× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শ্রমিকরা ন্যায্য বেতন কবে পাবেন

গোলাম কিবরিয়া

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৫৯ পিএম

শ্রমিকরা ন্যায্য বেতন কবে পাবেন

‘দিনে ১৬ ঘণ্টা চাকরি করি। বেতন পাই মাত্র ১৫ হাজার। ছুটিছাটা নাই। বেতন পাই ৪২ দিন পর। কাজ শেষে সামান্য যে সময় পাই খাইতে-ঘুমাইতেই চইলা যায়। আমাগো কাজরে কেউ সম্মানও করে না।’ আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন পেশায় সিকিউরিটি গার্ড হাশেম আলী (ছদ্মনাম)। কাজ করেন স্বনামধন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ৩০ মার্চ দৈনিক সমকালে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘বেতন-বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ-কান্না শ্রমিকদের’। খবরে বলা হয়েছে, ‘ঈদের আগে বেতন-বোনাস পাচ্ছেন না টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকরা। গতকাল শনিবার শ্রম ভবনে বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি। শ্রমিকরা ঈদের আগে গ্রামের বাড়ি যেতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তোপের মুখে বেতন-বোনাসের জন্য ঈদের আগে ২ কোটির জায়গায় ১ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তবে তা মানেননি সাধারণ শ্রমিকরা। তারা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন।’

ঈদের আগে সাত দিন ধরে টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকরা বেতন-বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা পুরো বেতন-বোনাস পাননি। শ্রম ভবনের সামনেই তারা ইফতার-সেহরি করেছেন। টানা আন্দোলনের পরও মালিকপক্ষ তাদের পূর্ণ বেতন-বোনাস দেননি। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস এসেছিল। কিন্তু সরকারও পারেনি। এমনই এক প্রেক্ষাপটে ১ মে পালিত হবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস। এ দেশে স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও জাতীয় ন্যূনতম মজুরির কোনো আইন বা অধ্যাদেশ হলো না। ফলে কর্তৃপক্ষের যেমন খুশি মজুরিতেই এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরও চলতে হয়। তার নজির চা বাগান, সেখানে এখন দৈনিক মজুরি ১৭৮ টাকা মাত্র। অথচ বাগানের বাইরেই একজন দিনমজুরের মজুরি ৫০০ টাকার কম নয়। দেশে শ্রমের একটি, আইনের একটি মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও ২০০৬ সালের আগে শ্রম আইন তৈরি হয়নি। ২০০৬ সালে তৈরি হয়ে ২০০৯, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ সালে ব্যাপক সংশোধনের পরও আমাদের কাছে এ আইন অনেক দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ রয়ে গেছে। নিয়মমতে শিল্পনীতি এবং শ্রমনীতির আলোকে শ্রম আইন হতে হয়। আর শ্রম আইনের আলোকে তার বিধিমালা তৈরি হতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হয় উল্টো। শ্রম আইন হয়েছে ২০০৬ সালে আর শ্রমনীতি হয়েছে ২০১২ সালে। আবার বিধিমালা হয়েছে ২০১৫ সালে, শ্রম আইন সংশোধন হয়েছে ২০১৮ সালে। এদিকে শ্রম আইনে এমন কিছু বিধান আছে, যা শ্রমিক জানে না বলে সে আইনি সুরক্ষা তারা পায় না। এর দায় শ্রমিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে।

দেশে ৮ কোটি শ্রমজীবী মানুষ আছে। তাদের ৮৫ শতাংশ বা ৭ কোটিরই আইনি সুরক্ষা নেই। তাই সব শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি জাতীয় ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ করেছে শ্রমবিষয়ক সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে শ্রম আইনে ‘মহিলা’ শব্দের পরিবর্তে ‘নারী’ শব্দ ব্যবহার এবং কর্মক্ষেত্রে তুই-তুমি সম্বোধন বন্ধের সুপারিশও করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে শ্রম সংস্কার কমিশনের দাখিল করা প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের শ্রমিকদের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করেছে কমিশন। লক্ষ্য হলো, কোনো শ্রমিক যেন নির্ধারিত এ মজুরির চেয়ে কম মজুরি না পান তা নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে শ্রমিকদের নিবন্ধন থেকে শুরু করে পরিচয়পত্র দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি আন্দোলনকালে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, তা দ্রুত প্রত্যাহারেরও সুপারিশ করেছে কমিশন।

শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত এবং তাদের দরকষাকষি করার প্রক্রিয়া যেন আরও সহজ হয়, তা নিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি দূর করতে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার কথা বলা হয়েছে, যে সুপারিশ অন্যান্য কমিশনও করেছে। শ্রমিকদের কল্যাণে সর্বজনীন তহবিল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে শ্রম আদালতসহ আপিল বিভাগের সব ক্ষেত্রে যেন বাংলা প্রচলন করা হয়, তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী-পুরুষের সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার ৫৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন মনে করে, বাংলাদেশের শ্রমজগতে বিরাজমান বৈষম্য মোকাবিলার জন্য শ্রম, শ্রমিক ও তাদের অধিকারকে কেন্দ্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, শ্রমজীবীর নাগরিক অধিকার, জীবনজীবিকার মর্যাদা, সমঅধিকার, প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়ন ও বৈষম্যবিরোধী সুযোগ নিশ্চিতের লক্ষ্যে শতাধিক অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময়ে সমন্বিত হয়েছে এ সুপারিশ। কমিশন মনে করে, বাংলাদেশে শ্রমিকের অধিকার ও মঙ্গল নিশ্চিতকরণে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, শিল্পের উৎপাদনশীলতা-বিকাশ ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর। তাই এটি শুধু শ্রমিকের নয়, সমগ্র দেশ ও দশের স্বার্থেই জরুরি। শ্রমিকের অধিকার বাংলাদেশের সাংবিধানিক অধিকারের অংশ। তেমনই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে শ্রমমানের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এ দেশের অঙ্গীকারের অংশ। এর জন্য রাষ্ট্রের নীতি-আইন প্রণয়ন, পরিকল্পনা গ্রহণ-বাস্তবায়ন, সর্বজনীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির অনুসরণ অন্যতম প্রয়োজনীয় কাজ। লক্ষ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার, শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের সুফলে শ্রমিকের ন্যায্য হিস্‌সা নিশ্চিতের মাধ্যমেই বৈষম্যহীন-মর্যাদাকর বাংলাদেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে কমিশন অভিমত প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, সমন্বিত মতের ভিত্তিতে তৈরি সুপারিশের আলোকে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত সব শ্রমিকের অধিকারসমূহ আইন দ্বারা সুরক্ষিত ও বাস্তবায়নে সরকারকে প্রয়োজনীয় ভূমিকা নিতে কমিশন সুপারিশ করছে। একই সঙ্গে সুপারিশ করছে কার্যকর বাস্তবায়নে আইনানুগ স্বীকৃতি, কাঠামোগত উন্নয়ন ও লঙ্ঘন প্রতিকারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রকে ভূমিকা নিতে। ১৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বকেয়া বেতনের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন এএসটি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এএসটি গার্মেন্টসের মালিকপক্ষ তাদের বেতন-বোনাস দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঈদের আগেই ছুটি দিয়ে দেন। ঈদের পর ছুটি শেষ হলে শ্রমিকরা কাজের উদ্দেশ্যে এসে গার্মেন্টস বন্ধ পান। কারখানার ভেতর কোনো মালামালও নেই বলে তারা দাবি করেন। বেতন বাকি চার মাসের। প্রশ্ন হলো, মালিক কেন কাজ চলমান কারখানা বন্ধ করেন, বন্ধ করে দেওয়ার পরে মালিকের হদিস কেন মেলে না? মালিক কেন তার শ্রমিকের মুখোমুখি না হয়ে গা ঢাকা দেন? এ বছর মার্চের তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রধান তিন শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীতে সাত মাসে মোট ৯৫টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। শিল্পপুলিশের তথ্যানুযায়ী, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে রয়েছে ৫৪টি, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ২৩টি এবং সাভার ও আশুলিয়ায় ১৮টি। এসব কারখানায় মোট ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বেশিরভাগ শ্রমিক ন্যায্য দাবি বুঝে পাননি।

প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু মানুষ বিদেশে চলে যায় উন্নত জীবনের আশায়। কিছু মানুষ দেশেই উপযুক্ত কাজের প্রত্যাশায় থেকে যায়। আমাদের অর্থনীতি কি তাদের জন্য যথাযথ কাজের ব্যবস্থা করতে পারছে? সম্প্রতি যেভাবে আমাদের মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে কি মজুরি বেড়েছে? কেমন আছেন আমাদের শ্রমিকরা?

শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন,

‘মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও

মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও

মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।’

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ একলা দাঁড়ানো, চরম নিঃসঙ্গ শ্রেণিটি হলো শ্রমিক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা