জহিরুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ১৭:৪৫ পিএম
আঁকা : অর্নিলা ভৌমিক
সেদিন রাতটা ছিল একেবারে নীরব। বিদ্যুৎ ছিল না, তাই চারদিকটা বেশ অন্ধকার। তিতলি বসে ছিল বারান্দার ছোট্ট চেয়ারটায়। তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। তিতলিদের বারান্দা থেকে রাতের আকাশের বেশ বড় একটা অংশ চোখে পড়ে।
এত তারায় ভরা আকাশ এর আগে সে কখনও দেখেনি! যেন কেউ রাতের নীল ক্যানভাসে হীরের টুকরো ছড়িয়ে দিয়েছে।
তিতলি ফিসফিস করে বলল, তোমরা এত সুন্দর কেন? তোমরাও কি আমাদের দিকে তাকিয়ে থাক, নাকি আমরাই শুধু তাকাই তোমাদের দিকে?
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা তারা একটু বেশি ঝলকে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে যেন নেমে এলো তিতলির কাছাকাছি, একঝলক আলোর রেখায় রূপ নিয়ে!
তিতলি! আলোকরেখাটা বলল, তুমি আমায় ডাকছিলে, তাই চলে এলাম।
তিতলি কিছুটা আঁতকে উঠল। চোখ কচলিয়ে বলল, তুমি...। তুমি কি একটা তারা?
হ্যাঁ, আমি এক রাতজাগা তারা। আসলে তোমাদের পৃথিবী থেকে অনেক দূরের এক নক্ষত্র আমি। আমার নাম তোমরা জানো না। কিন্তু আজ আমি এসেছি তোমার সঙ্গে গল্প করতে।
তিতলি বলল, তুমি কীভাবে আমাকে খুঁজে পেলে?
তারা একটু হাসল।
তুমি যখন রাতের আকাশের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাক, তোমার চোখ থেকে একরকম আলোর স্রোত বের হয়। সেটা আমাদের কাছে পৌঁছে। আমরা তখন বুঝতে পারিÑ এই মেয়েটা শুধু চোখ দিয়ে দেখে না, মন দিয়ে অনুভবও করে। তাই আমি চলে এসেছি।
তিতলি লজ্জা পেয়ে বলল, আমি তোমাদের অনেক দিন ধরেই দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু জানো, তোমরা এত দূরে থাক বলে কথা বলতে পারি না।
তারা বলল, আজ সেই দূরত্ব আমি পেরিয়ে এসেছি। তোমার সঙ্গে গল্প করার জন্য।
তিতলি এবার তার ছোট্ট চেয়ারটায় একটু নড়েচড়ে বসল। তারপর বলল, তাহলে শুরু করো তোমার গল্প!
তারা শুরু করল।
আমরা একেকটা তারা একেকটা সূর্য। শুধু দূরে থাকায় আমাদের আলো তোমাদের কাছে ছোট দেখায়। কেউ কেউ এখনও জ্বলছি, কেউ কেউ নিভে গেছি, কিন্তু আলো এখনও পথে রয়েছেÑ এতটাই দূরত্ব।
তিতলি বিস্ময়ে বলে, তোমাদের সবাইকে কি আমাদের মতো কেউ না কেউ দেখে?
অবশ্যই! শুধু তোমরাই নও, এই মহাবিশ্বে আরও অনেক গ্রহ, অনেক চোখ আছে, যারা আমাদের দেখে। আমরা তাদের রাতের সঙ্গী, ঠিক যেমন তোমার।
তিতলি বলল, তাহলে কি আমার মতো আরেকটা তিতলি আছে কোনো দূরের গ্রহে, যে এখন তোমার দিকে তাকিয়ে আছে?
তারা একটু চুপ থেকে বলল, হয়তো আছে, হয়তো নেই। কিন্তু কল্পনায় সবই সম্ভব। তুমি তো জানোই, কল্পনা ছাড়া কোনো তারা কাছে আসে না।
তিতলি একটু হেসে বলল, তুমি এত ঝলমলে কেন? তুমি কি গ্যাস দিয়ে তৈরি?
হ্যাঁ, তারা বলল, আমরা বিশাল আগুনের গোলা। আমাদের গায়ে তাপ কোটি কোটি ডিগ্রি। আবার সেই তাপই আলো হয়ে তোমাদের চোখে পড়ে। আমরা আলোর পথিক।
তুমি কি জানো, তোমায় দেখে আমি কত রাত স্বপ্নে ভেসে গেছি? তিতলি মৃদু স্বরে বলল।
তাইতো আজ তোমার স্বপ্নের ভেতর চলে এলাম! তবে আমি শুধু তোমার স্বপ্ন নয়, তোমার প্রশ্নের উত্তর হয়েও এসেছি।
তিতলি চমকে উঠে বলল, উত্তর? কোন প্রশ্নের?
তুমি ভাবছিলে না, জীবন শুধু পৃথিবীতেই আছে কি না? আমি বলি, জীবন এক বিস্ময়। হয়তো পৃথিবীর বাইরে কোথাও কোনো দূর তারার চারপাশে ঘোরে এমন এক গ্রহ আছে, যেখানে তুমিই আরেক নামে বেঁচে আছ। যাকে তুমি দেখ না, কিন্তু সে তোমার সঙ্গে স্বপ্নে কথা বলে।
তিতলির গা কাঁটা দিয়ে উঠল। আকাশের বিস্তারে যেন সে নিজেই হারিয়ে গেল।
তাহলে তুমি কি আবার আসবে?
না তিতলি, আমি এই রূপে আর আসব না। তবে আকাশে তাকালেই আমি থাকব, ঝিকিমিকি আলোয়। যদি কখনও মন খারাপ হয়, যদি একা লাগে, আমি ঠিক তোমার পাশে থাকব। চোখে নয়, মনে।
তিতলি নিচু গলায় বলল, তাহলে আমি কী করে জানব, তুমি কোন তারা?
তারা হালকা স্বরে বলল, দেখো, আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটা তারা একটু বেশি কাঁপছেÑ ওটাই আমি। আমায় চিনতে পারবে, কারণ আমি তোমার মনের মতো আলো ছড়াই।
তিতলি চোখ তুলে তাকাল। সে সত্যিই দেখলÑ একটা তারা একটু একটু কাঁপছে, অন্যদের চেয়ে একটু বেশি উজ্জ্বল, একটু বেশি চেনা।
তারার কণ্ঠ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে লাগল, তুমি স্বপ্ন দেখতে থাকো তিতলি, আমি আকাশে ফিরে তোমার পানে চেয়ে থাকব।
তিতলি চুপচাপ বসে রইল। তার চোখ আকাশের দিকে।
চাঁদ একটু পাশে সরে গেল, যেন আজকের রাতটা শুধু তিতলি আর তারার জন্য আলাদা করে রাখল।