মরিয়ম আশ্রম
আকাশ শীল
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ১৫:২৪ পিএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৫ ১৫:২৬ পিএম
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীর ঘেঁষে কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠানে অবস্থিত পাহাড়বেষ্টিত সবুজ অরণ্যের মাঝে দেয়াঙ মরিয়ম আশ্রম। শান্ত স্নিগ্ধ ও মনোমুগ্ধকর এই পরিবেশটি যেন অজান্তেই মনের মধ্যে একটুখানি প্রশান্তির ছোঁয়া দেয়। সবুজের সমারোহ, চারদিকে পাহাড় ঘেরা সবুজ মাঠ। সুনসান পরিবেশ, হরেকরকম ফুল ও পাতাবাহার, গাছে পাখিদের কলকাকলি। আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ও পাহাড় ঘিরে আছে প্রার্থনা পূর্ণ এই মরিয়ম আশ্রম।
মাঠের একপাশে পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ির ধাপ। সিঁড়ি বেয়ে উঠলে দেখা যায় কাঁচে ঘেরা মরিয়মের প্রতিকৃতি। আশপাশে বেশকিছু দৃষ্টিনন্দন আশ্রম ও ধ্যানঘর। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়নের দেয়াঙ পাহাড়ের নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত এই আশ্রমের নাম মরিয়ম আশ্রম। পর্তুগিজ বণিকদের হাতে পত্তন হওয়া প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো খ্রিস্টান পল্লীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই আশ্রম।
চট্টগ্রাম শহর থেকে দেয়াঙ পাহাড়ে যেতে পার হতে হবে শাহ আমানত সেতু। সেখান থেকে কোরীয় রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (কেইপিজেড) গেটে গিয়ে নামতে হবে। গেট থেকে কেইপিজেড সড়ক ধরে এক কিলোমিটার গেলেই দেয়াঙ পাহাড়ের মরিয়ম আশ্রম।
আশ্রমের প্রতিষ্ঠাকাল
আশ্রমের প্রবেশপথে মূল ফটকের পাশে ক্রুশসম্বলিত একটি পাথরের ফলকে বড় করে লেখা আছে, ‘দিয়াং খ্রিস্টবাণী প্রচারের গোড়াপত্তন।’ সেখান থেকেই জানা গেল, ১৫১৮ সালে চট্টগ্রামে আসেন পর্তুগিজ বণিকরা। ১৫৩৭ সালের দিকে তারা দেয়াঙ পাহাড় এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। দক্ষিণ ভারতের কোচিন ডাইয়োসিস অঞ্চল থেকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ১৫৯৮ সাল থেকে চট্টগ্রামে মিশনারি ও যাজকরা আসতে থাকেন। তাদের মধ্যে প্রথম আসেন জেজুইট ধর্মসংঘের পুরোহিত ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ। ১৫৯৯ সালে দেয়াঙয়ে চট্টগ্রামের প্রথম গির্জা নির্মাণ করেন তিনি। ১৬০০ সালে তিনি চট্টগ্রাম শহরের বান্ডেল রোড ও জামালখান এলাকায় আরও দুইটি গির্জা নির্মাণ করেন।
মরিয়ম আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্তের স্মৃতিস্তম্ভও দেখা গেল পাহাড়ের ওপর। আশ্রম ঘুরে দেখার সময় একটি প্রার্থনা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন আশ্রমের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রচার ও প্রকাশনা কমিটির সমন্বয়কারী ব্রাদার সিলভেস্টার মৃধা। তিনি বলেন, দেয়াঙয়ের পাঁচশ বছরের ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হচ্ছে গোড়াপত্তনের, আরেকটি শেষের দিকের একশ বছরের ইতিহাস। মরিয়ম আশ্রমের পাশে যোশেপ পাড়া ও মরিয়ম পাড়ায় হাজারখানেক মানুষ বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। ১৬২৯ থেকে ১৬৩১ সাল পর্যন্ত পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত আগস্টিনিয়ান যাজকরা দেয়াঙয়ে ছিলেন। এখনও ওই পর্তুগিজ বংশের ১২টি পরিবার এবং ডি রোজা বংশের ১১টি পরিবার দেয়াঙ পাহাড়ে আছেন।
ব্রাদার সিলভেস্টার মৃধা আরও বলেন, ১৯৩২ সালের ১৭ অক্টোবর কানাডা থেকে চট্টগ্রামে আসেন ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্ত। তিনি দেয়াঙে এসে এখানকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি নানা সেবামূলক কাজের উদ্যোগ নেন। তিনিই এই আশ্রম গড়ে তোলেন। আজকের মরিয়ম আশ্রম মা মারিয়ার পুণ্য তীর্থস্থান হিসেবে খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের কাছে সমাদৃত। আগের ইতিহাস ভালো না হলেও বর্তমানে দেয়াঙ এলাকা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে।
আশ্রমের চারপাশ
১৯৪৬ সালে ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্ত গড়ে তোলেন মরিয়ম আশ্রম উচ্চ বিদ্যালয়। এখানে এখন দেড় হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আশ্রমের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ধ্যান ও প্রার্থনার জায়গা, গির্জা, চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র, ছাত্রাবাস। এ ছাড়া তিনতলা বিশিষ্ট ধ্যান কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে নির্জনে বসে ধ্যানসাধনা করা যাবে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আয়োজন হয় দুই দিনব্যাপী মা মরিয়মের তীর্থ উৎসব। তীর্থ দর্শনে আসেন সারা দেশের মানুষ।
তীর্থস্থান
১৯৭৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর দেয়াঙ পাহাড়কে তীর্থস্থান হিসেবে ঘোষণা করেন তৎকালীন বিশপ যোয়াকিম রোজারিও। ২০২৪ সালে মা মারিয়ার উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত প্রকাশনা গ্রন্থ থেকে জানা গেছে, এই এলাকার খ্রিস্টানদের ওপর আরাকানি সৈন্যদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন যোয়াকিম রোজারিও। ওই বছরই আরাকান রাজার নির্দেশে দেয়াঙয়ে অবস্থানরত ৬০০ পর্তুগিজ শিশু, নারী ও পুরুষকে হত্যা করা হয়। তার সমাধির ওপরই বর্তমানে চট্টগ্রামের ক্যাথিড্রাল গির্জা দাঁড়িয়ে আছে।
মরিয়ম আশ্রম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক দেবাশীষ দত্ত বলেন, আশ্রমে প্রতিদিন শত শত লোক আসেন। তারা শুধু বেড়াতেই আসেন না, পাঠ নেন ইতিহাসেরও। ১৯৮১ সালের ১৯ জুন আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্তের মৃত্যুর পর ২০০০ সাল থেকে আশ্রমে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ব্রাদার লরেঞ্চ ডায়েস। ৯৫ বছর বয়সি ডায়েসকে আশ্রমের চতুর্থ আশ্রমগুরু হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।