জাফর সাদেক
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৫ ১২:৩১ পিএম
আপডেট : ১২ মে ২০২৫ ১৬:১৭ পিএম
লবুচে ইস্ট পর্বত জয় করা জাফর সাদেক ছবি : লেখকের সৌজন্যে
অত্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র ঠান্ডা এবং অক্সিজেন স্বল্পতা উপেক্ষা করে নেপালের সলোখুম্ভু অঞ্চলে অবস্থিত লবুচে ইস্ট পর্বত জয় করেছেন বাংলাদেশের তরুণ এক পর্বতারোহী। ঘুরিয়ার পাঠকের জন্যে রোমাঞ্চকর সেই অভিযানের গল্প জানিয়েছেন লবুচে ইস্ট পর্বত জয় করা জাফর সাদেক
কাঠমান্ডু থেকে লুকলাগামী ফ্লাইটের গোলকধাঁধায় দুই দিন পার হয়ে গেল। উপায়ান্তর না পেয়ে ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের আশা বাদ দিয়ে রামেচাপ এয়ারপোর্টে গিয়ে এক দিন অপেক্ষা করার পর অবশেষে মুক্তি মিলেছে। আবহাওয়ার এই বৈরী রূপ মনে করিয়ে দেয় প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে মানুষ কত অসহায়। গেল বর্ষায় দুধকোশী নদী ফুঁসে উঠে আশপাশের সবকিছু প্লাবিত করেছিল। এর ফলে পাহাড়ধসে ফাকদিং থেকে নামচে বাজারের রাস্তা ধসে পড়ে। বিকল্প রাস্তা দিয়ে নামচে বাজার পৌঁছতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।
-682194bcd5859.jpeg)
এবারের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল খুম্বু অঞ্চলে অবস্থিত লবুচে ইস্ট পর্বত চূড়ায় আরোহণ করা। নামচে বাজার পৌঁছে অভিযানের প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করে ফেলেছি। নেপালের শেরপা সম্প্রদায়ের রাজধানী হিসেবে নামচে বাজারের পরিচিতি বিশ্বজোড়া। অভিযাত্রীরা এখানে এসে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত এক দিন সময় অতিবাহিত করে থাকে। আইরিশ পাব, রেস্তোরাঁ অভিযাত্রীদের পদচারণায় মুখর। বিকাল থেকে এসব রেস্তোরাঁর ফায়ার প্লেসের চারপাশে চেয়ার পেতে আড্ডা জমে । Hungry Yak Restaurant এ লাইভ মিউজিকের আয়োজন করা হয়। এখানে পর্বতের ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখানোর ব্যবস্থাও আছে।
-682194e1170ae.jpeg)
দুই দিনের নামচে বাজারে অতিবাহিত করার পর সেখান থেকে পাংবোচের পথে রওনা দিলাম। এখানে আমাদাবলাম পর্বতের অসাধারণ দৃশ্য পথিককে মুগ্ধ করে দেয়। পথের দুধারে বর্ণিল রডোডেনড্রন ফুটে আছে। ক্লান্ত পথিকের পথচলা আনন্দময় করতে রডোডেনড্রনের ফাঁকে ছোট পাখিগুলো কিচিরমিচির সুর তুলেছে। চলতি পথে হঠাৎ করে সামনে এসে দাঁড়াল মোনাল। বর্ণিল রঙ আর মাথায় ঝুটিওয়ালা এই মোনাল নেপালের জাতীয় পাখি। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ছবি ওঠানোর চেষ্টা করতে গেলে পাখিটা ফুরুত করে ঝাউবনে হারিয়ে গেল। টেংবোচের কাছাকাছি পৌঁছার সময় মেঘের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় দৃষ্টিসীমায় সাদা দৃশ্য ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিছু সময় পর মেঘের আড়াল থেকে দূরের সবুজ পর্বতগুলো উঁকি দিচ্ছে। এ যেন রোদ-মেঘের লুকোচুরি খেলা। টেংবোচে মনেস্ট্রিতে কিছুটা সময় কাটিয়ে ডেবুচেতে মধ্যাহ্ন ভোজন শেষে বিকাল ৪টায় পাংবোচে পৌঁছার সময় তুষারপাত শুরু হয়ে গেল।
-682194ef09b9c.jpeg)
