এলিজা বিনতে এলাহী
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ১৪:১২ পিএম
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় স্কুলের মাঠে চৈত্রসংক্রান্তির দিন চড়ক খেলা হয় ছবি : লেখক
ঢাকার কাছাকাছি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় স্কুলের মাঠে চড়ক খেলার আয়োজন করা হয় প্রতি বছর। সাধারণত চৈত্রসংক্রান্তির দিন চড়ক খেলা হয়। স্কুল মাঠের কাছে অল্প দূরত্বেই চড়ক খেলার আয়োজকদের বাড়ি।
তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম একেবারে উৎসবমুখর পরিবেশ। পোশাক-পরিচ্ছদ, মেকআপ নিয়ে প্রায় রেডি হচ্ছেন শিল্পীরা। ছেলে-বুড়ো সবাই রয়েছেন। সবাই ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে মাঠে নামবেন। বাড়িতে চড়ক পুজোর আলাদা স্থান রয়েছে। বাড়ির নারীরা ব্যস্ত খানার আয়োজনে। বিরাট পাতিলে ভাত, সবজি আর ডাল রান্না হচ্ছে।

এই বাড়িটি রাজেন্দ্র কবিরাজের। তার বাবা শুরু করেছিলেন এই আয়োজন। তার পর তিনি। এখন তার তিন ছেলে সেই আয়োজন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। পূজামণ্ডপে দেখলাম একটি দুর্গার প্রতিমূর্তি, কালীর প্রতিমূর্তি ও দুটি মাথার খুলি। একটি লম্বা কাঠের মূর্তি যা লাল কাপড়ে ঢাকা রয়েছে। সেটির নাম পাটবান। রাজেন্দ্র কবিরাজের তিন ছেলে। তিনজনের বয়সই পঞ্চশের বেশি হবে। সবাই লাল কাপড় জড়িয়ে আছেন শরীরে। ১০ দিন থেকে তারা সবাই সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করছেন, পুজো ও খেলা শেষ হওয়ার পর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।
আমি অপেক্ষা করছি কখন হবে এই খেলা। তবে শুরুর আগের বিশাল আয়োজন আছে। চড়কগাছ মাঠের মাঝে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হবে। নারীরা সেই চড়কগাছে পুজো দিলেন। নারী-পুরুষ যারা এই আয়োজনের মধ্যে আছেন তারাই কেবল চড়কগাছ ছুঁতে পারবেন। মাছ-মাংস খেয়ে চড়কগাছ স্পর্শ করা বারণ।
এই আয়োজনের মূল আকর্ষণ বড়শি খেলা ও তার আগের কার্নিভ্যাল। বড়শি খেলাটি কিছুটা ভয়ের। কারণ একজন লোক নিজের পিঠে লোহার বড়শি বেঁধে চড়কগাছে ঘুরতে থাকবেন। তবে আমি আশ্চর্য হয়েছি, এতটুকু রক্তপাত হয়নি। মানুষের শরীরের চামড়া কত শক্ত যে, একটি হুকের ওপরে সে ঝুলে থাকতে পারে দীর্ঘক্ষণ।

খেলা শুরুর আগে মাঠ লোকে লোকারণ্য। একটু পর পর নারীরা উলুধ্বনি দিচ্ছে বড়শিতে বাঁধা পুরুষটির জন্য। আমার কাছে মনে হলো পুরুষটি দেবতাতুল্য তাদের কাছে। খেলা শেষ হওয়ার পর সবাই তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করছিল। এই খেলাটি দেখার জন্য সম্প্রদায় ভুলে সবাই মাঠে জড়ো হয়েছে। প্রতি বছরই তো এখানে খেলা হয় তারপরও এত উদ্দীপনা-উৎসাহ এই উৎসব নিয়ে।
যুক্তি কিংবা তর্কে এই বিষয় নির্ণয় করা খুবই কষ্টকর। আমার মতো যারা চড়ক পুজো সম্পর্কে কম জানেন তাদের জন্য বলছিÑ চড়কপূজা আসলে একটি লোক উৎসব। এই পূজা বহু প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ পূজার অপর নাম নীলপূজা, মহাদেবপূজা, গম্ভীরাপূজা বা শিবের গাজনপূজা। চড়কপূজা কবে কীভাবে শুরু হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে জনশ্রুত রয়েছে, ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা এই পূজা প্রচলন করেন। রাজপরিবারের লোকজন এই পূজা শুরু করলেও চড়কপূজা কখনও রাজ-রাজড়াদের পূজা ছিল না বলে ইতিহাস প্রমাণ দেয়। এটি ছিল হিন্দু সমাজের লোকসংস্কৃতি।
চড়কগাছে ভক্ত বা সন্ন্যাসীকে লোহার হুক দিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এ নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনও তা প্রচলিত আছে।
চৈত্রসংক্রান্তির ১৫ অথবা ৭ দিন আগ থেকে শুরু হয় চড়কের প্রস্তুতি। উৎসবের আমেজ শুরু হয় গ্রামের বারোয়ারি তলায়, শ্মশানে কিংবা গৃহস্থ বাড়ির আঙিনায়। যেখানে আর যেভাবেই এই উৎসব উপস্থাপিত হোক না কেন, এর মূল লক্ষ্য থাকে দেবতা শিবের আবাহন। শিবই এই উৎসবের মুখ্য। তাই শিবকে সন্তুষ্ট করাই পূজারিদের উদ্দেশ্য।