মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৫ ১৩:২৪ পিএম
তেলাপোকা, ছারপোকা ও উইপোকা আমাদের ঘরবাড়িতে বসবাসকারী অন্যতম বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর পোকামাকড়। এই পোকামাকড়গুলো শুধু অস্বস্তি সৃষ্টি করে না, বরং জীবাণু ও নানা রোগের সংক্রমণের কারণ। তেলাপোকা, ছারপোকা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি উইপোকা ঘরের আসবাবপত্র, বই ও কাগজপত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করে থাকে। সাধারণত অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে এদের জন্ম ও বিস্তার ঘটে। এই পোকামাকড়গুলো খুবই দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং একবার ঘরে ঢুকলে সহজে দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাসাবাড়ি, অফিস কিংবা গুদামঘরÑ সব জায়গাতেই এসব কীট নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তেলাপোকা, ছারপোকা ও উইপোকা থেকে মুক্তি পেতে সচেতনতা ও নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।
তেলাপোকা দূর করার জন্য ঘরোয়া কয়েকটি পদ্ধতি
বোরিক পাউডার
বোরিক পাউডার, ময়দা ও কোকো পাউডার মিশিয়ে ঘরের কোণে ছড়িয়ে দিন। তেলাপোকা এটি খেয়ে মারা যাবে।
তেজপাতা গুঁড়ো
তেজপাতার তীব্র গন্ধ তেলাপোকা সহ্য করতে পারে না। তেজপাতা গুঁড়ো করে ঘরের কোণে ছিটিয়ে দিন বা তেজপাতা ফোটানো পানি স্প্রে করুন।
নিম/পিপারমিন্ট তেল
নিম তেল পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করুন, পিপারমিন্ট তেলও তেলাপোকা দূর করতে সাহায্য করে।
ন্যাপথলিন
তেলাপোকা বেশি আসা স্থানে ন্যাপথলিন রাখুন, এর গন্ধ তেলাপোকাকে দূরে রাখবে।
বিভিন্ন মিশ্রণ
এক লিটার পানিতে রসুন, পেঁয়াজ ও গোলমরিচ বেটে মিশিয়ে তেলাপোকার স্থানগুলোতে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
সমপরিমাণ বেকিং সোডা ও চিনি মিশিয়ে ঘরের কোণে ছড়িয়ে দিন। চিনি তেলাপোকাকে আকৃষ্ট করবে, আর বেকিং সোডা খেয়ে তারা মারা পড়বে।
বাজারে পাওয়া বিশেষ তেলাপোকা মারার স্প্রে ব্যবহার করলে তেলাপোকা দ্রুত মারা যায়। স্প্রে ঘরের কোণে, ফাটলে, আসবাবপত্রের নিচে স্প্রে করতে হয়।

ছারপোকা খুবই বিরক্তিকর ও ধ্বংসাত্মক একটি পোকা, যা মানুষের রক্ত খেয়ে বাঁচে এবং রাতের বেলায় সক্রিয় হয়। এগুলো বিছানা, তোশক, বালিশ, সোফা, পর্দা, কাপড় এমনকি দেয়ালের ফাঁকেও লুকিয়ে থাকতে পারে। ছারপোকা দূর করার কিছু কার্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি-
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
বিছানা, গদি, বালিশ, কম্বল নিয়মিত গরম পানি (৬০°C) দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ঘরের কোণা, ফাটল এবং আসবাবের জয়েন্ট পরিষ্কার করুন।
তাপ প্রয়োগ
তোশক, বালিশ ও কম্বল মাঝেমধ্যে রোদে শুকাতে দিন, এতে পোকাগুলো মারা পড়ে। ছারপোকা ও তাদের ডিম ৫০°C ওপরে তাপে মারা যায়। গদি বা কাপড় গরম পানিতে ধুয়ে ড্রায়ারে উচ্চ তাপে শুকান। হেয়ার ড্রায়ার দিয়েও বিছানা বা ফার্নিচারের কোণায় গরম বাতাস প্রয়োগ করতে পারেন।
প্রাকৃতিক উপায়
ডায়াটোমেশিয়াস আর্থ এটি একটি প্রাকৃতিক পাউডার, যা ছারপোকার শরীর শুকিয়ে মেরে ফেলে। গদি, কার্পেট, ফাটলে ছিটিয়ে দিন, ১০-১৪ দিন রেখে ভ্যাকুয়াম করুন।
টি ট্রি অয়েল বা ল্যাভেন্ডার অয়েল পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করুন। এটি ছারপোকাকে তাড়াতে সাহায্য করে।
রাসায়নিক পদ্ধতি
পেস্টিসাইড বা কীটনাশক ব্যবহার করুন যা ছারপোকার জন্য নির্দিষ্ট। তবে ব্যবহারের আগে নির্দেশনা ভালো করে পড়ুন এবং সতর্কতা অবলম্বন করুন।
গদি কভার
বিশেষ বেড বাগ প্রুফ গদি কভার ব্যবহার করুন, যা ছারপোকাকে আটকে রাখে এবং তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করে।
নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
বিছানায় রক্তের দাগ, ছারপোকার খোলস বা কালো দাগ (মল) দেখলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিন। পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল সার্ভিসের সাহায্য নিন, বিশেষ করে বড় আক্রমণের ক্ষেত্রে।
উইপোকা ঘরের কাঠের আসবাবপত্র ও কাঠামোর জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর। উইপোকা দূর করার কার্যকর কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতি-
১) তুলা দিয়ে কাঠের ফাঁক-ফোঁকরে বা আক্রান্ত জায়গায় নিম তেল লাগান।
২) ১ কাপ ভিনেগার ও ২ চামচ লেবুর রস স্প্রে বোতলে নিয়ে কাঠের আক্রান্ত জায়গায় প্রতিদিন স্প্রে করুন।
৩) উইপোকা মারতে বোরাক পাউডার আক্রান্ত কাঠের গায়ে ছিটিয়ে দিন বা পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করুন।
৪) উইপোকা অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ পছন্দ করে। কাঠের জিনিসপত্র কিছুদিন রোদে রাখলে উইপোকা পালিয়ে যায়।
৫) যদি কাঠের কোনো অংশ খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটা কেটে বা তুলে ফেলে পুড়িয়ে দিন।
পেশাদার পেস্ট কন্ট্রোল
যদি সংক্রমণ বেশি হয়, পেস্ট কন্ট্রোল কোম্পানি ডেকে পুরো বাড়ি/ঘর চেক ও স্প্রে করিয়ে নিন।
সতর্কতা
১) সব সময় গ্লাভস ও মাস্ক পরে কেমিক্যাল ব্যবহার করুন।
২) শিশুদের ও খাবারের আশপাশে কেমিক্যাল ব্যবহার করবেন না, সব রকমের ব্যবস্থায় সাবধানতা অবলম্বন করবেন।
তেলাপোকা, ছারপোকা ও উইপোকা দূর করতে চাইলে শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিকার নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা, আলো-হাওয়া চলাচল নিশ্চিত করা, এবং সচেতন থাকলেই এসব পোকামাকড়ের উপদ্রব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রয়োজনে পেশাদারের সাহায্য নেওয়া উচিত।