সাইদুর রহমান আসাদ
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ১৭:০৫ পিএম
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পুরান লক্ষণশ্রী গ্রামের নারী জৈব সার উৎপাদনকারী ফেরদৌসী বেগম
কেঁচো ও জৈব সার উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পুরান লক্ষণশ্রী গ্রামের নারীরা। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জৈব সার ক্রয় করতে ছুটে আসেন চাষিরা। এতে যেমন ভালো ফলন পাচ্ছেন কৃষক, অন্যদিকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন কেঁচো ও জৈব সার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। কোনো ধরনের উৎপাদন ব্যয় ছাড়াই তারা প্রতি বছরে আয় করছেন লাখ টাকার ওপরে।
২০২০ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে কেঁচো ও জৈব সার উৎপাদনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পুরান লক্ষণশ্রী গ্রামের নারী উদ্যোক্তা ফেরদৌসী বেগমসহ কয়েকজন নারী। অন্য নারীরা উদ্যোক্তা হতে অনাগ্রহী হলেও হাল ছাড়েননি ফেরদৌসী বেগম, শিল্পী বেগমসহ কয়েকজন। প্রথমে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ২ কেজি অস্ট্রেলিয়ান কেঁচো এবং ১২টি স্ল্যাব রিং দেওয়া হয়। নিজের বাড়িতে থাকা গরুর গোবর দিয়ে তিনি উৎপাদন করেন জৈব সার। সেই জৈব সার তিনি আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকের কাছে কেজি দরে বিক্রি করেন। এর প্রচার হতে শুরু করলে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকরা সবজি এবং ধানের ক্ষেতে ব্যবহার করে কৃষক লাভবান হওয়ায় ক্রয় বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তীতে তিনি নিজ গ্রামে আরও কয়েকজন উদ্যোক্তা তৈরি করেন। বর্তমানে তিনি কৃষি বিভাগসহ বিভিন্ন কৃষকের কাছে মণ হিসেবে বিক্রি করছেন। তা ছাড়া কেঁচো প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ায় কেঁচোও বিক্রি করছেন কেজি দরে।
পুরান লক্ষণশ্রী গ্রামের নারী উদ্যোক্তা ফেরদৌসী বেগম বলেন, প্রথমে একটি দাতা সংস্থা আমাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে। নিজেদের কোনো পুঁজি খাটাতে হয়নি। এই সার উৎপাদনের জন্য গোবর একুশ দিন পর্যন্ত রেখে পচাতে হয়। পরে স্ল্যাবের রিঙের ভেতর পরিমাণমতো পচা গোবরের সঙ্গে কেঁচো ছেড়ে দিতে হয়। ষাট দিন পর এগুলো জৈব সারে পরিণত হয়। এরপর আমরা চালুনি দিয়ে ছেকে জৈব সার আলাদা করে নিই। নিজের ঘরে গরু থাকলে সহজেই গোবর পাওয়া যায়। আমাদের কোনো খরচ নেই। এখন বছরে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো জৈব সার ও কেঁচো বিক্রি করতে পারি।
তিনি বলেন, জৈব সার উৎপাদন খুবই সহজ। ঘরের অন্য কাজের পাশাপাশি যে কেউ জৈব সার উৎপাদন করতে পারবেন। এর কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। মাটিও ভালো থাকে, শরীরেরও কোনো ক্ষতি হয় না।
তিনি আরও বলেন, প্রতি মণ জৈব সার পাইকারি ৬০০ টাকা এবং খুচরা ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছি আর কেঁচো বিক্রি করছি ১ হাজার টাকা কেজি। কৃষক, বিভিন্ন বাগানের মালিক এবং কৃষি অফিস আমাদের কাছ থেকে এগুলো ক্রয় করে থাকেন। উৎপাদনে এখন আমাদের কোনো খরচ নেই, শুধু পরিশ্রমটাই করতে হয়। যা বিক্রি করি তাই লাভ।
একই গ্রামের বাসিন্দা শিল্পী বেগম বলেন, আমার গরু আছে ৭টি তাই আমাকে গোবর সংগ্রহ করতে কোনো সমস্যা হয় না। শুরুতে একটি বেসরকারি সংস্থা সহযোগিতা করেছিল। রিং, কেঁচো সব এই সংস্থা থেকে দিয়েছিল। এই উৎপাদনে আমাদের কোনো পুঁজি নেই, শুধু পরিশ্রমটাই করতে হয়; যা বিক্রি হয় সবই লাভ। আমরা আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হচ্ছি। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষকরা সার কিনতে আসেন। তা ছাড়া কৃষি অফিস থেকে আমাদের কাছ থেকে জৈব সার ও কেঁচো ক্রয় করেন। আমরা নিজেরাও ক্ষেতে এই সার ব্যবহার করে থাকি। শিল্পী বেগমের স্বামী শফিকুন্নুর বলেন, এই কাজে তেমন কোনো পরিশ্রম নেই। শীতের সিজনে সার বেশি বিক্রি হয়। আমাদের ১৮টি স্ল্যাব রিং রয়েছে। ১৮টি রিংয়ে প্রায় ১২ মণ সার উৎপাদন হয়। দেড় মাস পরপর সার বিক্রি করা যায়। পাইকারি হারে ৬০০ টাকা কেজি দরে সার বিক্রি করি। তা ছাড়া এবার ১০ কেজি কেঁচো বিক্রি করেছি প্রতি কেজি ৯০০ টাকা করে।
এই গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, এই সার বিক্রি করে তারা অনেক লাভবান হচ্ছেন। আমরাও এই সার নিয়ে ক্ষেতে ব্যবহার করি। এটি খুবই ভালো। প্রতি সপ্তাহে লোকজন জৈব সার ক্রয় করতে এই গ্রামে আসেন। এই ব্যবসায় কোনো লোকসান নেই, সবই লাভ।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল আলম বলেন, সদর উপজেলায় প্রতি মাসে ২০ টন জৈব সার উৎপাদন হয়। কৃষকের চাহিদা রয়েছে এই সারের প্রতি। আমরাও বিভিন্ন সময় জৈব সার উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে কৃষকদের বিতরণ করি।