সাইফুল হক মোল্লা দুলু
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৫ ১৫:৩৭ পিএম
প্রায় দুই শতাব্দীকাল নিরবচ্ছিন্ন ঈদের জমায়েতের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আজ গোটা জাতির কাছে রীতিমতো কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এর খ্যাতি এবং গল্প-গাঁথা ছড়িয়েছে গত শতাব্দীতেই। এ মাঠের বিশাল জমায়েতে লাখ লাখ মুসল্লির কাতারে শামিল হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করা যেন একজন ধার্মিক মুসলমানের ভাগ্য।
কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্বপার্শ্বে বিদ্যমান রেললাইন অতিক্রম করে অল্প দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই মাঠ। সবুজ গাছপালা আর ঘাসের কার্পেটে মোড়ানো এক গ্রামীণ আবহ ও আমেজ ছড়িয়ে আছে এর চারপাশে। বর্তমানে প্রায় বিলীয়মান নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ৭ একর জায়গায় মাঠটি ছড়িয়ে আছে। দূরদূরান্ত থেকে আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা শহর বা শহরতলির পাড়া-মহল্লা থেকে মধ্য রাত বা শেষ রাতে মাঠে পৌঁছে নামাজের স্থান করে নেন। দেশের বৃহত্তম ঈদের জমায়েত হিসেবে এ মাঠ এখনও সরকারিভাবে নির্বাচিত ও স্বীকৃত। এখানে কমবেশি ৫ লাখ মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
বলা বাহুল্য, বর্তমানে দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ ময়দানকে আয়তনের দিক থেকে বেশ বড় বললেও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঐতিহ্য এবং অতীত ইতিহাস তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখ করা যায়, শোলাকিয়া ঈদগাহর পেছনের ইতিহাস প্রায় ২০০ শত বছরের, আর গোর-এ-শহীদের যাত্রা শুরু হয় মাত্র ১০ বছর। ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ময়দান উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। শোলাকিয়া ঈদগাহের উদ্ভব কাহিনী কম ঐতিহাসিক নয়। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের সূচনার নেপথ্য কথা অনেকেরই জানা নেই। লাখো মানুষ মাঠের নাম জানলেও জানেন না কীভাবে গড়ে উঠেছে এই ঈদগাহ ময়দান। মূলত শতবর্ষাধিক বছর আগে এই মাঠে সোয়া লাখ লোকের জামাত হওয়ার কারণে মাঠ ও সংশ্লিষ্ট এলাকার নাম হয়েছে সোয়ালাখিয়া, যা বর্তমানে শোলাকিয়া নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে।
ঈদগাহ ময়দানটি কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ ময়দান। একসময় এ মাঠে নামাজ পড়তেন জমিদাররা। এরপর ধাপে ধাপে সব শ্রেণিপেশার ধর্মপ্রাণ মুসল্লি আসতে শুরু করেন। দেশের সর্ববৃহৎ এই জামাতে অংশগ্রহণ করতে সকাল থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে। এখন প্রতি বছর ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়তে আসা দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির ভিড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ময়দান। আগত মুসল্লিদের অনেকে মাঠে জায়গা না পেয়ে পার্শ্ববর্তী রাস্তা, বাড়ির ছাদ, নদীর পাড় ও শোলাকিয়া সেতুতে জায়গা করে নিয়ে জামাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন।
জানা যায়, ধর্ম প্রচারের জন্য এদেশে আসা সৈয়দ আহাম্মদ (রহ.) নামের এক বুজুর্গ ১৮২৮ সালে শোলাকিয়ায় ঈদগাহর প্রথম জনমুখর জামাতে ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ঈশা খাঁর বংশধর স্থানীয় হয়বতনগর দেওয়ান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেওয়ানবাড়িতে থাকতেন। তখন থেকেই এ মাঠের প্রচলন ও প্রসার ঘটে। দেওয়ান মান্নান দাদ ছিলেন হয়বত খানের বংশধর। হয়বত খান ছিলেন বীর ঈশা খাঁর ষষ্ঠ অধস্তন পুরুষ। যে কারণে শুরু থেকে এ মাঠের সঙ্গে জমিদারির একটি ঐতিহ্য রয়েছে। ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খান কিশোরগঞ্জে জমিদারি প্রতিষ্ঠার পরপরই এই ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন।
এ মাঠের জন্য ১৯৫০ সালে দেওয়ান মান্নান দাদ খান সাড়ে তিন একর জমি ওয়াকফ করে দেন। পরবর্তী সময়ে জমির পরিধি আরও বৃদ্ধি পায়। দিন দিন এই মাঠে মুসল্লিদের সমাগম বাড়তে থাকে এবং মাঠের জায়গা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই হয়বতনগরের জমিদার উক্ত মাঠসংলগ্ন তার নিজস্ব সম্পত্তি ঈদগাহ মাঠের জন্য ওয়াকফ করেন। ব্যক্তিগত দান, প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠনিক ও সরকারি সহযোগিতায় এই ঈদগাহ মাঠের বিশালতা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের সুনাম ও সুখ্যাতি। ঐতিহ্যবাহী এই মাঠে অনেক খ্যাতিসম্পন্ন আলেমরা ইমামতি করেছেন নানা সময়ে। কালের স্রোতে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানটি পরিণত হয়ে উঠেছে একটি ঐতিহাসিক স্থানে। এ ময়দানের বিশাল জামাত গৌরবান্বিত ও ঐতিহ্যবাহী করেছে কিশোরগঞ্জকে। নামাজ শুরুর আগে শটগানের ফাঁকা গুলির শব্দে সবাইকে নামাজের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সংকেত দেওয়া হয়। বর্তমানে শোলাকিয়া ময়দানে ঈদ জামাতে ইমামতির দায়িত্বে আছেন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ।
স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ জানান, ঈদের দিন জমিদারি ঐতিহ্যে ঘোড়ার গাড়িতে স্টেজ বানিয়ে তার ওপর সিংহাসন বসিয়ে বাহিনী নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহে আসতেন জমিদাররা। আসার পথে প্রজাদের উদ্দেশে বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা ছিটাতেন। এ ছাড়া ইটনা হাওরের জমিদারসহ বিভিন্ন এলাকার জমিদাররা নানা ধরনের নৌকায় করে এ ঈদগাহে নামাজ পড়তে আসতেন। জমিদারদের এসব তুলকালাম কাণ্ড আর স্বয়ং জমিদারদের সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন বলে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য লোকজন শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে নামাজ আদায় করতে আসতেন। ঈদের আনন্দের পাশাপাশি আগত মুসল্লিদের জন্য এটা ছিল বাড়তি আকর্ষণ। এভাবেই এ মাঠের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে।
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের নীলগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মো. মেহবুব আলম মনি জানান, বোঝার বয়স থেকেই বাবার হাত ধরে এই ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে নামাজ আদায় করে আসছি। কখনও প্রচণ্ড রোদে পুড়ে, কখনোবা বৃষ্টিতে ভিজে নামাজ আদায় করতে হয়েছে। লক্ষ মানুষের একসঙ্গে নামাজ আদায়ের অনুভূতি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। একটা অন্যরকম তৃপ্তি অনুভূত হয়। শুধু বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকেই নয়, ওই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। রোজার মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাবলিগ জামাতের লোক আল্লাহর রাস্তায় বের হন। অনেক দেশের মানুষ বাংলাদেশে আসে এই ঈদগাহ মাঠে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। অনেকে মনে করেন, এ মাঠে লক্ষ মানুষের সঙ্গে নামাজ আদায় করলে হজের আমেজ পাওয়া যায়। লাখ লাখ টাকা নামাজ শেষে দান হিসেবে ওঠে। মাঠের ভেতরের বা বাইরের পরিবেশ বেশ আনন্দমুখর থাকে।
তিনি আরও জানান, ঈদগাহ যাওয়ার রাস্তায় অনেক লোক টেবিলের ওপর পানি নিয়ে বসে যেন তৃষ্ণার্ত মুসল্লিরা পানি পান করতে পারেন। নামাজ শেষে ছোট পরিসরে মেলা বসে, যেখানে কাঠের তৈরি গৃহস্থালি পণ্য পাওয়া যায়।
জনশ্রুতি রয়েছে, ১৮২৮ সালে এই মাঠে ঈদের জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়া লাখিয়া’। যা এখন শোলাকিয়া নামেই পরিচিত। তবে শোলাকিয়া মাঠের ঐতিহ্য ও সুনাম অনুযায়ী এ মাঠের উন্নয়ন হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয় লোকজন। তাদের দাবি, ঐতিহাসিক এই ঈদ জামাতকে যেন দেওয়া হয় ইউনেস্কো স্বীকৃতি।