হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৩৬ এএম
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৩৭ এএম
আয়ান খান রুহাব। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার শিবপুর গ্রামে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তার জন্ম। সেই হিসেবে তার বয়স ৮ মাস ১৪ দিন। এই বয়সেই সে অর্জন করে নিল অনন্য এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি! যে স্বীকৃতি তাকে শুধু বাংলাদেশের প্রথম ‘কার্বন-নিউট্রাল শিশু’ করল না; ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে গেল আয়ান খান রুহাবের নাম।
বাংলাদেশের প্রথম কার্বন শিশু রুহাবের মা ‘আয়শা আক্তার কিরণ’ এবং বাবা ‘ইমরান রাব্বি’। দুজনই প্রাণ ও প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণের ভারসাম্যমূলক সহাবস্থানের জন্য তারা সাতক্ষীরায় গড়ে তোলেন পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রীনম্যান’। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইমরান রাব্বি আর গ্রীনম্যানের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন আয়শা আক্তার। জানা গেছে, প্রাণ ও প্রকৃতিপ্রেমী এই যুগলের মূল লক্ষ্য শিশুর জন্মের মুহূর্ত থেকেই পৃথিবীর প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করা। এমন বোধের বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার মাঝে রুহাবের জন্ম।
রুহাবের জন্মের কয়েক মাস পর, গত সেপ্টেম্বর মাসে তার বাবা-মা সাতক্ষীরার শিবপুর গ্রামে আম, জাম, কাঁঠাল, আমড়া, সুপারি ও নিমসহ বিভিন্ন ধরনের ৫৮০টি ফলদ ও বনজ গাছ রোপণ করেন। এই প্রতিটি গাছ রুহাবের তো বটেই, আশপাশের অন্য শিশুদের সম্ভাব্য কার্বন নিঃসরণ অফসেট করবে, অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে এক সমতা রক্ষা করবে। এই উদ্যোগের স্বীকৃতি দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিসিএডি)। সংস্থাটির গ্রান্টসজয়ী প্রকল্প ঢাকা প্ল্যান্টারসের আয়োজনে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মাল্টিপারপাস হলরুমে গত ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এক আয়োজনে রুহাবকে বাংলাদেশের প্রথম ‘কার্বন-নিউট্রাল শিশু’ হিসেবে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।
জানতে চাইলে রুহাবের বাবা-ইমরান রাব্বি ও মা আয়েশা আক্তার কিরণ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ, উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিবর্তনে আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। সেখানে থেকে আমরা প্রতিবছরই বৃক্ষরোপণ করে থাকি, গ্রীনম্যানে আমরা ট্রি-অ্যাডাপশন একটা প্রজেক্ট করি, যেখানে মানুষ গাছ দত্তক নিতে পারে। সেই জায়গা থেকেই রুহাবের জন্মের মাস দুয়েক পর হঠাৎই মাথায় আসে প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণের ভারসাম্যমূলক সহাবস্থানের অর্থাৎ কার্বন নিঃসরণ অফসেট করবে বা প্রকৃতির সঙ্গে সমতা রক্ষার বিষয়টি। পরিকল্পনা করি রুহাবের জন্যও বৃক্ষ রোপণ করব। যাতে শুধু রুহাব কার্বনশূন্য বা অক্সিজেন এবং কার্বনের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারে। পরবর্তীতে অনেক আলোচনা ও তথ্য সংগ্রহের পর গত সেপ্টেম্বর মাসে বাস্তবায়ন হয় সেটি।
আইসিসিসিএডি এবং সংস্থাটির গ্রান্টসজয়ী ঢাকা প্ল্যান্টার্স আমাদের কতগুলো বৃক্ষ রোপণ করতে হবে- এ তথ্য বের করতে সহযোগিতা করে। গাছ লাগানো শেষে আইসিসিসিএডির একটি পলিসি ডায়লগ ও প্রাইজ গিভিং সেরেমনি অনুষ্ঠানে তারা এই সার্টিফিকেট দেয়।
সন্তানের এই বিশেষ সনদপ্রাপ্তিতে কেমন লাগছে জানাতে চাইলে রুহাবের বাবা বলেন, ‘আমরা রুহাবের জন্য গাছ লাগিয়েছি, যেন সে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পায় ও সবুজ পরিবেশে বড় হতে পারে। এটা তার ভবিষ্যৎ ও পৃথিবীর জন্য আমাদের ছোট্ট একটি উদ্যোগ মাত্র। আমরা চাই এই উদ্যোগটা যেন একটা মুভমেন্টে পরিণত হয় এবং সবাই এমন কিছু করে।’
রুহাবের মা আয়শা আক্তার কিরণ বলেন, ‘আমাদের ছেলের জন্য গাছ লাগিয়েছি, কিন্তু তা সব শিশুরই উপকারে আসবে। তারা এসে অক্সিজেন পাবে, ফল খেতে পারবে। প্রত্যেক পরিবার চাইলে নতুন সদস্য এলে কিছু গাছ লাগিয়ে ভবিষ্যতের জন্য অবদান রাখতে পারে।’
এদিকে পরিবেশ সচেতনতার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ স্থানীয় মানুষজনের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন প্রচেষ্টায় এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বিশ্বের প্রথম কার্বন-নিউট্রাল শিশু ছিল তামিলনাড়ুর আদাভি। ভারতের এই ছোট্ট মেয়েটির বাবা-মা, দিনেশ এবং জানাগা তাদের মেয়ের সারা জীবনের কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে তারা নিজেদের বাড়ির আশপাশে ৬ হাজার ফলের গাছ রোপণ করেন। এই অসাধারণ উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে এশিয়া বুক অব রেকর্ডস এবং তামিলনাড়ু সরকার তাদের সম্মাননা প্রদান করেন। তামিলনাড়ু সরকার আদাভিকে ‘চাইল্ড অ্যাম্বাসেডর অব গ্রিন মিশন’ বা সবুজ অভিযানের শিশুদূত হিসেবেও ঘোষণা করে। সন্তান জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন নিশ্চিত করার এই বার্তা পৌঁছে গেছে বাংলাদেশেও।