সাদিয়া সিদ্দিকা
প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৫ ১৩:১৮ পিএম
ঈদ মানেই নতুন পোশাক, সাজসজ্জা, রঙের উৎসব। আর ঈদুল আজহা তো বিশেষ এক উপলক্ষ, যেখানে কোরবানির ধর্মীয় তাৎপর্যের সঙ্গে যুক্ত হয় আত্মপ্রকাশের এক নান্দনিক সুযোগ। এবারের ঈদ পড়েছে জুনের শুরুতে। অর্থাৎ গরম ও বৃষ্টির মধ্যবর্তী এক সময়। তাই এবারের ঈদের পোশাক বেছে নিতে হবে নানান বিষয় মাথায় রেখে। যেমন- আবহাওয়া, আরাম, ট্রেন্ড ও পরিবেশবান্ধবতা।
পোশাক বাছাইয়ে গরম-বৃষ্টির ভাবনা
বাংলাদেশের জলবায়ু অনুযায়ী জুন মাসে প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাই ঈদের পোশাক হতে হবে হালকা, আরামদায়ক এবং দ্রুত শুকিয়ে যায়Ñ এমন কাপড়ে তৈরি। সুতি, ভিসকস, মসলিন, লিনেন কিংবা রেয়নের মতো ব্রিদেবল ফেব্রিক এ সময়ের জন্য আদর্শ। ঘাম শোষণ করে এমন ফেব্রিক শরীর ঠান্ডা রাখে এবং অস্বস্তি কমায়।
ফ্যাশনে চলতি ধারা
নারীদের ফ্যাশনে এবারের ঈদে জনপ্রিয় হচ্ছে মিনিমালিস্টিক ডিজাইন, মাটির টোনের শেড, হালকা কাজের কুর্তি, আর আরামদায়ক পালাজ্জো বা স্ট্রেইট প্যান্ট। সাদামাটা লুকের মধ্যেও অভিজাতভাবÑ এটাই এখনকার ট্রেন্ড। এ ছাড়া প্যাস্টেল কালারের সালওয়ার-কামিজ, কাটওয়ার্ক অথবা স্কার্ফ অ্যাডেড কামিজও বেশ চলছে। তরুণীদের পছন্দের তালিকায় থাকছে শার্ট স্টাইল কামিজ ও ফ্রন্ট স্লিট কুর্তি। পুরুষদের ক্ষেত্রে পাঞ্জাবির রঙে এসেছে নীলচে-সবুজ, অফ-হোয়াইট, মাটি রঙ ও খয়েরি শেড। হাতে কাজ করা কিংবা হালকা এমব্রয়ডারির পাঞ্জাবি এখনও পছন্দের তালিকায় রয়েছে। আর যারা একটু ভিন্ন কিছু চান, তারা বেছে নিচ্ছেন কোট কাট পাঞ্জাবি বা অসিমেট্রিক ডিজাইনের পাঞ্জাবি। হালকা ফেব্রিকের চুড়িদার বা পাজামার সঙ্গে ম্যাচ করে পরা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ফ্যাশন জগতে টেকসই পোশাক ও পরিবেশবান্ধবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পোশাক বাছাইয়ে অনেকেই এখন প্রাধান্য দিচ্ছেন রিসাইকেলড ফেব্রিক ও দেশীয় হস্তশিল্পকে। ঈদ উপলক্ষে অনেক ডিজাইনারই তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব, কম ওয়াশিং প্রয়োজন এমন পোশাক। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এসব পোশাকের কদর বাড়ছে।
নারীদের পোশাক
