× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রতিবন্ধী মাহমুদুলের গ্রন্থাগার

মো. মাসউদুল আলম

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫২ পিএম

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম

গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা মো. মাহমুদুল হক (বাঁয়ে) 	প্রবা ফটো

গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা মো. মাহমুদুল হক (বাঁয়ে) প্রবা ফটো

ঝালকাঠি শহরের পুরনো একটি আবাসিক এলাকা বাকলাই সড়কÑ একসময় শান্তিপূর্ণ এ এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন বয়সের মাদকাসক্তদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীও নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন, নেশার অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে চুরি-ছিনতাই পর্যন্ত করছেন। এ নিয়ে অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ঠিক এ মুহূর্তে এক প্রতিবন্ধী যুবকের উদ্যোগে শুরু হয়েছে সমাজের অন্ধকার দূর করার ভিন্নধর্মী প্রয়াসÑ ‘কবি সুফিয়া কামাল গ্রন্থাগার।’

গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা মো. মাহমুদুল হক, যিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী, পেশায় একজন কম্পিউটার অপারেটর। শৈশব থেকেই তার নেশা বই পড়া। উচ্চশিক্ষা অর্জন না করতে পারলেও নিয়মিত পড়তেন বই। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও কাজী নজরুল ইসলামের লেখা তিনি বেশি পছন্দ করেন। তা ছাড়া তিনি অন্যান্য সাহিত্যিকের লেখাও পড়েন। তার প্রিয় উপন্যাস ‘দেবদাস’। এই বই পড়ার নেশাই তাকে অনুপ্রাণিত করেছে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠায়। তিনি বিশ্বাস করেন, বইয়ের আলো ছড়িয়ে দিলে সমাজের অন্ধকার কাটানো সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই ২০১০ সাল থেকে একটি লাইব্রেরি করার স্বপ্ন দেখতেন।

সেই থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি। অবশেষে ২০১৫ সালে নিজের বাড়ির ছাদে নিজ উদ্যোগে গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু করেন। ২০১৭ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনও পান। বর্তমানে গ্রন্থাগার প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে। বর্তমানে এই কবি সুফিয়া কামাল গ্রন্থাগারে বিভিন্ন ধরনের ১২০০ বই রয়েছে। বইগুলো মাহমুদুল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দানশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন। এখানে প্রতিদিন স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এসে বই পড়ে, দৈনিক পত্রিকা পড়ে। এই পাঠাগারের আশপাশে ৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুক্র ও শনিবার পাঠকদের এক মিলনমেলা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই দুই দিন বন্ধ থাকায় উপস্থিতি বেশি হয়। তবে পাঠাগারের কক্ষটি বেশ ছোট হওয়ায় মাঝেমধ্যে পাঠকদের জায়গা সংকুলান হয় না। অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় বৃষ্টিতে পানি পড়ে। পাঠকদের জন্য নেই ভালো বসার ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে এই কবি সুফিয়া কামাল পাঠাগারটি এ এলাকার জন্য হয়ে উঠতে পারে আদর্শিক একটি জায়গা, যেখান থেকে মানুষ আলোকিত হয়।

ঝালকাঠি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নাইম হোসেন প্রান্ত বলেন, প্রায় প্রতিদিন বিকালে আমি এখানে আসি। মাঝেমধ্যে উপন্যাস পড়ি, আড্ডা দিয়ে সময় না কাটিয়ে এখানে এসে বই পড়ি। এখানে আমার পাঠ্য বিষয়ের কিছু বই আছে, যা আমার পড়াশোনায় অনেক উপকার হয়।

গ্রন্থাগারের একজন নিয়মিত পাঠক ও সংগঠক মো. মজিবুল হক বলেন, আগে আমাদের এলাকায় বই পড়ার জায়গা ছিল না। এখন এখানে এসে পরীক্ষার পড়ার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস পড়ে জ্ঞান বাড়াতে পারছি। এখানে আমরা অনেক ধরনের বই, দৈনিক পত্রিকা পড়তে পারি। চাকরি থেকে অবসরের পর মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম, এখন এখানে এসে এর থেকে মুক্তি মিলছে। গ্রন্থাগার উন্নয়নের জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে আরও নতুন বই ও আসবাব যোগ করা হবে।

পাঠাগারের স্বপ্নদ্রষ্টা মো. মাহমুদুল হক বলেন, আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। সবার মতো স্বাভাবিক কাজ করতে পারি না। লেখাপড়াও খুব বেশি দূর পর্যন্ত করতে পারেনি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বই পড়তাম বইয়ের প্রতি আলাদা একটা প্রেম আছে। বইয়ের প্রতি প্রেম ও এলাকার তরুণ যুবসমাজের অবক্ষয়ের করুণচিত্র দেখে পাঠাগারের চিন্তা মাথায় আসে। আমি পাঠাগারের যাত্রা শুরু করার সময় তেমন কারও সহযোগিতা না পেলেও ধীরে ধীরে সরকারি-বেসরকারি ওয়ানের সহযোগিতায় মেয়ে এতটুকু আসতে পেরেছি। আমার গ্রন্থাগারে এখন আরও কিছু বই দরকার। গ্রন্থাগারের কক্ষটি আরও বড় করা দরকার। পাঠকরা এখানে এসে ভালো একটি পরিবেশে যাতে বই ও দৈনিক পত্রিকা পড়তে পারে, সেজন্য চেয়ার টেবিল প্রয়োজন।

ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ইমরান হোসেন রবিন বলেন, লাইব্রেরি শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়লে তারা খারাপ আসক্তি থেকে দূরে থাকবে। এ উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। শুধু শিক্ষার্থী নয়, সাধারণ মানুষও এই গ্রন্থাগার থেকে উপকৃত হবে। যারা স্কুল-কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পাননি, তারাও এখানে এসে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।

ছোট পরিসরে শুরু হলেও কবি সুফিয়া কামাল গ্রন্থাগার আজ ঝালকাঠি শহরের বাকলাই ফাঁড়ির মানুষের মধ্যে নতুন আলো ছড়াচ্ছে। একজন প্রতিবন্ধী তরুণের অদম্য উদ্যমের কারণে এই গ্রন্থাগার শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, বরং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার সম্ভাবনাময় পথ হয়ে উঠেছে। অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মানুষ একবাক্যে বলছেনÑ এটি সমাজের জন্য সত্যিই অনুপ্রেরণার উৎস।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা