প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৫ ১০:২৪ এএম
পদ্মরেশম থেকে তৈরি স্কার্ফ। প্রবা কোলাজ
বস্ত্রবয়ন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হলো বাংলাদেশে। অবশেষে সফলভাবে সম্পন্ন হলো পদ্মরেশম দিয়ে কাপড় তৈরি করা। দেশে এ বিষয়টি আমাদের জন্য নতুন হলেও পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় এ রেশম উৎপাদনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৯ শতকে মিয়ানমারের উইম সান নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী এ প্রক্রিয়ার সূচনা করেন। মূলত তাকেই এ রেশম চাষের উদ্ভাবক বলা হয়। এরপর ২০১৭ সালে ভিয়েতনাম, ২০০৩ সালে কম্বোডিয়া বাণিজ্যিকভাবে পদ্মরেশমের কাপড় তৈরি শুরু করে। এ তালিকায় ভারত যুক্ত হয়েছে ২০১৯ সালে।
যেভাবে সুতা কাটা হয়
পদ্মের ১-২টি ডাঁটা নিয়ে এক ইঞ্চি পরপর ভাঙার পর যে আঠা নির্গত হয় সেটা পাকিয়েই সুতা তৈরি করা হয়। যদি ডাঁটার সংখ্যা বেশি হয় তাহলে সুতা মোটা হবে। আর ডাঁটার সংখ্যা কম হলে সুতা সরু হবে। এ আঠার বৈশিষ্ট্য অনেকটা ফুটি কার্পাস তুলার মতো। সেজন্য আমাদের দেশের মেয়েদের পক্ষে উন্নতমানের সুতা কাটা সম্ভব। আর সেটা প্রমাণও করেছেন ফরিদপুরের কানাইপুরের রনকাইল গ্রামের মহিলারা। মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণেই তারা চমৎকার মানের সুতা কাটতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশে সাধারণত আগস্ট থেকে ডিসেম্বর সুতা কাটার ভালো সময়। ওই সময়ে পদ্ম ভালো পাওয়া যায়। আবার মহিলাদের হাতেও কাজ কম থাকে। এ সিল্ক উৎপাদন কৃষির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ায় গ্রামীণ নারীদের জন্য আয়ের নতুন উৎস হতে পারে খুব সহজেই। এজন্য এ প্রকল্প বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রচুর দক্ষ কাটুনী তৈরি হবে এবং তারা এ কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে।
সুতার গঠন
পদ্মের ডাঁটায় অসংখ্য ছোট ছোট কূপ বা পোর আছে, যেখানে জমা থাকে আঠাসদৃশ পদার্থ। এ আঠা বাতাসের সংস্পর্শে এসে জমাট বেঁধে যায়। সেটা নিপুণতার সঙ্গে পাকিয়ে সুতা তৈরি করা হয়। এ সুতা বাতাসে দ্রুতই শুকিয়ে যায়। রোদে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এ সুতা থেকেই কাপড় তৈরি হয়। উল্লেখ্য, গোলাপি পদ্মের (Nelambo Nucifera) ডাঁটা পদ্মরেশম সুতা তৈরির জন্য আদর্শ। অন্য পদ্ম থেকেও সুতা তৈরি হতে পারে। তবে অন্যান্য পদ্মের ডাঁটায় সেলুলোজের পরিমাণ কম থাকায় বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। পদ্ম ডাঁটার আঠাসদৃশ এ পদার্থ এক ধরনের জৈবযৌগ। এটা বস্তুত সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ ও অন্যান্য উপাদানের (পেকটিন, লিগনিন, ফ্যাট ও অ্যামাইনো অ্যাসিড) সমষ্টি; যা বাতাসের সংস্পর্শে এসে জমাট বাঁধে। ফলে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে এ আঠা সুতায় রূপান্তর করা হয়। পদ্মরেশমের বৈশিষ্ট্য পদ্মরেশম সুতার রঙ হালকা দুধে হলুদ। এর ঘনত্ব প্রতি সেন্টিমিটারে ১.১২ গ্রাম। সুতি সুতা ও মালবেরি সিল্ক সুতার চেয়ে এ সুতা শক্ত, টেকসই ও শতভাগ পানিরোধী; তবে অধিক প্রসারণযোগ্য না হলেও এ সুতা কোঁচকায় না (অর্থাৎ রিঙ্কল ফ্রি)। এ সুতা প্রাকৃতিকভাবে উজ্জ্বল, কোমল ও বায়ু চলাচলকারী।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা
কয়েক ব্যক্তির নিদারুণ চেষ্টা ও সম্পৃক্ততার কারণে পদ্মরেশম বা লোটাস সিল্কের বাংলাদেশে সফল উদ্ভাবন ও উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন বেঙ্গল প্ল্যান্টস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিপিআরডি)-এর চেয়ারম্যান শিকদার আবুল কাশেম শামসুদ্দীন।
বিপিআরডির গবেষণাসূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় নানা আকারে অন্তত ৩৫-৪০টি বিল আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিলগুলো সরকারি মালিকানাধীন। এসব বিলে সারা বছর পানি থাকায় পদ্ম সংগ্রহ করা সম্ভব। আবার কিছু বিল আছে সরকার ও ব্যক্তি যৌথ মালিকানার। উল্লেখ্য, পদ্মের ডাঁটা কেটে নিলে পানির নিচে পুনরায় বাড়তে থাকে। এ বৃদ্ধি প্রতিদিন অন্তত ৬–৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। ফলে প্রতি মাসে কম করে পাঁচবার পদ্মের ডাঁটা সংগ্রহ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন পদ্ম গবেষক শিকদার আবুল কাশেম শামসুদ্দীন।
তথ্যসূত্র : শেখ সাইফুর রহমান