সারমিন ইসলাম রত্না
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ১৭:৪৩ পিএম
অলংকরণ : নুসরাত জাহান নওরিন, সপ্তম শ্রেণি, তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা
২৯৭১ সাল। পৃথিবীর আকাশে তখন আর ঘণ্টার শব্দ বাজে না। স্কুলের মাঠে আর ছেলেমেয়েরা দৌড়ায় না। ইউনিফর্ম পরে লাইনে দাঁড়ানোও যেন ছিল কোনো অতীতের গল্প। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়Ñ সবই এখন ইতিহাস। এখন সব শেখা যায় ঘরে বসে, যন্ত্রের মাধ্যমে।
শিশুদের ঘরে এখন থাকে ‘এডু-সফট’ নামের এক যন্ত্র। এই যন্ত্র চোখে বসালেই মস্তিষ্কে ঢুকে যায় অজস্র তথ্যÑ বিনা প্রশ্নে, বিনা ভাবনায়। হঠাৎ বিজ্ঞানীদের চোখে পড়ে কিছু সমস্যা। শিশুরা ধীরে ধীরে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কেউ খেলতে যায় না, কেউ কাজের প্রতি মনোযোগ দেয় না। ঘরের মধ্যে বসে, চোখে যন্ত্র লাগিয়ে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ আর হাসেও না।
একদিন...
নয় বছর বয়সি রিমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি কি সব সময় এমনই থাকব?’
মা পেছন থেকে এসে বললেন, ‘কী হয়েছে রিমি?’
রিমি বলল, ‘মা, আমি হাসতে ভুলে গেছি!’
তারপর একটু চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি কখনও প্রাণ খুলে হেসেছ? আনন্দ করেছ? কেমন ছিল তোমার ছোটবেলা?’
মা মুচকি হাসলেন। চোখে জল। “আমি স্কুলে যেতাম রিমি। সকালে ঘুম ভেঙে ব্যাগ গুছাতাম, ইউনিফর্ম পরতাম, আর বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ে স্কুলে যেতাম। ক্লাসে স্যাররা গল্প বলতেন, প্রশ্ন করতেন, আমরা হাত তুলে উত্তর দিতাম। রেজাল্ট হলে পুরস্কার পেতাম। ভুল হলে কান ধরে দাঁড়াতে হতো!’
রিমি বিস্মিত হয়ে বলল, ‘সত্যি মা? এত মজা হত?’
মা বললেন, ‘স্কুল মানেই ছিল হেসে শেখা, খেলতে খেলতে জানার আনন্দ। একসঙ্গে বসে খাওয়া, একসঙ্গে বই পড়া, একসঙ্গে গান গাওয়া... সেটা ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়।’
রিমির চোখ চকচক করে উঠল। ‘আমি তো কখনও এমন কিছু করিনি! আমি তো কখনও স্কুলে যাইনি। আমি কি পারব মা, আবার এমন একটা জায়গা বানাতে?’
মা বললেন, ‘তুই যদি চাস, রিমি, তোর মাঝেই হয়তো আবার স্কুল জেগে উঠবে।’
পরের দিন...
রিমি বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বলল, ‘তোমরা জানো? একসময় একটা জায়গা ছিল যেখানে সবাই একসঙ্গে হতো, শিখত, খেলতÑ ওটার নাম স্কুল!’ তানিশ বলল, ‘যন্ত্রে শেখাই সহজ।’ রিমি বলল, ‘তুমি জানো না, শেখা মানে শুধু মুখস্থ নয়। শেখা মানে ভাবা, অনুভব করা, প্রশ্ন করা।’ সাথী বলল, ‘আমরা তো এখন কেউ কারো সঙ্গে গল্প করি না, খাই না, খেলি না!’ রিমি বলল, ‘আমরা আবার স্কুল বানাব। একটা জায়গা যেখানে থাকবে খেলার মাঠ, গল্পের ঘর, বিজ্ঞান ল্যাব, লাইব্রেরিÑ সবকিছু!’
কিছুদিন পর...
পুরনো এক ধ্বংসাবশেষে গিয়ে রিমি আর বন্ধুরা মিলে খুঁজে পেল এক ভাঙা বিল্ডিং। ওরা জঞ্জাল সরিয়ে, রঙ করে, চেয়ার টেনে আনল। রিমি দেয়ালে লিখলÑ
‘স্কুল মানে শুধু পড়া নয়,
স্কুল মানে মানুষ হওয়া।’
শুরু হলো ‘নিউ লার্নিং হাউস’ নামের নতুন স্কুল।
প্রথমদিন রিমি বলল, ‘আজ আমরা জানবÑ আমরা কেন আছি! প্রথম পাঠ : আমি কে?’
এক সপ্তাহ পর...
রিমি চোখ বন্ধ করে বলল, ‘আমরা কেউই রোবট না, আমরা মানুষ। আমাদের হাসি দরকার, বন্ধুত্ব দরকার, প্রশ্ন দরকার। দরকার একটা স্কুলের।’ পুরো ক্লাস হাততালি দিয়ে উঠল। সবাই অবাক হয়ে দেখল! যেখানে যন্ত্রশিক্ষা ব্যর্থ, সেখানে এই ছোট স্কুলটিতে শিশুদের চোখে আনন্দ, মুখে হাসি, মনে প্রশ্ন। পৃথিবীর অন্য শহরগুলোও স্কুল পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নিল।
রিমি তখন বোর্ডে লিখে দিলÑ
‘মানুষের ভবিষ্যৎ শুধু যন্ত্রে নয়।
স্কুলেই মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে।’