নারীদের সাজের মূল ভাবনাই থাকে ‘আরাম ও আধুনিকতা’র মিশ্রণে। এবারের ঈদে সবচেয়ে বেশি চাহিদা দেখা যাচ্ছে হালকা রঙের, ন্যাচারাল ফেব্রিকের পোশাকে। সুতি, মসলিন, ভিসকস, খাদি বা রেয়নের মতো কাপড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে স্টাইলিশ অথচ আরামদায়ক পোশাক। সালোয়ার-কামিজ, চুড়িদার বা স্ট্রেইট কাট কামিজের সঙ্গে হালকা এমব্রয়ডারির ওড়না ও মেটালিক টোনের বোতাম-লেস ডিজাইন বেশ চলছে। এ ছাড়া তরুণীদের মাঝে কুর্তি ও পালাজ্জোর কম্বিনেশন বেশ জনপ্রিয়। মিনিমাল ডিজাইনের ওপরে হালকা প্রিন্ট ও সূচিকর্ম এখনকার ট্রেন্ড। ঈদে শাড়ি না হলে যেন উৎসবটাই অসম্পূর্ণ। এবারে সুতি-সিল্কের মিশ্র শাড়ি, ব্লক প্রিন্ট, জামদানি এবং রঙিন সুতার কাঁথার কাজ করা শাড়ির কদর বেশি। যারা হিজাব পরেন, তাদের জন্য হালকা ফেব্রিকের আবায়া, বেল স্লিভ গাউন ও স্টোন-ওয়ার্ক করা কেপ পোশাক বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে।
পুরুষদের ঈদ ফ্যাশনে ট্রেন্ড
পুরুষদের জন্য ঈদে মূল পোশাক পাঞ্জাবি হলেও ডিজাইন ও কাটে এসেছে নতুনত্ব। এবারে ট্রেন্ডে আছে ‘কাটওয়ার্ক’ পাঞ্জাবি, স্ট্যান্ড কলার, ওভারল্যাপ ফিনিশ ও সামান্য এমব্রয়ডারির কাজ। কাপড়ে সুতি, লিনেন, খাদি বেশি চলছে। যারা একটু ফিউশন পছন্দ করেন, তারা কোট-পাঞ্জাবির দিকে ঝুঁকছেন। সঙ্গে ম্যাচিং পাজামা বা সেমি-ফিটেড ট্রাউজার বেশ মানানসই। পাঞ্জাবির সঙ্গে হালকা সুতার কাঁথা কাজ করা ওয়েস্টকোট এখন ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠেছে।
 (1)-6835666d8fa2f.jpg)
শিশুদের পোশাকে আরাম
শিশুদের ঈদের পোশাকে অগ্রাধিকার পায় আরাম। ছেলেদের জন্য স্টাইলিশ কটন পাঞ্জাবি ও জিন্স, আর মেয়েদের জন্য নরম ফেব্রিকের ফ্রক, গাউন ও লেগিংসসহ ম্যাচিং হেয়ার অ্যাক্সেসরিজ বেশ চলছে। ঈদের দিনের খেলাধুলা, অতিথি আপ্যায়ন আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানোÑ সব মিলিয়ে শিশুরা থাকে দারুণ সক্রিয়। তাই তাদের পোশাক বাছাইয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় আরাম। শিশুদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল। গরমে ঘাম হলে বা অস্বস্তিকর কাপড় পরালে চুলকানি, লালচে দাগ কিংবা র্যাশ হতে পারে। তাই ঈদের পোশাক কেনার সময় অবশ্যই সুতির মতো সফট, শ্বাস নিতে পারে এমন ফেব্রিক বেছে নেওয়া উচিত। মেয়েশিশুদের জন্য হালকা গাউন, ফ্রক, কুর্তি-পায়জামা বা সারারা খুব জনপ্রিয়। রঙে যেন থাকে উজ্জ্বলতা, তবে কাপড় যেন ঘাম শুষে নেয়Ñ এটা নিশ্চিত করা জরুরি। ছেলেশিশুদের জন্য কটন বা লিনেন পাঞ্জাবি, কুর্তা বা টিশার্টের সঙ্গে ডেনিম/কটন ট্রাউজার মানানসই। অতিরিক্ত বোতাম বা আঁটসাঁট ডিজাইন না রাখাই ভালো। এ ছাড়া শিশুদের পোশাকে অতিরিক্ত ঝকমক কিংবা ভারী অ্যাক্সেসরি থাকা থেকে বিরত থাকা উচিত। ফিতা, সিকুইন বা স্টোন ওয়ার্ক থাকলে সেটি যেন পোশাকের ভেতরের দিকে খচখচ না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঈদে দেশীয় ব্র্যান্ড
