× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারীর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন

পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ

আরফাতুন নাবিলা

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৫ ১৩:৩৮ পিএম

পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ

মেয়েরা বুঝতে পারে কখন তাদের শরীর নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৪০ পার হওয়ার পর এই পরিবর্তনে আসে বিরাট এক ধাক্কা। যে ধাক্কা অনেক নারী মেনে নিতে পারেন না, আর সে থেকেই তাকে ক্রমাগত নানা অপরাধভোগে ভুগতে দেখা যায়। আবার কেউ কেউ আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন বলে ধাক্কাটা কম সহ্য করতে হয়। এই পরিবর্তনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যে নারীর জীবন বদলে যাচ্ছে তারই সবচেয়ে বড় দুটি পর্যায় এগুলো। 

মেনোপজ নির্দিষ্ট বয়সে এসে হলেও এটা হুট করেই শুরু হয় না। বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত কিছু পরিবর্তন নারীকে এর জন্য প্রস্তুত করে তোলে। মেন্সট্রুয়াল পিরিয়ড যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন থেকেই মূলত মেনোপজের শুরু। এই সাইকেলটা বুঝতে হলে জানতে হবে শরীর আগে পেরিমেনোপজের মধ্য দিয়ে যায়, এরপর মেনোপজ। 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এই পেরিমেনোপজাল স্টেজ নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না। নারীরা এ নিয়ে তেমন প্রস্তুতিও নিতে পারেন না। এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে সবার মাঝে এখনও দ্বিধা কাজ করে, সরাসরি কেউ খুলে বলতে চান না, কালচারাল ব্যারিয়ার তো আছেই। এটা যে একই সঙ্গে হরমোনাল ও ইমোশনাল একটা শিফট–নারীদের প্রতিদিনের চলাচলে বেশ বড় ভূমিকা রাখছে এটা সম্পর্কে অবগত নন অনেকেই। 

পেরিমেনোপজে শারীরিক পরিবর্তন 

‘আমার ভীষণ রাগ হতো সবার ওপর। অথচ সবাই আমাকে খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ বলেই জানে। মনে হতো এখনই কাউকে মেরে বসব। আর ভীষণ মন খারাপ থাকত। জীবনে সবকিছুই ঠিকঠাকভাবে চলছে, কিন্তু কী যেন নেই এমন মনে হতো। প্রচণ্ড অবসাদের সঙ্গে হতাশা, মন খারাপ মিলিয়ে কেমন যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতো। এরই মাঝে পিরিয়ডের তারিখ বদলে যেত। ১৫-২০ দিনের কমবেশি হয়ে যেত। আর এ সময় প্রচণ্ড পেটে ব্যথা হতো। ব্যথায় বিছানা থেকে উঠতে পারতাম না। সঙ্গে ব্লিডিংয়ের পরিমাণও বেশি ছিল। আমার ব্যক্তিগত জীবনে এই ব্যাপারগুলো বেশ আঘাত করেছে। ধীরে ধীরে ব্যাপারটার সঙ্গে আমি নিজেকে মেলাতে শুরু করেছি।’ 

কথাগুলো বলছিলেন চাকরিজীবী সামিয়া জাহান। ৪০ বছর পার করে পেরিমেনোপজ পর্যায়ে চলে এসেছেন তিনি। বর্তমানে শারীরিক নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হচ্ছে। 

ব্র্যাক হেলথকেয়ারের গাইনোকোলজিস্ট ডা. হাসিনা কবির হাসনা বলেন, ‘পেরিমেনোপজ হলো মেনোপজের আগের কয়েক বছর যখন মাসিকচক্র অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং হরমোনের তারতম্য শুরু হয়। মেনোপজ নিশ্চিত হওয়ার আগের ১২ মাসও এর অন্তর্ভুক্ত যখন মাসিক বন্ধ থাকে। সাধারণত এর গড় বয়স ৪৭ বছর। প্রধান কারণ হলো হরমোনজনিত পরিবর্তন। ডিম্বাশয় থেকে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের নিঃসরণ কমে যাওয়ার ফলে পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ ঘটে।’ 

পেরিমেনোপজের এ সময়ে অনিয়ন্ত্রিত হরমোনের কারণে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, হাড় এমনকি হজমেও সমস্যা হওয়া শুরু করে। বেশিরভাগ নারী এই অভিজ্ঞতাকে সহজভাবে নিতে পারেন না। বায়োলজিক্যাল এই পরিবর্তন একেক নারীকে একেকভাবে বদলে দেয়। অথচ এই পরিস্থিতিগুলো সবাইকে বোঝানোও যায় না। 

