বাগান ছিল। অসংখ্য দুলর্ভ ফুল ছিল সেই বাগানে। এই নবাবকন্যার নাম অনুসারে লালবাগ নামকরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর অনেকে মনে করেছিলেন সবকিছু শেষ হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে বাংলায় আরও কয়েকজন স্বাধীন নবাব ছিলেন। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন নুরুল উদ্দিন মোহাম্মদ বাকের জং। তাকে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে স্বাধীনভাবে নবাবি করার জন্য ফুলচৌকিতে পাঠানো হয়েছিল। ইংরেজরা নুরুল উদ্দিন মোহাম্মদ বাকের জং, লালবিবির সংগ্রামের ইতিহাস স্বীকার করেনি। ইতিহাস বিকৃত করে ফকির বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহের সঙ্গে তাদের জড়িয়ে দিয়েছে।