ঈদ পোশাক নিয়ে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর কাজও বেশ নজরকাড়া। প্রতিবারের মতো এবারও লা রিভ নিয়ে এসেছে ঈদের দারুণ সংগ্রহ। নারীদের ঈদুল আজহার কালেকশনে থাকছে এথনিক, ক্যাজুয়াল ও ওয়েস্টার্ন ফিউশন পোশাকের ডিজাইন। রয়েছে লং কামিজ, সালোয়ার কামিজ, সিঙ্গেল কামিজ, গাউন, আবায়া, স্কার্ট সেট, শ্রাগ ও কেপ স্টাইল টপ এবং কটন ও হাফ সিল্ক শাড়ি। এ ছাড়াও এক্সক্লুসিভ পার্টি লাইন ‘নার্গিসাস’-এ রয়েছে মসলিনের গাউন, ভারী কারচুপি করা সালোয়ার কামিজ ও কাফতান। ঈদের সকালের আরামদায়ক আউটফিট হিসেবে থাকছে শর্ট ও মিড-লেংথ টিউনিক, শার্ট-টপস, টপ-বটম সেট ও আরামদায়ক বটমসের সমাহার।
পুরুষদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে মিনিমাল ও ভারী কাজের পাঞ্জাবি, শার্ট, পোলো, টি-শার্ট, এবং আরামদায়ক প্যান্ট-পাজামা। স্টাইল-পছন্দে এগিয়ে থাকা টিনদের জন্য থাকছে উৎসবের জন্য মানানসই ট্রেন্ডি পোশাকের একটি বিশাল কালেকশন। শিশুদের জন্য থাকছে সালোয়ার কামিজ, ফ্রক, টিউনিক, ঘাগরা-চোলি, পাঞ্জাবি, পোলো, টি-শার্ট আর বাচ্চাদের জন্য আরামদায়ক বটমস। মা-মেয়ে আর বাবা-ছেলের জন্য থাকছে মিনি-মি কালেকশন, যাতে পুরো পরিবারের সবার মিলেমিশে ঈদ করার আনন্দ পূর্ণতা পায়।
লা রিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মন্নুজান নার্গিস বলেন, ‘এই বছরের কালেকশনটি ডিজাইন করা হয়েছে আত্মসমর্পণের ইতিবাচক অনুভূতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। আমরা অনেকেই ঈদ মানেই শুধু উৎসব ভাবি, কিন্তু ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, দায়িত্ব আর ভালোবাসার মাধ্যমে আত্মাকে আরও সমৃদ্ধ করা। এই নিবেদন হতে পারে প্রকৃতির সরল সৌন্দর্যের কাছেও। যার ফলে আমাদের মাঝে সাম্য ও সামঞ্জস্যতার ভারসাম্য ঠিক থাকে। আত্মনিবেদনের এই গভীর অনুভূতিই আমরা প্রকাশ করেছি পোশাকের রঙ, ডিজাইন আর ফেব্রিকে। গরমের সময় এবং ঈদের ব্যস্ততায় যেন আরাম আর স্টাইল দুইই মেলে, সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে এবারের কালেকশন।’

