ড. মো. রুহুল আমীন
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:১৫ পিএম
টাঙ্গাইলের মধুপুুর জয়নাতলী গ্রামের সামছুল মাস্টারের বাগান
মাল্টা বাংলাদেশের একটি ব্যাপক জনপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় ফসল। সাইট্রাস গোত্রের এই সুস্বাদু ফল ভিটামিন সি, আঁশ, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর; যা নিয়মিত খেলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়, ত্বক উজ্জ্বল হয় এবং হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি কমে। একসময় মাল্টা চাষ শীতপ্রধান অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সুবাদে বর্তমানে এই ফল টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলার গড় অঞ্চল এবং নওগাঁ, দিনাজপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলার গড় অঞ্চলের মাটি পলল দোআঁশ থেকে কর্দমাক্ত, আয়রন অক্সাইড আধিক্য ও অম্লীয় লাল।
এ অঞ্চলে শীতকালে ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গ্রীষ্মকালে ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বার্ষিক ১০০০ থেকে ১৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়। উঁচু ও জলাবদ্ধতামুক্ত মাটি এবং বিদ্যমান আবহাওয়ার এই এলাকায় বিগত সাত-আট বছরে দুই শতাধিক মাল্টা বাগান গড়ে ওঠে। কৃষকরা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহযোগিতায় বারি মাল্টা-১ জাত চাষ করে আশাব্যঞ্জক ফলন এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকার সুবাদে সঠিক দাম পেয়েছেন। কিন্তু তিন বছর ধরে এ অঞ্চলের মাল্টা চাষিরা অনিষ্টকর রোগ ও পোকামাকড় প্রাদুর্ভাবের কারণে চরম সংকটে নিপতিত। চাষিরা যথেচ্ছাভাবে রাসায়নিক বালাইনাশক শিঞ্চন করে রোগ ও পোকামাকড় দমনের চেষ্টা করেন। ঢালাওভাবে বালাইনাশক শিঞ্চনের ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উপকারী পরাগী, পরভোজী ও পরজীবী পোকা, সাপ, ব্যাঙ ও অন্যান্য প্রাণিকূলের মৃত্যু এবং বায়ু ও পানি দূষিত হচ্ছে। সেইসঙ্গে নিরাপদ ফল উৎপাদনের একটি চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক চাষি তাদের মাল্টা বাগান কেটে হলুদ, পেঁপে ও কলা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে গবেষণা প্রকল্পের কার্যক্রম হিসেবে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব ও কৃষিতত্ত্ব বিভাগের গবেষকরা দেড় বছর ধরে মধুপুর, ঘাটাইল ও ধনবাড়ী উপজেলায় মাল্টা বাগান বারংবার পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ, উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী এবং মাল্টা চাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে মুখ্য আপদ হিসেবে দুটি রোগ এবং ছয় প্রজাতির পোকামাকড়ের সংক্রমণ শনাক্ত করেছেন। সংক্রমণকারী রোগ দুটি হচ্ছেÑ আগা মরা বা ডাই ব্যাক এবং সাইট্রাস গ্রিনিং। সংক্রমণকারী মুখ্য পোকামাকড়গুলো হলোÑ মামড়ি পোকা (স্কেল ইনসেক্ট), ছাতরা পোকা (মিলিবাগ), উঁকুন পোকা (এশিয়ান সাইলিড), পাতার সুড়ঙ্গ পোকা (লিফ মাইনার), লেবুর প্রজাপতি (লেমন বাটারফ্লাই) এবং লেবুর মাকড় (সাইট্রাস মাইট)।

সংকট সৃষ্টিকারী উপসর্গ
মধুপুর অঞ্চলে মাল্টা গাছে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টিকারী উপসর্গ হচ্ছে আগা মরা বা ডাই ব্যাক রোগ। এই রোগের সংক্রমণে গাছের শীর্ষভাগ থেকে শুরু করে পাতা ও ডালপালা শুকিয়ে মরে যায়, পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে এবং ফল বিকৃত হয়। ফোমপসিস, কলিট্রট্রিকাম এবং লেসিওডিপ্লয়ডিয়াগণের ছত্রাকের সংক্রমণ, সেই সঙ্গে মাটিতে জিংক ও কপারের ঘাটতি এবং সাইট্রাস গ্রিনিং ও ব্লাইট রোগজনিত কারণে গাছে পানি শোষণের বিঘ্নতা সামগ্রিকভাবে ডাই ব্যাক রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত। ভাইরাসঘটিত সাইট্রাস গ্রিনিং রোগ প্রধানত উঁকুন পোকার (এশিয়ান সাইলিড) সংক্রমণের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়। এই রোগে গাছের পাতা হলুদাভ হয়, নতুন পাতায় বিকৃত বৃদ্ধি ঘটে, ফল ছোট, বিকৃত বা অসমানভাবে বড় হয় এবং সালোকসংশ্লেষণ ব্যাঘাতজনিত কারণে গাছের বৃদ্ধি থমকে যায়। মামড়ি পোকা, ছাতরা পোকা ও উঁকুন পোকাগুলো তাদের অপূর্ণাঙ্গ ও পূর্ণাঙ্গ উভয় দশাতেই অনুবিন্ধন ও শোষণোপযোগী মুখোপাঙ্গ দ্বারা গাছের কচি পাতা ও শাখা, ফুল এবং কচি ফলের উপরিভাগ থেকে রস শোষণ করে এবং ক্ষতিকর ভাইরাস জীবাণুর বিস্তার ঘটায়। এসব পোকার আক্রমণে গাছের পাতা, ফুল ও কচি ফল কুঁচকে