পরদিন সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি। গত রাতে তুষারপাতের ফলে তীব্র ঠান্ডা পড়েছে। এ ছাড়া আজকের গন্তব্য বেশি দূরে নয়। সকাল ৯টায় হেলেদুলে ট্রেকিং শুরু করে সোমারে পৌঁছে কফি পানের জন্য একটু সময় বিরতি দিয়ে আবার চলতে শুরু করলাম। সোমারে পার হওয়ার পর ইমাজা খোলা নদী। এই নদীর ওপর ছোট একটা সাসপেনশন ব্রিজ পার হয়ে সোজা ওপরে উঠতেই ডিংবোচে। দুপুর ১২.৩০ মিনিটে ডিংবোচে রিসোর্টে পৌঁছে গেছি। চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয় । রিসোর্টের জানালা থেকে পুরো ডিংবোচের প্যানারোমা দৃশ্য অবলোকন করা যায়। মাথার ওপর আমাদাবলাম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে বরুনোৎসে আর মাকালু পর্বতের নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। কথায় আছে, সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী হয়। হলোও তাই। প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্যপটে নতুনত্বের মেলা চলছে। বিকাল থেকে তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সরঙ্গ তুষারের তীব্রতাও বেড়েছে। সন্ধ্যার আঁধারে তুষারতলে দাঁড়িয়ে দূর দিগন্তের পানে তাকিয়ে রইলাম। এমন সুন্দর দৃশ্য এক জীবনে খুব কমই দেখা যায়। এই সৌন্দর্যের উৎস কোথায় কেউ জানে না।
-6821950908608.jpeg)
ডিংবোচে রিসোর্টে রাতের খাবার শেষে লবুচে অভিযানের জন্য মানসিকভাবে তৈরি হলাম। পর্বতারোহণের জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল সরঞ্জামাদি পরখ করে ক্লাইম্বিং শেরপার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হলো সকাল ৭টার মধ্যে লবুচে হাইক্যাম্পের উদ্দেশে ডিংবোচে ত্যাগ করব। ভোর পাঁচটায় যথারীতি ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃরাশ শেষে হাইক্যাম্পের উদ্দেশে বেরিয়ে এলাম। গত রাতের তুষারপাতের ফলে প্রচুর বরফ জমেছে রাস্তায়। যেকোনো সময় আবার তুষারপাত শুরু হয়ে যাবে। তাই দ্রুত পা চালিয়ে যতটা সম্ভব আগেভাগে ক্যাম্পে পৌঁছার চেষ্টা করছি। থুকলা থেকে বাম দিকের রাস্তা ধরে বেসক্যাম্পে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে আবার তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। হাইক্যাম্প আরও দুই ঘণ্টার দূরত্বে খাড়া ওপরে উঠে গেছে। তুষারপাতের ফলে জমা নতুন বরফের কারণে চলার পথ পিচ্ছিল হয়ে গেছে। পা চালানোর সময় সাবধানতা অবলম্বন না করলে চিৎপটাং হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। চলতি পথ তুষারে ঢেকে গেছে। নরম বরফে পাথরগুলো ঢেকে যাওয়ার কারণে পথের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। ফলে চলার গতিতে ছন্দপতন হলো। তুষারপাত মাথায় নিয়ে পাঁচ ঘণ্টার বিরতিহীন ট্রেকিং শেষে হাইক্যাম্পে পৌঁছে দুপুরের আহার শেষে তাঁবুতে প্রবেশ করলাম। কিন্তু তুষারপাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।
-68219523d39f2.jpeg)
রাতের খাবারের সময় ডাইনিং তাঁবুতে বসে শেরপার সঙ্গে সামিট পুশের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এখানে এসে আরও কয়েকজন অভিযাত্রীর সঙ্গে আলাপ হলো। আজ রাতেই আমরা চূড়ান্ত আরোহণের জন্য বের হব। বৈশাখী পূর্ণিমার আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। তুষারের তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে হাইক্যাম্পের চারপাশ ধবধবে সাদা হয়ে গেছে। সাদা বরফের ওপর চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব চোখের প্রশান্তি এনে দেয়। তাঁবুতে প্রবেশ করে কিছু সময় বিশ্রামের চেষ্টা করলাম। রাত ১টার সময় ঘুম থেকে উঠে হাল্কা নাস্তা খেয়ে সামিট পুশের জন্য তৈরি হলাম।
