× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারীদের জীবন বদলে দেওয়া কাঁকড়ার খামার

মাশরুর মুর্শেদ

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১৫:৪৮ পিএম

নারীদের জীবন বদলে দেওয়া কাঁকড়ার খামার

সকাল ৭টা। রাতের শিশিরে ভেজা শ্যামনগরের কপোতাক্ষ নদের তীরের সরুবাঁধ। মেঘলা আকাশে সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। তবু হাতে ঝুড়ি, মাথায় কাপড় বেঁধে খামারের পথে হাঁটছেন একদল নারী। কেউ বাচ্চাকে কোলে নিয়ে যাচ্ছেন, কেউবা দুই মাইল হেঁটে আসছেন খালি পায়ে। তারা জানেন, আজ কাজ না করলে পরিবারে রাতের খাবার জুটবে না। রওশন আরা (৩২) তাদেরই একজন। ভোরে উঠে এক মুঠো ভাত-ডাল খেয়ে খামারের পথে ছুটে আসেন। প্লাস্টিকের বক্সে রাখা কাঁকড়াগুলোর জন্য বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ কেটে খাবার তৈরি করেন তিনি। দিনের শেষে ৪০০ টাকার মতো মজুরি পান। ঝড়ের পর স্বামী সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মাছও আর পাওয়া যায় না। ঘরে দুই ছেলেমেয়ে, তাদের মুখের দিকে তাকালে বুকটা কেঁপে ওঠে। এই খামার না থাকলে হয়তো ওদের স্কুলে পাঠানো দূরে থাক, খাবার জোগাড় করতেও পারতাম না।

কাঁকড়া চাষে নতুন জীবনের স্বপ্ন

সুন্দরবনের পাড়ঘেঁষা শ্যামনগরের নারী-পুরুষ এখন সফটশেল কাঁকড়া চাষের ওপর নির্ভরশীল। আগে কৃষি কাজ বা মাছ ধরার মাধ্যমে সংসার চলত, কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আম্পান, সিডর আর নিয়মিত নদীভাঙন সবকিছু বদলে দিয়েছে। এখন অনেকের একমাত্র আশ্রয় এই কাঁকড়ার খামার।

মুন্সীগঞ্জের খামার মালিক আব্দুল্লাহ আল কায়ুম আবু বলেন, আমাদের খামারে প্রতিদিন ২০-২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন, বেশিরভাগই নারী। কাঁকড়া যত বড় হয়, ততই বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। তবে কাঁকড়ার পোনা পুরোপুরি সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করতে হয়। যদি হ্যাচারি করা যায়, তাহলে উৎপাদন আরও বাড়বে, নারী শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগও বৃদ্ধি পাবে।

একমুঠো স্বপ্ন বুকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন নারীরা

মমতাজ বেগম (২৮) খামারের কাজে আসেন দুই বছরের বাচ্চা নিয়ে। শিশুটি একপাশে শুয়ে থাকে আর তিনি তেলাপিয়া মাছ কেটে প্রস্তুত করেন। কাজ না করলে তো ঘরে খাবার থাকবে না। আমার স্বামী মাছ ধরতে যায়, কিন্তু আগের মতো আয় হয় না। এই খামার আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। বাচ্চার ভবিষ্যতের জন্য এই কাজটা ছাড়তে চাই না, চোখ মুছতে মুছতে বলেন মমতাজ।

খামারের শ্রমিকদের একজন রেনু খাতুন বলেন, আমরা কাঁকড়া বাচ্চার পা কেটে খাঁচায় দিই। তারপর নিয়মিত খাবার দিই। খোলস পাল্টালেই রপ্তানি হয়। কাজটা কষ্টের, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য এটা আমাদের একমাত্র ভরসা।

শুধু অর্থ নয়, আত্মসম্মানও ফিরেছে

আগে শ্যামনগরের নারীদের ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার সুযোগ কম ছিল। কাঁকড়া খামারে কাজ শুরু হওয়ার পর তারা কেবল আয় করছেন না, নিজেদের মূল্যবোধও ফিরে পেয়েছেন।

রওশন আরা বলেন, আগে স্বামীর কাছে হাত পাততে হতো, এখন নিজেই আয় করি। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ দিই। গ্রামের মানুষ এখন আমাদের সম্মানের চোখে দেখে।

উপকূলীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম বলেন, কাঁকড়া শিল্প নারী শ্রমিকদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তারা শুধু পরিবারকেই বাঁচাচ্ছেন না, স্থানীয় অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

শঙ্কার ছায়া ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা

তবে এই শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে সংকট তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুমে আহরণে নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ছাড়া এই শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

রওশন আরা ও মমতাজদের স্বপ্নও তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত। ‘আমরা চাই সরকার যেন হ্যাচারি করে, যাতে কাজ থাকে। খামার বন্ধ হয়ে গেলে কোথায় যাব?’ বললেন মমতাজ বেগম।

আশার আলো

কাঁকড়ার খামার শ্যামনগরের নারীদের জীবনে নতুন আলো জ্বালিয়েছে। তারা শুধু নিজেদের পরিবারের দায়িত্বই সামলাচ্ছেন না, পরিবর্তন করছেন পুরো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।  

রওশন আরা বলেন, আমি চাই আমার মেয়ে বড় হয়ে ডাক্তার হোক। এই খামারের কাজ থেকে যা আয় করি, তা দিয়েই ওর পড়াশোনা চালাচ্ছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতবিক্ষত উপকূলে কাঁকড়া খামার এখন কেবল একটি জীবিকার উৎস নয়; এটি নারীদের হাতে ধরা নতুন আশার প্রতীক। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা থাকলে এই আশার আলো আগামী দিনগুলোতেও টিকে থাকবে। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা