মাহবুবা মিতু
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৫ ১৫:৪০ পিএম
শিশুর মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা বাড়াতে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। শিশুরা কথা বলতে শেখার অনেক আগে থেকেই শব্দ সংগ্রহ করতে শুরু করে। শিশুদের গল্প পড়ে শোনানো, ছড়া আবৃত্তি করা শব্দ ভান্ডারের সমৃদ্ধ ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে। শিশুর জীবনের শুরু থেকেই বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে ভাষার ভিত্তি, কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তির উন্নয়ন ঘটে।
একজন অভিভাবক হিসেবে আমরা চাই আমাদের সন্তান বই পড়ুক, শেখার আগ্রহ বাড়ুক, কল্পনাশক্তি প্রসারিত হোক। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়—বই কিনে দিলেও তারা পড়ে না, কিংবা দু’পাতা পড়ে রেখে দেয়। কারণ শুধু বই কিনে দিলেই হবে না, বইটি তাদের বয়স, আগ্রহ ও মানসিক স্তরের উপযোগী কি না, সেটি যাচাই করা জরুরি। নিচে বাচ্চাদের বই বাছাইয়ের জন্য কার্যকরী টিপস সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১) বয়সভিত্তিক বই নির্বাচন করুন
প্রতিটি বয়সে শিশুদের শেখার ধরন ও আগ্রহ ভিন্ন হয়। সঠিক বয়সে সঠিক বই বেছে নেওয়া শিশুদের পাঠাভ্যাস তৈরি এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধ গঠনে সহায়তা করে।
০ থেকে ২ বছর

এই বয়সে শিশুরা কথা বলতে শেখার আগেই শব্দ চিনে নেয়, চেহারা, রঙ ও শব্দের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই গল্প শোনানো, ছড়া বলা এবং বইয়ের ছবিগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে কথা বলায় শিশুর ভাষা ও চিন্তার বিকাশ ঘটে। এই বয়সে যেসব বই দেওয়া উচিত তা হচ্ছে শক্ত বোর্ডের, যা টেকসই এবং শিশুরা ধরতে, টানতে বা মুখে দিতে গেলেও সহজে নষ্ট হয় না। এছাড়াও কাপড়ের বই, প্লাস্টিক ‘বাথ’বই, ইন্টারঅ্যাকটিভ বই যেমন- ফিঙ্গার হোল, ফ্ল্যাপ, স্লাইডারসহ বইগুলোও ওর জন্য হতে পারে চমৎকার অপশন।
২ থেকে ৫ বছর
এ বয়সে শিশুরা ছবি দেখে গল্প শুনতে ভালোবাসে। তারা সহজ কাহিনী, চরিত্র, ছোটখাটো দ্বন্দ্ব ও সমাধান বুঝতে পারে। তাই এই এইজ গ্রুপের বাচ্চাদের গল্পভিত্তিক বই দেবার উপযুক্ত সময়। দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা নিয়ে লেখা বই (যেমন: বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, স্কুলে যাওয়া) ছড়া ও কবিতা বই, পুনরাবৃত্তিমূলক বাক্য ও ছন্দময় লেখা প্রাণবন্ত, রঙিন চিত্রসহ বই বড় ফরম্যাটে লেখা বই এবং ছোট ছোট বাক্যের।
৬ থেকে ৮ বছর
এই বয়সে শিশুরা ধীরে ধীরে নিজে নিজেই পড়তে শেখে। এখন তাদের জন্য প্রয়োজন সহজ ভাষায়, আকর্ষণীয় গল্পে পূর্ণ বই যা তাদের আগ্রহ ধরে রাখবে। ছোট বাক্যে লেখা সহজ গল্প, শিশুদের কল্পনাশক্তি ও আগ্রহ অনুসারে গল্প, কমিক বই, ছড়া, চিত্রসহ গল্প, যাতে ধাপে ধাপে পূর্ণ বইয়ে অভ্যস্ত হয় পড়া সহজ হয় এমন বড় অক্ষরের।
৭ থেকে ১০ বছর

এই বয়সে শিশুদের কল্পনা, যুক্তি ও অনুভূতি গভীর হয়। তারা সিরিজ পড়তে পছন্দ করে, চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং গল্পে মিশে যায়। এই বয়সের জন্য আদর্শ বই- সিরিজ বা ধারাবাহিক বই যেমন- তিন গোয়েন্দা, ফেলুদা সমগ্রের স্বতন্ত্র গল্পের বইগুলো, গোয়েন্দা কিশোর, শিশুসাহিত্য, মজার কল্পকাহিনী ও রূপকথা, হাসির বই, কৌতুক, ধাঁধার বই, বিশ্বের ক্লাসিক বইগুলো, যাতে অল্প ছবি থাকবে। সেবা প্রকাশনা, পাঞ্জেরী প্রকাশনের চমৎকার কিছু বই রয়েছে এমন বয়স ভিত্তিক বিশ্বের ক্লাসিক বইগুলো নিয়ে।
১০ বছর ও তার ঊর্ধ্ব
এই বয়সে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বড় পরিবর্তন আসে। বই তাদের আত্মপরিচয়, অনুভূতি ও সমাজের বিষয়গুলো বুঝতে সাহায্য করে। তারা গভীর, পরিণত ও অর্থবহ গল্প খুঁজে পায়। এ এইজ গ্রুপে আত্মজীবনী, ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস, সমসাময়িক সমস্যা ও সম্পর্ক নিয়ে লেখা কিশোর উপন্যাস, প্রিয় বিষয় নিয়ে লেখা তথ্যবহুল বই (যেমন: প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, খেলাধুলা), ভিন্ন ঘরানার (হরর, সায়েন্স ফিকশন, রহস্য) বই দেয়া যায়।
এ স্টেজে বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়ার জন্য বুক চ্যালেঞ্জ তৈরি করুন। বই পড়ে ডায়েরি বা রিভিউ লিখতে উৎসাহ দিন, লিখতে আগ্রহী হলে ব্লগ বা ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাতে উৎসাহ দিন।
২) সন্তানের আগ্রহকে অগ্রাধিকার দিন
আপনার সন্তান কী নিয়ে বেশি আগ্রহী—রূপকথা, রহস্য, প্রাণী, মহাকাশ, নাকি মজার কাহিনী? আমার ছেলে ডাইনোসর নিয়ে খুব আগ্রহী ছিল, তাই প্রথম তাকে ডায়নোসর বিষয়ক বই এনে দিই। সে আনন্দের সঙ্গে পড়েছে। বই পড়া তখন তার কাছে একঘেয়ে পড়াশোনা নয়, বরং এক নতুন দুনিয়ায় ঢুকে পড়া।
৩) ছবি ও রঙিন পৃষ্ঠাসমৃদ্ধ বই বাছাই করুন
ছোটদের জন্য ছবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন: চাঁদের বুড়ি, নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্প বা কালারফুল এনসাইক্লোপিডিয়া। ছবির মাধ্যমে তারা বুঝতে শেখে, মনোযোগ ধরে রাখে এবং আগ্রহ তৈরি করে।
৪) গল্পের ভাষা সহজ ও সাবলীল কিনা তা দেখুন
আমাদের দেশের অনেক বাংলা শিশুসাহিত্য এখনো কঠিন ভাষায় লেখা হয়, যেটি শিশুদের জন্য বোধগম্য নয়। তাই চেষ্টা করুন এমন বই বাছতে যেখানে ভাষা সহজ, সংলাপভিত্তিক এবং সংক্ষিপ্ত।

৫) শিশুকে বইয়ের সঙ্গে সময় দিন
শুধু বই কিনে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। প্রথম প্রথম তার সঙ্গে বসে বই পড়ুন। গল্পটি আলোচনা করুন। প্রশ্ন করুন—“তোমার পছন্দের চরিত্র কে?”, “তুমি হলে কী করতে?” এভাবে তারা বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে শিখবে।
৬) প্রিন্ট কোয়ালিটি ও অক্ষরের ফন্ট বিবেচনায় রাখুন
অনেক সময় খুব ছোট ফন্টে লেখা বই শিশুদের চোখের জন্য কষ্টদায়ক হয়। বাংলাদেশে প্রকাশিত অনেক বই এখন ভালো মানের প্রিন্ট ও মোটা অক্ষর ব্যবহার করছে সেগুলোই বেছে নিন।
৭) ইংরেজি বইয়ের ক্ষেত্রে ফনেটিক বা অনুবাদ সহায়তা
আপনি যদি ইংরেজি বই দিতে চান, তবে এমন বই দিন যার বাংলা অনুবাদও পাশে আছে অথবা সহজ বাক্যভিত্তিক। WCB (World Of Children Books) এ একই বইয়ের বাংলা এবং ইংরেজি ভার্সনের রয়েছে।

৮) বইয়ের মাধ্যমে মানসিক বিকাশ ও মূল্যবোধ শেখানো
কিছু বই শিশুকে সৎ, সাহসী, সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। যেমন- টুনটুনির গল্প, জলপরি ও কাঠুরে, ঠাকুরমার ঝুলি, সৎ ছেলের গল্প, আলাদিন ইত্যাদি। এসব গল্প শুধু বিনোদন নয়, বরং নৈতিক শিক্ষারও মাধ্যম।
শিশুর হাতে সঠিক বই তুলে দেওয়া মানে শুধু জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং তার চিন্তার জগতকে প্রসারিত করা, কল্পনার দুয়ার খুলে দেওয়া এবং একজন মানবিক, অনুভূতিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সূচনা করা। তাই বই নির্বাচনে হোক সচেতনতা, আর বই পড়ার যাত্রায় হোক আপনার সক্রিয় উপস্থিতি।
শুধু অভিযোগ নয়—"শিশু বই পড়ে না", এই হতাশা নয়—বরং বই যেন শিশুর মনোযোগ কেড়ে নেয়, কল্পনাকে নাড়িয়ে দেয়, সে যেন নিজেই বইয়ের ভেতর ডুবে যেতে চায়—সেই আগ্রহ জাগিয়ে তোলাই হোক অভিভাবকদের মূল লক্ষ্য, পৃথিবী বইয়ের হোক। শুধু অভিযোগ নয়—"শিশু বই পড়ে না", এই হতাশা নয়—বরং বই যেন শিশুর মনোযোগ কেড়ে নেয়, কল্পনাকে নাড়িয়ে দেয়, সে যেন নিজেই বইয়ের ভেতর ডুবে যেতে চায়—সেই আগ্রহ জাগিয়ে তোলাই হোক অভিভাবকদের মূল লক্ষ্য, পৃথিবী বইয়ের হোক।