দেশীয় বাজারে অঞ্জনস-এর নাম সুপরিচিত। এবারের ঈদে তারা কাজ করেছে পোশাকের নানা ধরন নিয়ে। রাজশাহী বলাকা সিল্ক, মসলিন, হাফসিল্ক, কটন সিল্ক, লিনেন কটন, টাঙ্গাইল কটন ও ভয়েল কাপড়ে শাড়িগুলোতে ব্লকপ্রিন্ট, স্ক্রিনপ্রিন্ট ও এমব্রয়ডারি করা হয়েছে। কটন, লিনেন কটন, জ্যাকার্ড কটন, রেয়ন কটন, সফট সিল্ক, ডুপিয়ানসহ বিভিন্ন কাপড়ে মেয়েদের সালোয়ার কামিজ, সিঙ্গেল কামিজ ও শট, লং, মিডিয়াম লেন্থের টপস করা হয়েছে। কামিজ ও টপসগুলোতে সমসাময়িক ট্রেন্ড ও প্যাটার্ন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। স্ক্রিন প্রিন্ট, এমব্রয়ডারি ও ডিজিটাল প্রিন্টের আনস্টিচ সালোয়ার কামিজ পাওয়া যাবে ঈদ আয়োজনে। সাদা, লাল, মেরুন, কালো, ব্লু, গ্রিনসহ বিভিন্ন রঙের পাঞ্জাবি থাকছে এবারের ঈদ কালেকশনে।
জনপ্রিয় আরও একটি ব্র্যান্ড সেইলর। এবার ঈদের সংগ্রহে তারা পুরুষদের জন্য এনেছে পাঞ্জাবি, কাবলি ও পাঞ্জাবি স্যুট, যা তৈরি হয়েছে প্রিমিয়াম জ্যাকার্ড, লুম জ্যাকার্ড, গ্রিড লাক্সারিয়াস, গ্রেস মোডাল ও ব্রিজ কটন লিনেনের মতো উন্নত মানের ফেব্রিকে। নারীদের জন্য রয়েছে সালোয়ার স্যুট, টু-পিস ও কুর্তি, যা সাজানো হয়েছে ব্লেন্ডেড গ্লো, শিফন ও লাক্সারিয়াস কটন ফেব্রিকে। পোশাকগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে নিখুঁত হাতের কাজ, এমব্রয়ডারি, স্ক্রিন ও ব্লক প্রিন্ট, সিকুইন ওয়ার্ক এবং ডিজিটাল প্রিন্ট, যা এবারের ঈদের আমেজে বেশ ট্রেন্ডি ও রাজসিক লুক দিবে।

মেকআপ ও হেয়ারস্টাইল
ঈদে বিশেষ করে এই মৌসুমে গরম-আর্দ্রতা ও বর্ষার আবহাওয়া মাথায় রেখে মেকআপ করতে হবে, যাতে তা থাকে হালকা, আরামদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী। মেকআপের আগে ত্বককে ভালোভাবে পরিষ্কার ও ময়েশ্চারাইজ করতে হবে। এসপিএফ যুক্ত সানস্ক্রিন, প্রাইমার লাগাতে হবে বাইরে যাওয়ার আগে। গরম আবহাওয়ায় ভারী ফাউন্ডেশন ব্যবহারে ত্বকে অস্বস্তি হতে পারে, তাই হালকা বেইজ বা টিনটেড ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করুন। আই মেকআপের জন্য হালকা শেডের আইশ্যাডো যেমন গোলাপি, পিচ বা গোল্ডেনÑ ঈদে খুব মানানসই। চোখের জন্য বেছে নিন ওয়াটারপ্রুফ আইলাইনার। ঈদের দিন পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নিন পছন্দের রঙের ম্যাট লিপস্টিক।
ঈদে সাজের সঙ্গে হেয়ারস্টাইলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কম সময়ে হেয়ারস্টাইল করতে চাইলে সিম্পল পোনি টেইল করে ফেলতে পারেন। গরমে লম্বা চুলে ফিশটেল ব্রেইড, বক্স ব্রেইড বা সাইড ব্রেইড করতে পারেন। এতে চুল সুন্দর বাঁধা থাকে এবং গরমেও অস্বস্তি কম হয়। বেণি করা চুলের মধ্যে ছোট ছোট ফুল বা রিবন দিয়ে সাজালে চুলের সাজে ভিন্নতা আসে। যারা চুলে তেমন কিছুই করতে চান না, তারা হালকা কার্ল করে ওয়েভ দিলে চুলে বেশ ভলিউম আসে। তবে ঈদের দিন চুল সুন্দর দেখানোর জন্য অবশ্যই আগে থেকেই যত্ন নিতে হবে।