মেনোপজের বাস্তবতা 

‘আমি শুরুতে বুঝতে পারিনি যে ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেসের কারণে দাম্পত্য জীবনে সমস্যা হচ্ছে। ভেবেছিলাম এটা খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু পরে চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করে জানলাম আমার মেনোপজ শুরু হয়ে গেছে এবং এর কারণে শারীরিক আরও সমস্যা ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে। আমার মাসল আর ব্রেস্ট পেইন হচ্ছিল।’ 

‘আমি ভুগছি ইউরিন ইনফেকশনে। বারবার প্রস্রাবের বেগ আসে, মাঝেমধ্যে ইউরিন ফোঁটা ফোঁটা পড়তে থাকে। খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যাই বাইরে কোথাও গেলে।’ 

দুজন পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী জানাচ্ছিলেন মেনোপজ শুরু হওয়ার পরের পরিস্থিতি সম্পর্কে। তারা জানতেন না এই অবস্থা থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর এবং নিজেদের বয়স বাড়ছে বিষয়টি মানসিকভাবে মেনে নেওয়ার পর এখন তারা অনেকটাই সুস্থ আছেন। 

ডা. হাসিনা কবির হাসনা জানান, মেনোপজ কখন হবে, তা সাধারণত কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন- জেনেটিক প্রভাব (মা ও মেয়ের একই সময়ে মেনোপজ হয়), জীবনধারা, অস্ত্রোপচার (হিস্টেরেকটমি-ডিম্বাশয়ের অপারেশন), কেমোথেরাপি ইত্যাদি। 

মেনোপজের লক্ষণ ও ঝুঁকি

মেনোপজ যে শুরু হচ্ছে তা বোঝার জন্য বেশ কয়েকটি লক্ষণ আগে থেকেই প্রকাশ পাওয়া শুরু করে বলে জানালেন ডা. হাসিনা। লক্ষণগুলো হচ্ছেÑ অনিয়মিত মাসিক, ভেসোমোটর সিম্পটন-হট ফ্ল্যাশ (হঠাৎ শরীরের ওপরের অংশে অত্যধিক গরম লাগা ও অতিরিক্ত ঘাম হওয়া- বিশেষ করে রাতে), ভ্যাজাইনা শুষ্ক হয়ে যাওয়া ও যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া, মুড সুইং, বিষণ্নতা, অনিদ্রা, মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি কমতে থাকা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, ওজন বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ইত্যাদি।

মেনোপজের পর কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। যেমনÑ অস্টিওপোরোসিস (হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া), হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, মূত্রনালির সংক্রমণ, স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত ক্যানসার, মেমোরি লস ও অ্যালঝেইমার রোগ, ব্লাড প্রেশার ও কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া।

সহনীয় পর্যায় 

মেনোপজ চিকিৎসাযোগ্য নয়। তবে উপসর্গ কমানোর জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। যেমনÑ 

জীবনধারার পরিবর্তন- একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসা সম্ভব হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমানো যায়। 

নারীর মানসিক অবস্থা বুঝে সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে পাশে থাকা, দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করা, বেশি বেশি সময় দিয়ে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, সঠিক খাদ্য, চিকিৎসা ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা, সঙ্গীর সঙ্গে বোঝাপড়া, যৌন সমস্যা ও মুড সুইংয়ের বিষয়ে সঙ্গীর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা ইত্যাদি।


চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন কখন

ডা. হাসিনা জানান, পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ কোনো রোগ নয়। তবে কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো দেখা গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। যেমনÑ মাসিকের অনিয়ম দীর্ঘমেয়াদি হলে, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে, অত্যধিক হট ফ্ল্যাশ, ঘাম বা ঘুমের সমস্যা হলে, যৌনাঙ্গে শুষ্কতা বা ব্যথা হলে, মুড ডিজঅর্ডার বা বিষণ্নতা হলে, হাড়ের ব্যথা বা ঘন ঘন হাড় ভাঙার সমস্যা হলে, হৃদযন্ত্রের সমস্যা বা উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিলে। 

পেরিমেনোপজ ও মেনোপজ নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক পর্যায়। এ সময়টা কিছুটা কঠিন হলেও সচেতনতা, চিকিৎসা, জীবনধারার পরিবর্তন ও পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে সুস্থ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করা যায়। সমাজের উচিত নারীর এই পরিবর্তনকে সম্মান করা, সহানুভূতির সঙ্গে পাশে থাকা এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ একজন নারীর সুখী ও সুস্থ জীবন মানেই একটি পরিবার ও সমাজের সুস্থতা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা