লাবিবা ইরম
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৫ ১৩:২৬ পিএম
শিশুর জন্মগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন একজন মা। শিশুর যত্ন আর দেখভাল করতে গিয়ে বেশিরভাগ মা দম ফেলার সময় পান না। কখনও আনন্দে, কখনোবা দুঃখ ভাগাভাগি করে মায়ের পুরো জীবনটা কেটে যেতে থাকে সন্তানদের সঙ্গে। শিশুকে হাঁটতে শেখানো থেকে হাতেখড়ি কিংবা স্কুলে পৌঁছে দেওয়া থেকে টিফিন গোছানো- মায়েদের কাজ যেন ফুরোতেই চায় না। এই জীবনজুড়ে থাকা সন্তানরা মায়ের ছায়ায় এভাবেই বড় হয়ে ওঠে। একসময় নিজে চলতে শিখে। জীবনের কঠিন পাকে পড়ে সন্তানদের কখনও চলে যেতে হয় বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও, কখনোবা দেশ ছেড়ে বিদেশেই পাড়ি জমাতে হয়। চাকরি, লেখাপড়া, বিয়ে ইত্যাদি নানা কারণেই মায়ের থেকে আলাদা থাকতে হয় সন্তানদের। আবার দেখা যায় একসঙ্গে থাকলেও কাজের চাপে মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আর এসব কিছুর মাঝে ব্যস্ততা সব কমে গিয়ে একা হয়ে যান মা।
বর্তমানে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও অনেক সচেতন হচ্ছি। নিজেদের পাশাপাশি আমাদের পরম মমতায় আগলে রাখা পরিবারের সবার বিশেষত মায়ের একাকিত্ব নিয়েও একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন। কিছু যত্ন আর খেয়ালে মায়েদের এই একাকিত্ব কমানো সম্ভব।
নিয়মিত কল দিন
মায়ের থেকে দূরে থাকলে অবশ্যই প্রতিদিন নিয়মিত ফোনে কল দিন। দিনে দু-তিনবার না পারলেও অন্তত একবার অবশ্যই দিন। মাঝেমধ্যে ভিডিওকল দিন, কথা বলুন। আর যদি মায়ের সঙ্গেই থাকেন তবু কর্মব্যস্ততার কারণে সারা দিনই কেটে যায় তাহলে অফিস, ক্লাস বা কাজের ফাঁকে অন্তত একবার মাকে কল দিন।

মায়ের সঙ্গে কাজ করুন
মা কাজ করতে থাকলে মায়ের সঙ্গে থাকুন। রান্না বা টুকটাক কাজে সাহায্য করুন, কথা বলুন, আগ্রহ দেখান যেন মায়ের মনে না হয়, যেসব কাজ তিনি একাই করছেন।
মায়ের শখকে ফিরিয়ে আনুন
সন্তান ও সংসার সামলাতে গিয়ে আমাদের মায়েরা হারিয়ে ফেলেন নিজেদের শখ। কেউ বই পড়তেন, কেউ সেলাই করতেন, কেউ বাগান করতেন, কেউবা গাইতেন গান। কিন্তু সেগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে কাজের চাপে। মায়ের এসব শখ ফিরিয়ে আনুন। মাকে মনে করিয়ে দিন তার শখ, তাকে উৎসাহ দিন এই কাজগুলো আবার শুরু করতে। এতে তার মন যেমন ভালো থাকবে, তেমনই একাকিত্বও দূর হবে।
ডিজিটাল ডিভাইস চালানো শেখান
মায়েরা আমাদের মতো ডিজিটাল ডিভাইসে অভ্যস্ত নন। তাই চাইলেই আমাদের মতো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেদের মনের মতো জিনিস বের করে দেখতে, শুনতে বা শিখতে পারেন না। মায়েদের তাই একটু ধৈর্য ধরে শিখিয়ে দিন ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার, ভয়েস সার্চ বা ব্রাউজিং কীভাবে করে, কীভাবে টাইপিং করতে হয় কিংবা ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করতে হয়। তাদের একাকী সময়ে নিজেই যেন ইউটিউব থেকে পছন্দের রেসিপি দেখতে পারেন অথবা ইন্টারনেট ব্রাউজিং করতে পারেন। নিজেদের পছন্দের জিনিস নিয়ে জানতে ও দেখতে পারলে একাকী থাকা সময়টা অনেকটাই উপভোগ করবেন মায়েরা।
মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন
মায়েরা জীবনের টানাপড়েনে অনেক সময়ই চুপচাপ হয়ে যান। একটু সময় পর হয়তো নিজের মনের কথা বলাই বন্ধ করে দেন। সন্তান হয়ে অবশ্যই এটি আমাদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। তাই মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, তার অনুভূতিগুলোর মূল্য দিন, পুরো কথা শুনুন আন্তরিকতার সঙ্গে, তার সঙ্গে কথা বলুন, তিনি কী চান, কী করতে ভালো লাগে অথবা আগে কী করতেন, কী খেতে ভালোবাসতেন, কীভাবে দিন কেটেছে ছোটকালে। মায়ের যেন কখনোই এমন মনে না হয় যে, তার কথা শোনার কেউ নেই। মায়ের কথা বলার সঙ্গী হয়ে উঠুন।
মাকে নিয়ে ঘুরে আসুন
ঘুরে আসা বলতেই লং ট্যুর মাথায় আসে আমাদের। কিন্তু বয়স হয়ে গেলে মায়েদের শরীরও দুর্বল হয়ে যেতে থাকে। তখন তো আর লং ট্যুর সম্ভব নয়। ঘোরা মানে শুধুই লম্বা সময়ের ভ্রমণ নয়, বরং বাসার আশপাশে যেকোনো জায়গা থেকে মাকে নিয়ে এক বিকালে বেরিয়ে পড়তেই পারেন। আবার মাকে নিয়ে সিনেমা দেখে আসতে পারেন, খেতে যেতে পারেন কফি বা আইসক্রিম। এতে মায়ের একাকিত্ব দূর হবে, তার সঙ্গে সঙ্গে মা ও সন্তানের সম্পর্ক হবে আরও জোরদার।
মায়ের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিন
মায়েরা হয়তো জীবনের চাপে আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলেছেন ছোটবেলার বন্ধুদের। যাদের সঙ্গে খেলেছেন, একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগে কিছুই অসম্ভব নয়। তাই খুঁজে বের করুন আপনার মায়ের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিন। তাদের সঙ্গে আড্ডা, গল্পে থাকলে মায়ের মনও থাকবে উৎফুল্ল।