শেখ সোহেল
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৫৬ পিএম
কালের বিবর্তনে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বাগেরহাট সদর উপজেলার তালেশ্বর কুমারপাড়ার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। নানান সমস্যা আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ সংকটের মুখে পড়েছে এ মৃৎশিল্পটি। প্লাস্টিক, মেলামাইন ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের ভিড়ে দিনে দিনে হারিয়ে যেতে বসেছে শত বছরের ঐতিহ্যের মৃৎশিল্প। তার পরও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য এখনও ধরে রাখার চেষ্টা অনেকেরই। আর আগের মতো নেই, দিন পাল্টাচ্ছে। মানুষ আর এসব জিনিসপত্র তেমন একটা নেয় না। চাহিদা কম, তার ওপর আবার সব জিনিসের দাম বেশি।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বাগেরহাট সদর উপজেলার তালেশ্বর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীদের বসবাস। এখানকার প্রায় ১৫টি পরিবার এখনও মাটির তৈজসপত্র তৈরির কাজে যুক্ত, যদিও একসময় ২০০টির বেশি পরিবার মৃৎশিল্প তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন এ পেশা ছেড়ে জীবনজীবিকার জন্য অন্য পেশার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন।
তালেশ্বর কুমারপাড়ার প্রবীণ মৃৎশিল্পী রবিন পাল বলেন, ‘প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের জিনিসপত্র বের হওয়ার কারণে মাটির তৈরি জিনিসপত্র এখন আর আগের মতো চলে না। আগে তেমন একটা প্লাস্টিক এবং অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় পণ্য বাজারে না থাকায় মাটির তৈরি কলস, হাঁড়ি, পাতিল, সরা, মটকা, ফুলের টবসহ নানান সামগ্রী বিক্রি হতো। কিন্তু এখন প্লাস্টিক-অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় পণ্যে বাজার সয়লাব এবং তার দাম কম থাকায় ঘরে ঘরে এসব সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে গেছে। যার কারণে মাটির তৈরি তৈজসপত্র এখন তেমন একটা বিক্রি হয় না। ফলে মৃৎশিল্পীরা পরিবার নিয়ে আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাটির তৈরি জিনিসের উৎপাদন প্রক্রিয়া বেশ কষ্টসাধ্য। মাটি চাকার ওপরে বসিয়ে থালা, বাটি, দইয়ের মালসা, পানির পাত্রসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো রোদে শুকানো হয়, লাল মাটির তরলের মধ্যে ডুবিয়ে রঙ করা হয় এবং পরে একসঙ্গে পুড়িয়ে বাজারজাত করা হয়। কিন্তু পরিশ্রমের তুলনায় লাভ খুব সামান্য। এক মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ করলে লাভ থাকে ৮ হাজার টাকার মতো। পরিবারের সবাই মিলে দিনরাত পরিশ্রম করেও তেমন কিছু থাকে না। অভাব-অনটনে দিন কাটছে।’
সুমন পাল নামে এক শিল্পী বলেন, ‘বাপদাদার কাছে শেখা আমাদের এ জাতব্যবসা আজও কিছুটা ধরে রেখেছি। কামাল্লাসহ আশপাশের এলাকায় একসময় মাটির তৈরি জিনিসের ব্যাপক চাহিদা ছিল, কিন্তু বর্তমানে তেমন একটা চাহিদা নেই। আর মাটি থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম যে পরিমাণে বাড়ছে কাজ করে আর লাভের মুখ দেখি না।’
-6811c97a67d89.jpeg)
মৃৎশিল্পী নমিতা রাণী পাল বলেন, ‘বাপদাদার পেশা ধরে রেখেছি। এ ছাড়া কোনো কাজ জানি না। এত কষ্ট করে সব তৈরি করি। তাতেও বাজারে তার কোনো চাহিদা নেই। বিভিন্ন হাটে দোকান দিয়ে বেড়াই। যা বিক্রি হয় তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোনোরকম দিন কাটাচ্ছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক দীপক কুমার পাল বলেন, ‘মাটির তৈরি পণ্য একসময় আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। কালের বিবর্তনে এ শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবেশবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও প্লাস্টিকের আধিপত্যে এ পণ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে মৃৎশিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে। কম সুদে ঋণ প্রদান করতে হবে, যাতে তারা বড় পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন। মাটির তৈরি পণ্য বাজারজাত করার জন্য সরকারি উদ্যোগ নিতে হবে।’
বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার বলেন, ‘তালেশ্বরের পালপাড়ায় স্থানীয় কিছু পরিবার এখনও মাটির তৈজসপত্র তৈরি করছে। বংশপরম্পরায় এ কাজ তারা করছে। এটি আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প। সময়ের সঙ্গে তারা আধুনিকায়ন হতে না পারায় এ শিল্প অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছেন। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। যদিও মাটির তৈরি জিনিসপত্রের এখনও চাহিদা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিসিকের পক্ষ থেকে তাদের সহায়তা করার সুযোগ রয়েছে। এ শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য বিসিকের পক্ষ থেকে তাদের প্রশিক্ষণেরও সুযোগ রয়েছে। তাদের যদি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, ঋণের প্রয়োজন হয় তারও ব্যবস্থা বিসিক করবে। তারা যদি মনে করেন তাদের পণ্যটির মার্কেটিং প্রয়োজন সে ক্ষেত্রেও আমরা তাদের পাশে থাকব।’