মাসুম মাহমুদ
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:২৩ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
জারা আর ওর মা দারুণ বন্ধু। দুজনেরই কল্পনা করতে ভালো লাগে। ওরা একসঙ্গে খেলে। গল্প করে। কত কিছু বানায়! জারা ছবি আঁকতে, মা ছড়া লিখতে ভালোবাসে। জারার আঁকা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে মা ছড়া লেখে। পড়ে মনে হয় ছবিটাই কথা বলছে। এভাবে মাঝে মাঝে ওরা ছড়াছবি বানায়। আজকেও একটা বানাল। জারার আঁকা মা পাখি ঠোঁটে করে ছাঁ পাখিকে খাবার খাইয়ে দেওয়ার ছবির নিচে জারার মা লিখেছেÑ
ওরে আমার সাত রাজার ধন,
লক্ষ্মীসোনা খাও,
বলো তো মা আমায় খাইয়ে
কি সুখ তুমি পাও!
জারার আঁকা একটা ছবি এ রকমÑ সাগরের তলদেশ থেকে ভেসে ওঠা প্লাস্টিক আর ময়লা-আবর্জনা উঁকি দিয়ে আছে সমুদ্রে বেড়াতে আসা মানুষজনের দিকে। মা ছবির নিচে দুই লাইন ছড়া লিখে দিল।
‘আমাদের মতো কাউকে সমুদ্রে ফেলো না আর,
যদি জানতে সমুদ্রের জন্য এ কি ভীষণ যন্ত্রণার!’
জারার আঁকা আরেকটা সুন্দর ছবিÑ এক পাশে কল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে, অন্য পাশে একদল শিশু থালা, বাটি, মগ হাতে পানির জন্য হাহাকার করছে। মা লিখে দিলোÑ
‘অকারণে অপচয়ে আমরা ঝরে পড়ছি পৃথিবীর গায়,
ওদের কি অপরাধ কেন ওরা এতটুকুও জল না পায়?
একটা ছবিতে একঝাঁক শিশু। কারও কারও পরনে নতুন, চকচকে রঙিন পোশাক। ওদের মুখে হাসি। কেউ কেউ পরে আছে পুরনো ছেঁড়া, ময়লা জামা। ফ্যাকাসে মুখ ওদের। ছবির নিচে জারার মা লিখেছেÑ
‘চকচকে, ময়লায় নেই মোদের বাড়তি কৌতূহল,
এ চোখে আনন্দোচ্ছ্বাস ও চোখে কেন এত জল?’
জারা ছবি তুলতেও ভালোবাসে। ওর তোলা অনেক ছবি আছে। গতকাল রাতে ওরা মা, মেয়ে রান্নাঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে হঠাৎ একটা ইঁদুর আবিষ্কার করে। রান্নাঘরের এক কোণে চুপটি মেরে বসে আছে। তাকে দেখে মা ছড়া কাটেÑ
‘কে গো তুমি ইঁদুর ভাইয়া, বলো তোমায় কী খেতে দিই?
এখনই যেও না দাঁড়াও, তোমার সুন্দর একটা ছবি তুলে নিই।’
তারপর জারার হাতে মোবাইল দিয়ে বলল, ‘নাও, একটা ছবি তুলে ফেলো। দেখছ না ছবি তুলতে কী সুন্দর পোঁছ দিয়ে আছে ইঁদুরটা!’
জারার মায়ের মোবাইলে তোলা এ রকম আরও সুন্দর সুন্দর ছবি আছে। একটা ছবি তুলেছিল ওদের ছাদবাগানে। সেদিন জারা গাছেদের যত্ন নিতে মায়ের সাথে ছাদে গেল। গিয়ে দেখল একটা ফুল মিষ্টি হেসে জারার দিকে তাকিয়ে আছে। ফুলগাছটা তাকিয়ে আছে জারার মায়ের দিকে। দেখে মা ছড়া কাটেÑ
‘এত সুন্দর ফুল হতাম নাকি তোমার যত্ন ছাড়া,
আমিও সবুজ বৃক্ষ হলাম তোমারই যত্নে জারা।’
জারা মায়ের হাত থেকে মোবাইল নিয়ে কয়েকটা ছবি তুলল। ছাঁ ফুলের একার ছবি, মা গাছের একার ছবি। আবার দুজনের একসাথের ছবি।
জারার আঁকা এবং ক্যামেরায় তোলা এ রকম যত ছবি আছে, সব ওর বাবা প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছে। আজ জারার জন্মদিন। ওর তোলা ছবিগুলোর প্রদর্শনীও। যেখানটায় জন্মদিনের কেক কাটবে, তার পেছনের দেয়ালে ছবিগুলো এরই মধ্যে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। আরেকটু পরেই কেক কাটা হবে। জন্মদিনের অতিথি জারার বন্ধুরা চলে এসেছে। কেক কাটতে জারার পাশে দাঁড়িয়েছে ওর ছোট ফুপুর ছোট্ট মেয়ে সারা। সারার জন্ম আমেরিকায়। সেখানেই থাকে ওরা। গতকালই বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছে। উঠেছে জারাদের বাসায়।
কেক কাটা হয়ে গেলে সবাই মজা করে কেক খায়। জন্মদিনের উপহারস্বরূপ জারার বন্ধুরা জারাকে গান শোনায়, আবৃত্তি করে শোনায়, অভিনয় করে দেখায়, কেউ নৃত্য পরিবেশন করে। সারা আমেরিকায় ওর স্কুলে শেখা একটা রাইম পড়ে শোনায়। তারপর সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে জারার আঁকা এবং তোলা ছবির প্রদর্শনী দেখছে।
হঠাৎ জারা দেখে কেক রাখা টেবিলের পায়ার ধারে সেই ইঁদুরটা! রাতে রান্নাঘরে ঢুঁ মেরেছিল যে। ঘটনা কী! সেও প্রদর্শনী দেখতে এলো নাকি! হতে পারে। প্রদর্শনীতে ওর নিজেরও ছবি আছে। নাকি কেকের গন্ধে গন্ধে চলে এসেছে! তা সে যে জন্যই আসুক, আগে ওর একটা ছবি তুলতে হবে। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সবার ছবি তোলা হয়েছে, ওর না তুললে হয়! ভাবতে ভাবতে জারা মায়ের কাছে যায় মোবাইল আনতে। এসে দেখে ইঁদুরটা আগের মতোই পোঁছ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী কাণ্ড! সত্যিই ছবি তুলবে! নাকি কেক খাবে! খাওয়ার জন্যও হতে পারে। ইঁদুর সর্বভুক প্রাণী, সে সবই খায়। মনে পড়তেই জারা দু টুকরো কেক দেয়। ইঁদুর মজা করে কেক খাচ্ছে। তা দেখে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে সারা। জারা মোবাইলটা ঘুরিয়ে সারার মুখের একটা ছবি তোলে। ইঁদুরের মতো ছোট একটা প্রাণীর খাওয়ার দৃশ্য দেখেও আনন্দে ভরে ওঠে যে মুখ, সেই মুখের ছবি। সারা তখনও লাফাতে লাফাতে বলছে, ‘মাউস ইটিং কেক, মাউস ইটিং কেক...।’