সাদিয়া সিদ্দিকা
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৩৪ পিএম
দরজায় কড়া নাড়ছে বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ। গ্রীষ্মের তপ্ত বাতাসে যখন কৃষ্ণচূড়া ফুলের রঙ লাল হয়ে ফুটে ওঠে, যখন কোকিলের ডাক শুনলে মনে হয় নতুন কিছু আসছে; ঠিক তখনই আগমন ঘটে বাংলা নববর্ষের। বৈশাখ মানেই নতুন সূর্য, নতুন বছর, নতুন স্বপ্ন আর পুরোনো সব গ্লানি ভুলে নতুন করে পথচলা। বাঙালির জীবনে এ উৎসব শুধু একটা ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি এক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, এক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।
পহেলা বৈশাখে বাঙালিয়ানার ছোঁয়ায় সাজগোজ
নববর্ষ মানেই উৎসব, আনন্দ আর বাঙালির ঐতিহ্য নতুন করে বরণ করে নেওয়া। তাই পহেলা বৈশাখের সাজেও থাকে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। নারীর ক্ষেত্রে সাদা-লাল রঙের জামদানি, কটন বা তাঁতের শাড়ি সবচেয়ে জনপ্রিয়। সঙ্গে লাল ব্লাউজ বা কনট্রাস্টিং রঙের ব্লাউজ মানানসই। গহনার মধ্যে ফুলের মালা, পুঁতির গহনা, কাঠ বা মাটির অলংকার বেশ জনপ্রিয়। সাজের পরিপূর্ণতার জন্য হাতে চুড়ি, কানে ঝুমকা আর খোঁপায় ফুল নারীর পছন্দের শীর্ষে। আর পুরুষের জন্য বৈশাখী সাজের মূল আকর্ষণ পাঞ্জাবি। সাদা বা লালের সঙ্গে হাতের কাজ করা পাঞ্জাবি বেশ জনপ্রিয়। পাঞ্জাবির সঙ্গে পরা যায় সাদা পাজামা বা জিন্স। এ সময় সাধারণত মেকআপে থাকে সহজ ও ন্যাচারাল লুক। মুখে হালকা মেকআপের সঙ্গে চোখে কাজল বা আইলাইনার আর লাল টিপ বাঙালিয়ানার পরিচয় বহন করে। লাল বা ন্যাচারাল শেডের লিপস্টিক এ দিনের সাজ আরও সুন্দর করে তোলে। এ ছাড়া খোলা চুলে ফুলের গাঁথুনি, খোঁপা বা বেণির সাজ নববর্ষের আমেজ আরও বাড়িয়ে তোলে। সব মিলিয়ে বৈশাখ মানেই উজ্জ্বল রঙ, ঐতিহ্য আর আনন্দের উৎসব, যা ফুটে ওঠে বাঙালির সাজসজ্জায়।

শাড়ির কদর সব সময় শীর্ষে
বৈশাখী সাজে নারীর মূল আকর্ষণ শাড়ি। কটন, তাঁত, জামদানি, মসলিন কিংবা ব্লক প্রিন্ট করা শাড়ির চাহিদা বেশি থাকে এ উৎসবে। লাল, সাদা, হলুদ, কমলা কিংবা উজ্জ্বল রঙের শাড়ির প্রতি ঝোঁক বেশি থাকলেও অনেকেই এখন প্যাস্টেল কিংবা কনট্রাস্ট রঙও বেছে নিচ্ছেন। তবে শাড়ির পাশাপাশি তরুণীদের মধ্যে সালোয়ার-কামিজ এবং কুর্তির জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। হাতে কাজ করা কটন বা লিনেনের সালোয়ার-কামিজ কিংবা ব্লক প্রিন্টের কুর্তি আরামদায়ক ও স্টাইলিশ। সঙ্গে পালাজো, স্কার্ট বা স্ট্রেট প্যান্ট মিলে তৈরি হয় ট্র্যাডিশনাল ও ট্রেন্ডি লুক।
বৈশাখী সাজ
এ দিনে মেয়েদের সাজপোশাকে থাকে বাঙালিয়ানা, আর সে সাজ পরিপূর্ণ করে তুলতে চাই বৈশাখী গহনা ও আনুষঙ্গিক উপকরণ। বৈশাখ মানেই যেহেতু লাল-সাদার প্রাধান্য, তাই গহনায়ও সেই রঙের প্রাধান্য থাকে। এ ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে রয়েছে পলিমাটির গহনা। এ ধরনের গহনা সহজলভ্য ও হালকা। হাতে বানানো নকশা, ফুল-পাখি বা আলপনার ছোঁয়া থাকা পলিমাটির গহনা এখনও বেশ ট্রেন্ডি। কানের দুল, মালা, চুড়ি সবই পাওয়া যায় মাটির তৈরি। এ ছাড়া রয়েছে কাঠের গহনা। বৈশাখের সাজে কাঠের গহনার ব্যবহার দিনদিন বাড়ছে। বড় দুল, লকেট, বালা, চুড়ি সবকিছুই পাওয়া যায় কাঠের নান্দনিক নকশায়। এতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক দারুণ সংমিশ্রণ থাকে। তবে এসবের বাইরেও নারীর পছন্দের তালিকায় রয়েছে কাঁসা, টেরাকোটা, সুতার গহনা ইত্যাদি।
লাল-সাদা বা হলুদ-সবুজ সুতার গহনা এখন তরুণীদের প্রথম পছন্দ। এটি ওজনেও হালকা, দেখতে উজ্জ্বল ও বৈশাখী সাজের সঙ্গে বেশ মানানসই।
বৈশাখী অনুষঙ্গ
গহনার পাশাপাশি মেয়েদের সাজ সম্পন্ন করতে কিছু আনুষঙ্গিক উপকরণও দরকার হয়। যেমন ফুলের মালা ও গাজরা। বৈশাখী সাজের অপরিহার্য অংশ হলো ফুলের মালা। গাঁদা, বেলি, রজনীগন্ধা বা গোলাপের মালা পরলে সাজে আসে অনন্য সৌন্দর্য। চুলের বেণিতে গাজরা পরাও বেশ ট্রেন্ডি। বড় লাল টিপ বৈশাখী সাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়া হাতে ও পায়ে লাল বা গোল্ডেন আলতা পরলে সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।
চুলের সাজ
নববর্ষের সাজগোজের পাশাপাশি চুলের সাজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পহেলা বৈশাখের সাজে চুলের স্টাইলেও থাকে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন লুক। বৈশাখী সাজের অন্যতম অনুষঙ্গ ফুল। অনেকেই বেণি, খোঁপা বা খোলা চুলে গাজরা, গোলাপ, রজনীগন্ধা বা গাঁদা ফুলের মালা ব্যবহার করেন। ফুলের মালা দিয়ে সাজানো খোঁপা বা একপাশে টকটকে লাল গোলাপ বৈশাখী সাজ আরও ফুটিয়ে তোলে। বৈশাখে অনেকেই বিনুনি, ফিশটেল বা খেজুরির বেণি করে ফুল বা মালার সংযোজন করেন, যা সহজেই নজর কাড়ে। আবার গরমের কথা মাথায় রেখে অনেকেই খোঁপা করে নেন। সাদা-লাল শাড়ির সঙ্গে খোঁপা বেশ ভালো মানায়। মেসি বান, বেণি খোঁপা বা নিচু খোঁপায় ফুল ও গাজরা দিলে ট্র্যাডিশনাল ও স্টাইলিশ লুক পাওয়া যায়। যারা খোলা চুল রাখতে ভালোবাসেন, তারা চুল সামান্য কার্ল বা ওয়েভি করে নিতে পারেন। একপাশে ফুল গুঁজে নিলে কিংবা সামনের কিছু চুল পেঁচিয়ে পিন দিয়ে আটকে নিলে বাঙালিয়ানার সাজে একটুও কমতি হবে না।
বৈশাখী আনন্দে ছেলেদের ফ্যাশন
শুধু মেয়েদেরই নয়, বৈশাখী সাজে ছেলেরাও রাখতে পারেন নান্দনিকতা ও স্বকীয়তা। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সমন্বয়ে বৈশাখের ফ্যাশনে এসেছে নতুন মাত্রা। পহেলা বৈশাখে ছেলেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক পাঞ্জাবি। এবারের ট্রেন্ডে রয়েছে লাল, সাদা, অফ-হোয়াইট, হলুদ ও নীল রঙের হাতের কাজ করা কটন ও লিনেন পাঞ্জাবি। অনেকে বেছে নিচ্ছেন সূচিকর্ম করা বা ব্লক-প্রিন্টের দেশি কাপড়ের পাঞ্জাবিও। পাঞ্জাবির সঙ্গে মিলিয়ে পরা যায় পাজামা, সাদা প্যান্ট বা ধুতি। যারা আরামদায়ক ও ক্যাজুয়াল লুক চান, তাদের জন্য ফতুয়া দারুণ এক বিকল্প। বৈশাখের গরমে সুতি বা লিনেন ফতুয়া যেমন আরামদায়ক, তেমনই ট্রেন্ডি। ফতুয়ার সঙ্গে জিন্স বা চেক লুঙ্গি বেশ মানানসই। এ ছাড়া ফ্যাশনপ্রেমী তরুণরা তাদের সাজ সম্পূর্ণ করতে বেছে নিচ্ছেন বাহারি অ্যাকসেসরিজ। মাথায় গামছা বাঁধা বা দেশি পাগড়ি পরা এখন বেশ জনপ্রিয়। গলায় হাতে তৈরি মাটির মালা বা কাঠের মালা যোগ করলে ভিন্নধর্মী লুক পাওয়া যায়। হাতে কাঠের বা মাটির ব্রেসলেট এবং পায়ে নাগরা জুতা পুরো সাজে আনবে দেশি আমেজ। এ দিনটিতে ছেলেরা চুলের সাজে কেউ বেছে নিচ্ছেন রাফ লুক, আবার কেউ ক্লিন-লুক স্টাইল। বৈশাখের কড়া রোদ থেকে বাঁচতে সানগ্লাসও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তরুণদের মধ্যে।

বৈশাখে জমকালো নানা ব্র্যান্ড
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দেশের বিখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ডগুলো প্রতি বছর নিয়ে আসে বিশেষ পোশাক কালেকশন। এবারের বৈশাখেও বিভিন্ন ব্র্যান্ড তাদের নান্দনিক ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সমারোহে সজ্জিত করেছে সংগ্রহশালা। চলুন জেনে নেওয়া যাক সেসব ব্র্যান্ড সম্পর্কে
আড়ং : আড়ং বাংলাদেশের ফ্যাশন জগতে একটি সুপরিচিত নাম। তাদের বৈশাখী সংগ্রহে থাকে সাদা-লাল শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি এবং বিভিন্ন হস্তশিল্প পণ্য, যা বাঙালির ঐতিহ্য তুলে ধরে। এবারের বৈশাখে তারা নিয়ে আসতে যাচ্ছে বেশ কিছু চমৎকার পোশাকের সমারোহ!
বিশ্বরঙ : বিপ্লব সাহা প্রতিষ্ঠিত এ ব্র্যান্ডটি তাদের পোশাকে বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আধুনিকতার সঙ্গে মিশিয়ে উপস্থাপন করে। বৈশাখ উপলক্ষে তাদের সংগ্রহে থাকে জমকালো শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি ও অন্যান্য পোশাক। তবে এবারের বৈশাখ আয়োজনে তারা এক্সক্লুসিভ কালেকশন আনতে যাচ্ছে। কাপল পোশাকসহ সিঙ্গেল এবং পরিবারের মিশেল পোশাকের নানা বাহার দেখা যাচ্ছে।
অঞ্জন’স : অঞ্জন’স তাদের পোশাকে বরাবরই লোকজ নকশা ও ঐতিহ্যবাহী মোটিফ ব্যবহার করে। বৈশাখী সংগ্রহে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি ও অন্যান্য পোশাকে থাকে বাঙালির সংস্কৃতির ছোঁয়া। আর পহেলা বৈশাখ ঘিরে এদের আয়োজন থাকে বেশ জমজমাট।
রঙ : রঙ তাদের পোশাকে বাংলাদেশের প্রাণবন্ত রঙ ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প উদ্যাপন করে থাকে। বৈশাখী সংগ্রহে হ্যান্ডলুম শাড়ি, ব্লক-প্রিন্ট করা কুর্তা, এমব্রয়ডারি করা শাল ও স্কার্ফ পাওয়া যায়। তবে বৈশাখ কেন্দ্র করে তাদের সব সময়ই চমৎকার পোশাকের নান্দনিকতা দেখা যায়। আর এবারও তার ব্যতিক্রম নেই।
রঙ বাংলাদেশ-এর কর্ণধার সৌমিক দাস জানান, ‘বাঙালির এই অন্যতম উৎসবের আবহকে তুলে ধরতে আমরা এই বৈশাখের ডিজাইনে দুটি বিশেষ থিম নিয়ে কাজ করেছি। একটি হলো ‘কাঠের পুতুল’। কাঠের পুতুল বাঙালির লোকশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অনন্য নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত। সাধারণত হাতে তৈরি করা পুতুলের দেহজুড়ে থাকে নিখুঁতভাবে খোদাই করা দারুণ ডিজাইন ও তার সাথে নানারকম উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার। আরেকটি হচ্ছে ‘মুখোশ’ থিম। দেশজুড়ে বৈশাখের শোভাযাত্রায় জায়গা করে নেয়া মুখোশ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির একটি গুরুত্বর্পূণ অংশ। প্রতীকী এসব মুখোশে বাঘ, পাখি, মাছ, সূর্য, এবং গ্রামীণ জীবনের নানা নকশা ফুটে ওঠে। এসব অতুলনীয় নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি হয়েছে রঙ বাংলাদেশের এবারের নববর্ষের পোশাক।’
এ ছাড়া অন্যান্য ব্র্যান্ড যেমন কে ক্র্যাফট, ইয়েলো, দেশাল, রিচম্যান, বিলিভার্স সাইন, ম্যানস ওয়ার্ল্ড তাদের বৈশাখী সংগ্রহে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য এনেছে। তাদের পোশাকে রয়েছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টপস, কুর্তি, পাজামা, শার্ট, টি-শার্ট, পোলো শার্ট, প্যান্ট, ব্লেজার, জ্যাকেটসহ নানা পণ্য। সব মিলিয়ে এবারের বৈশাখে বাংলাদেশের বিখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ডগুলো তাদের নান্দনিক ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সমারোহে ফ্যাশনপ্রেমীদের মন জয় করতে প্রস্তুত।