-6821953e0fb76.jpeg)
তাঁবুর চেইন খুলতেই দমকা বাতাস এসে গায়ে লাগল। তুষারপাত এখনও থামেনি। তীব্র ঠান্ডার মধ্যে আইসবুটের ফিতা বাঁধতে গিয়ে হাত জমে যাওয়ার দশা। ব্যাকপ্যাকে দুই লিটার গরম পানি আর চকলেট নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। হেডলাইটের আলোয় পথ চলছি। দলে দলে অভিযাত্রীরা বেরিয়ে এসেছে। সবাই আজ এক মোহনায় দাঁড়িয়ে একই গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছি। হেডলাইটের আলো দূর থেকে জোনাকিপোকার মতো মনে হয়। তুষারের নিচে ফিক্সড রোপ (পাথরের ওয়ালে বেঁধে রাখা দড়ি) ঢেকে গেছে। নতুন বরফের কারণে পথও পিচ্ছিল হয়ে গেছে বলে চলার গতি ধীর হয়ে রিজ লাইনে ট্রাফিক জ্যাম লেগে গেছে। ভোর ৪টায় ক্রাম্পন পয়েন্টে এসে গরম পানি পান করে ক্রাম্পন (বরফে হাঁটার জন্য আইসবুটের তলায় পরিহিত সুচালো লোহার গ্রিপ) পরে জুমারের সাহায্যে বরফের ওয়াল বেয়ে ওপরে আরোহণ করছি। বৈশাখী চাঁদ পর্বতের আড়ালে ডুবে গেল। ধীরে ধীরে সকাল হলো। পূর্বাকাশে সূর্যোদয়ের ঝলকানি। দূরে নীলাভ লেক দেখা যায়। খুম্বু হিমবাহের বরফের পিলারগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্টের চূড়াটা চোখের সামনে। এত আনন্দ আয়োজন চারপাশে ছড়িয়ে আছে। এসব দেখে পরিতৃপ্ত চিত্তে আরোহণ করছি। একটা সময় এসে পথের সমাপ্তি হয়ে গেল।
-6821954e0cd1c.jpeg)
সামনে একটা বরফের ফাটল। এই ফাটলের কাছে একটা ছোট জায়গা থেকে লাইন ধরে দড়ি বেয়ে রিজ লাইনে পৌঁছে একশ পঞ্চাশ মিটার সামনে এগোলেই লবুচে ইস্ট পর্বতের চূড়া। বরফের ফাটলের কাছে এই ছোট জায়গা দিয়ে একই দড়িতে ওঠানামার ফলে জ্যাম লেগে গেছে। জ্যাম এড়াতে আমি একপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। ভিড় কিছুটা কমলে জুমারিং করে রিজ লাইনে পৌঁছে গেলাম। চৈত্রসংক্রান্তির সেই দিনে চমৎকার রোদ ছিল তখন। ধীরে ধীরে চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। চূড়ায় তিব্বতি ভাষায় লেখা প্রার্থনা সংবলিত পতাকা গেঁথে রাখা আছে। ১৩ এপ্রিল নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৮.৩০ মিনিটে লবুচে ইস্ট পর্বত চূড়ায় বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকার সঙ্গে ইজরায়েলের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরেছি।
-6821955cd73b0.jpeg)
লবুচে ইস্ট পর্বতের চূড়ায় কিছু সময় অতিবাহিত করে ফটাফট চারপাশের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছি। চূড়ায় দাওয়া তামাং শেরপা আর আমি ছাড়া কেউ নেই। রিজলাইনে কয়েকজন অভিযাত্রী দেখা যাচ্ছে। তাদের আসার আগে আমাকে নেমে যেতে হবে। সামনে বহু পথ বাকি। তাই, পথের দেবতা প্রসন্ন হেসে বলে- মূর্খ, পথ তো তোমার শেষ হয়নি। দিন-রাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মৃত্যু পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়। সে পথের বিচিত্র আনন্দযাত্রার অদৃশ্য তিলক ললাটে পড়ে গৃহত্যাগ করেছিলাম । চল এগিয়ে যাই।
ছবি : লেখকের সৌজন্যে