যায় এবং শুকিয়ে ঝরে পড়ে। আক্রান্ত শাখা ও ফলের উপরিভাগে পোকা নিংসৃত হানি ডিউ-এর ওপর শুটি মোল্ড ছত্রাক সংক্রমণের ফলে ঘন কালো স্তর তৈরি হয়। ফলের ওপর কালো দাগ পড়ে বাজারমূল্য কমে যায়। পাতার সবুজ অংশ ঢেকে যাওয়ার কারণে গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরির ক্ষমতা হ্রাস, দীর্ঘমেয়াদে গাছ দুর্বল হওয়া এবং উৎপাদন ও ফলের গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে অবনমিত হয়। সুড়ঙ্গ পোকার শূককীট (লার্ভা) নতুন কুঁড়ি ও কচি পাতা থেকে খাবার গ্রহণ করে আঁকাবাঁকা ও পেঁচানো ভাঁজ বা সাদা দাগ ও সুড়ঙ্গ তৈরি করে। মাত্রাতিরিক্ত আক্রমণে পাতা ঝরে গাছ দুর্বল হয় এবং ফলন কমে যায়। লেবুর প্রজাপতি পোকার শূককীট পাতার মধ্যশিরা ব্যতীত সমস্ত অংশ খেয়ে গাছ পাতাশূন্য করে ফেলে। ফলে গাছ দুর্বল হওয়ায় ফুল ও ফল উৎপাদন কমে যায়।

প্রশিক্ষণ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মধুপুর গড় অঞ্চলের মাল্টা গাছে সংক্রমিত এবং প্রাদুর্ভাব সৃষ্টিকারী মুখ্য রোগ ও পোকামাকড় শনাক্তকরণের পাশাপাশি তাদের দমন পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা করেন। তারা মধুপুর, ঘাটাইল ও ধনবাড়ী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন নিয়ে মোট ৩০ জন মাল্টা চাষিকে দুইবার দিনব্যাপী মাল্টা গাছের রোগ ও পোকামাকড় পরিচিতি ও দমন ব্যবস্থা এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। প্রশিক্ষণে মাল্টা চাষিদের বালাইনাশকের যথেচ্ছা ব্যবহার প্রশমনসহ মুখ্য রোগ ও পোকামাকড় সঠিকভাবে শনাক্ত করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার প্রতি মনোনিবেশে উৎসাহী করা হয়। প্রশিক্ষণে কৃষকদের নিয়মিত বাগান পর্যবেক্ষণ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার কৌশল হিসেবে আগাছা দমন, বাগান পরিষ্কার করা, গাছের অতিরিক্ত ডালপালা ছাঁটাই করে আলো-বাতাস চলাচল বাড়ানো, পরিমিত সার ও সেচ প্রদানের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রশিক্ষণে অবহিত করা হয় যে, সাইট্রাস গ্রিনিং রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য উঁকুন পোকা দমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগা মরা বা ডাই ব্যাক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য করণীয় হলোÑ আক্রান্ত অংশ দ্রুত কেটে অপসারণ, কাটা অংশে বোর্দো পেস্ট লাগানো, গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে তা দ্রুত নিষ্কাশন, জৈব ও রাসায়নিক সার সুষম ব্যবহার করে গাছ সবল রাখার ব্যবস্থা করা। জৈব ছত্রাকনাশক যেমন ট্রাইকোডার্মা মাটিতে প্রয়োগ করলে আগা মরা রোগ দমন ফলপ্রসূ হয়। রাসায়নিক ছত্রাকনাশক যেমনÑ কার্বেন্ডাজিম ৫০ডব্লিউপি (কার্বেন্ডাজিম), ম্যানকোজেব ৭০ডব্লিউপি (ম্যানকোজেব) বা কপার অক্সিক্লোরাইড ৫০ডব্লিউপি (কপার অক্সিক্লোরাইড) ডাই ব্যাক রোগ নিয়ন্ত্রণে ফলদায়ক। প্রশিক্ষণে মামড়ি পোকা, ছাতরা পোকা ও উঁকুন পোকা এবং মাকড় দমনের ক্ষেত্রে সবান বা ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি, নিমপাতার রস বা নিম তেল মিশিত পানি সিঞ্চন, আন্তঃফসল হিসেবে পুঁইশাক, কালোজিরা, ধনিয়া প্রভৃতি ফসল চাষে কৃষকদের মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। লেবুর প্রজাপতি পোকা দমনের ক্ষেত্রে ডিম ও ছোট শূককীটসহ আক্রান্ত পাতা হাত দিয়ে সংগ্রহ করে ধ্বংস করা সমন্বিত কৌশলের একটি অন্যতম উপাদান। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জানানো হয় যে, অণুজীবীয় বালাইনাশক যেমনÑ বায়ো বিটিকে এবং জৈব বালাইনাশক কে-মাইট, বায়েট্রিন ইত্যাদির ব্যবহার পোকামাকড় দমনের পরিবেশবান্ধব কৌশল। বাগান নিদারূণ আক্রান্ত হলে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ কৌশল হিসেবে কীটনাশক যেমন একতারা ২৫ডব্লিউজি (থায়ামিথক্সাম), প্রোক্লেম ৫ডব্লিউজি (ইমামেক্টিন বেনজয়েড), ইমিডাক্লোপ্রিড ১৭.৮এসএল (ইমিডাক্লোপ্রিড) প্রয়োগ করলে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যাবে।
পুষ্টিকর ফল মাল্টার চাষ বাংলাদেশে কৃষির একটি সুস্পষ্ট দীপ্তিমান খাত। সঠিক প্রযুক্তি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদান, মানসম্মত চারা এবং রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মধুপুর অঞ্চলসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় মাল্টা উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
লেখক : অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়