কালিদাস রায়
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৫ ১৩:১৮ পিএম
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৫ ১৩:২২ পিএম
‘আগে নেশা করায় পথেঘাটে মানুষের হাতে মার খেয়েছি। মানুষ মেরে আমার কপাল, মাথা, হাত-পা ফাটিয়ে দিয়েছে। পরে নাটোর রিহ্যাব সেন্টারে আসার পর রনি ও সাগর ভাই আমাকে সাহায্য করেছে। পরিচালক শাওন ভাই আমাকে নিজের ছেলের মতোই দেখেন। জীবনে বাঁচতে হলে ভালোভাবে বাঁচতে হবে। ভালোর দাম আছে, খারাপের কোনো দাম নাই।’ কথাগুলো বলছিলেন নাটোর শহরের মেথরপট্টির বাপ-মা হারা ছেলে সজল। সজল আরও বলেন, এখানে এসে নেশা ছাড়তে পেরেছি। নিজেকে অনেক পরিবর্তন করতে পেরেছি।
নাহিদ সারওয়ার নামে আরেক তরুণ যুবক বলেন, নাটোর রিহ্যাব সেন্টার হচ্ছে আমার জীবনে সুস্থতার একটা ভিত্তি। দীর্ঘদিনের মাদকাসক্ত জীবনে আমার পুরোটাই অগোছালো ছিল। এখানে তিন মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর আমি এখন সুস্থ। এখন জীবন নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ভালো কিছু করার ইচ্ছা আছে।
-6864de035ed9a.jpg)
এভাবেই নীরবে, নিভৃতে শত শত মাদকাসক্ত তরুণ, যুবকদের নিরাময় ও পুনর্বাসনের কাজ করে যাচ্ছে নাটোর রিহ্যাব সেন্টার। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা সেবাধর্মী এই নিরাময় কেন্দ্রে এসে চিকিৎসা ও সেবা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন অনেকেই। নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন অনেকেই। অনেকেই খুঁজে পেয়েছেন বাঁচার মানে।
নাটোর শহরের নাটোর-ঢাকা মহাসড়কের বড়হরিশপুর এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির পশ্চিম পাশে অবস্থিত নাটোর রিহ্যাব সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। রিহ্যাব সেন্টারটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে একটি মর্মস্পর্শী গল্প। নাটোর রিহ্যাব সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সুলতান আহমেদের ছেলে মো. আল আমিন শাওন একটা সময় মাদকাসক্ত ছিলেন। তিনি বাধ্য হয়ে ছেলেকে জেলার বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করিয়ে পুরোপুরি সুস্থ করেন। এ সময় তিনি জেলার মধ্যে হাজারও মাদকাসক্ত তরুণরা যাতে নাটোরেই চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে সেই উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যকে সামনে রেখে ব্যক্তি উদ্যোগে সেবাধর্মী নাটোর রিহ্যাব সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে আর থেমে থামেনি প্রতিষ্ঠানটির পথচলা। বিগত ৭ বছরে শত শত মাদকাসক্ত যুবকদের নিরাময় ও পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠান।
নাটোর রিহ্যাব সেন্টার সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানটির শুরুতে ৮-১০ জন মাদকাসক্ত যুবককে নিরাময়ের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে অদ্যাবধি ৭৮০ জনকে এই নিরাময় কেন্দ্রের আওতায় নিয়ে আসা হয়। এরমধ্যে প্রায় ৫৫০ জন আরোগ্য লাভ করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। এ ছাড়া এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত এখানে ২২ জন মাদকাসক্ত তরুণ, যুবক নিরাময় এবং পুনর্বাসনের আশায় অবস্থান করছেন। ফলোআপে রয়েছে ১৩-১৫ জন তরুণ।
এ ছাড়া রিহ্যাব সেন্টারের পরিচালক মো. আল আমিন শাওন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হওয়ায় নিজের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিরাময় হওয়া তরুণ যুবকদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ করে দেন। আর এভাবেই এক সময়ের প্রবল মাদকাসক্ত তরুণ, যুবকদের নিরাময় ও পুনর্বাসনের কাজ করে যাচ্ছে নাটোর রিহ্যাব সেন্টার।
-6864de1547c87.jpg)
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মাদকাসক্তদের নানা ধরনের কাউন্সিলিং, মেডিটেশন, অকুপেশনাল ওয়ার্ক, থেরাপি, নিজেদের কাজ নিজে করা, নামাজ বা প্রার্থনা, বিনোদনসহ রুটিন মাফিক কাজ করানো হয়। বর্তমানে এই নিরাময় কেন্দ্রে ৮ জন স্টাফ, ২ জন চিকিৎসক চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে একজন মিডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং একজন খণ্ডকালীন সাইকিয়াট্রিস্ট চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া রোগীদের বিনোদন, সুস্থতাজনিত আনন্দ উৎসব করা হয় রিহ্যাব সেন্টারের পক্ষ থেকে।
নাটোর রিহ্যাব সেন্টারের দায়িত্বরত ইনচার্জ মো. আলিম সরকার রনি আনোয়ার হোসেন জানান, ভাড়াকৃত ১৬ কক্ষ বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় প্রতি মাসে খরচ হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। যার অধিকাংশ অর্থ আসে পরিচালক আল আমিন (শাওন) ভাইয়ের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। রোগীর পরিবার থেকে যৎসামান্য যা খরচ পাওয়া যায় তা দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়। নিরাময় কেন্দ্রে সুন্দরভাবে এবং আরও বড় পরিসরে সেবাধর্মী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, সুশীলসমাজসহ সবার সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নাটোরের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান জানান, নিয়মমাফিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় অধিদপ্তর থেকে এক ধরনের অনুদান প্রদান করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া বাৎসরিক অনুদানের পরিমাণও কম। সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও আমাদের মাধ্যম হয়ে আবেদন করলে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সেটি ফরোয়ার্ড করতে পারি।
জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন জানান, সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই ধরনের বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক অনুদান বা সহায়তার সুযোগ নেই। তবে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখা হবে।