আফসানা বেগম
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৬:৪৩ পিএম
বই মানুষের ভেতরটা বদলে দিতে পারে। তাই মানুষ নিজেই যখন মননশীলতার দিক থেকে বদলায়, তখন তার আশপাশের তাবৎ জিনিসও বদলাতে হয়। তাই পৃথিবীর পরিবর্তনশীলতার জন্য মানুষের মননশীলতার পরিবর্তন দায়ী। আর সেই পরিবর্তন আনতে পারে বই। তবে কি বই ভয়ংকর নয়? বইয়ের এ চরিত্র বুঝতে হলে যে বহু বই পড়তে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আর সে কারণেই নারায়ণ চন্দ্র হালদার সেই কোন অল্পবয়সে নিজে পড়ার সুযোগ না পেয়েও বইয়ের প্রলয়ংকরী ক্ষমতার কথা জেনে বইকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মাঝপথে থেমে গেলে কজন পারে উঠে দাঁড়াতে! অথচ এ এক অদ্ভুত গল্প। নারায়ণ কাঠের কাজ করেন। আসবাব বানানো তার পেশা। কিন্তু মানুষটির ভেতরে ছিল এক শিল্পীমন। নারায়ণ মিস্ত্রি যখন নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, অর্থের অভাবে শিক্ষা আর এগোল না। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ ছাড়লেন, কিন্তু ধরলেন মানুষকে পড়ানো। তিনি চিন্তা করলেন, নিজে যখন পড়তে পারেননি তখন মানুষকে পড়ানোই জীবনের ব্রত হবে। আর হলোও তাই। সামান্য আয়ের ওপর ভরসা করে তিনি তিল তিল করে গড়ে তুললেন এক লাইব্রেরি, নাম নারায়ণ মিস্ত্রি লাইব্রেরি। ঝালকাঠির একটি স্কুলের দুটি অতিরিক্ত ঘর বা গ্যারেজের মধ্যে তার লাইব্রেরি গড়ে উঠল।
পেশাসংক্রান্ত কাজ করার ফাঁকে তিনি কাঠ খোদাই করে বিভিন্ন শখের জিনিস ও মানুষের অবয়ব বানান। অদ্ভুত তার সৃষ্টিগুলো। খোলা চুলে কোনো মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার কাঠ খোদাইয়ে, কোথাও আবার বিখ্যাত কোনো মনীষীর মুখ। এক রঙের কাঠের সঙ্গে আরেক রঙের কাঠের ব্যবহারে কিছু কিছু শিল্প সময়োত্তীর্ণ। দিনের বেলায় গেলে দেখা যাবে লাইব্রেরির এক কোণের দিকে অল্প জায়গা নিয়ে কাঠ খোদাই করে তিনি শিল্প সৃষ্টিতে মগ্ন আছেন। লাইব্রেরিতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই প্রধান পাঠক। এ ছাড়া এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গণ্যমান্য ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ নারায়ণ মিস্ত্রির পাঠাগারে নিয়মিত পড়তে আসেন। কাঠের গায়ে ঠুকঠাক শব্দে নারায়ণ মিস্ত্রি তাদের দিকে তৃপ্তির চোখে তাকান।
নারায়ণ মিস্ত্রির পাঠাগারে বই আছে প্রচুর তবে তা যেকোনো বই নয়। সুচিন্তিত তালিকায় দেখা যায় মূলত বাংলা ভাষার সব দশকের বিখ্যাত লেখকের বইয়ের সমাহার। পাঠযোগ্য এবং অবশ্যপাঠ্য বইয়ের যেন বিপুল আয়োজন। প্রথম পাঠাভ্যাস তৈরির জন্য নারায়ণ মিস্ত্রির পাঠাগার অত্যন্ত উপযুক্ত। অন্যদিকে স্কুলের ছাত্র বা সাধারণ পাঠককে নিয়মিতভাবে ধরে রাখাও সেখানকার বইয়ের তালিকার পক্ষে সম্ভব। এ রকম একটি পাঠাগার পাঠক তথা সমাজের জন্য অমূল্য সম্পদ হতে পারে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাস দুয়েক আগে নারায়ণ মিস্ত্রি পাঠাগারে গেলে দেখা যায় পাঠাগারটি কিছুদিনের মধ্যেই উঠে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জায়গার অভাবে। যে স্কুলের নিজস্ব ভবনের একটি অংশে পাঠাগারটি অবস্থিত, সেই স্কুলটির জন্যই সেটা হতে পারত একটি সমৃদ্ধ পাঠাগারকে পাওয়ার পরম সুযোগ। ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানচর্চা বা বিনোদনের উৎস হতে পারত পাঠাগারটি। কারণ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই ক্লাস শেষে ওখানে ভিড় করে। আজকাল আশির দশকের মতো স্কুলের ভেতরে সমৃদ্ধ পাঠাগার থাকে না। আবার কোথাও থাকলেও সেই পাঠাগারের জন্য উপযুক্ত গ্রন্থাগারিকের অভাবে ছাত্রছাত্রীদের বই পড়ার বা ধার নেওয়ার সুযোগ ঘটে না। স্কুলের উদ্দেশ্য হয়তো এখন আর ‘আউটবই’ পড়ানো নয়। তারা পাঠ্যবই এবং কেবল পাঠ্যবইয়ের ওপরই ছাত্রছাত্রীদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে চায়। কবে আর কীভাবে যেন সমাজজ্ঞান অর্জনের চেয়ে এ প্লাস পাওয়াকে বেশি মূল্যায়ন করতে শিখেছে। নারায়ণ মিস্ত্রি পাঠাগারকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা এরই বাস্তব ফল।
স্কুলটির নাম উদ্বোধন স্কুল। কথিত আছে রবীন্দ্রনাথ একবার নদীতে সাম্পানে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সাম্পান ঘাটে ভিড়েছে শুনে স্কুল প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত ব্যক্তিরা তাকে স্কুলটি উদ্বোধন করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তখন হঠাৎ করেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার কারণে সাম্পান থেকে নেমে এসে স্কুল উদ্বোধন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই তিনি বলে যান স্কুলটির নাম ‘উদ্বোধন’ রাখতে। নামের মধ্য দিয়ে যেন প্রতিনিয়ত তিনি উদ্বোধনে রত থাকেন।
বিষয়টি ভাবা কষ্টকর যে, শুধু সেই উদ্বোধন স্কুল নয়, বাংলাদেশের কোনো স্কুলেই এখন আর সত্যিকারের জ্ঞানচর্চার উপায় নেই। একটি গৎবাঁধা আঙ্গিকে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করছে, সুনির্দিষ্ট নিয়মে পরীক্ষায় বসছে এবং সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কহীন এক কাঠামোর মধ্য দিয়ে উঁচুমানের ফল নিয়ে উচ্চশিক্ষার্থে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ রকম একটি কাঠামোর মধ্যে বিচিত্র বইয়ের পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা কঠিন। উদ্বোধন স্কুলও তাই নারায়ণ মিস্ত্রি পাঠাগারের বয়োজ্যেষ্ঠ পাঠক বা শুভাকাক্ষী, কারও অনুরোধই রাখতে পারে না। তারা শাহি জর্দা কোম্পানির কাছে রাস্তার ধারের ওই গ্যারেজ দুটো ভাড়া দেওয়ার জন্য আগাম মোটা টাকা গ্রহণ করে। জনসমাগমের মাঝখানে, ব্যস্ত রাস্তার ধারে শাহি জর্দা কোম্পানির ভালো ব্যবসা হওয়ার খাতিরে তাই নারায়ণ মিস্ত্রিকে তার পাঠাগারসমেত উঠে যেতেই হবে। একে তো আগের ভাড়া বাকি, তায় আবার ভবিষ্যতের লাভের প্রত্যাশাÑ উদ্বোধন স্কুলের কাছে তাই নারায়ণ মিস্ত্রি পাঠাগার একটি উপদ্রব ছাড়া আর কিছু নয়।
সাইকেল নিয়ে পাঠাগারের সামনে নারায়ণ চন্দ্র হালদার। চারপাশে তার তৈরি কাঠ খোদাই করা শিল্পকর্ম
বিভাগীয় প্রশাসন সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সে রকম কিছু সাহায্যের কথা শোনা যায়নি। অন্যদিকে, এ মাসে শোনা যায় অনেক রকমের অনুরোধের পরও স্কুল কর্তৃপক্ষ নারায়ণ মিস্ত্রি পাঠাগার শেষ পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়েছেন। শাহি জর্দা কোম্পানি যখন গ্যারেজ দুটি দখল করতে এসেছিল, পাঠাগারের বইয়ের সম্ভার দেখে তারা বিস্মিত। নিজেদের দোকান করবে বলে তারা বদ্ধপরিকর কিন্তু এত বইয়ের সম্ভার দেখে দ্বিধায় পড়ে। উপস্থিত লোকেরাও তাদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে, এ পাঠাগার সমৃদ্ধ। এ পাঠাগার মানুষের মননশীলতার উন্নয়ন ঘটাতে পারে। তাই এ পাঠাগার দেশের সম্পদ। দেশের সম্পদ কেউ এভাবে নষ্ট করে? শাহি জর্দার লোকেরা যারা নারায়ণ মিস্ত্রিকে পাঠাগারের বইসমেত উচ্ছেদ করার প্রহর গুনছিল, নিজেরাই ধন্দে পড়ে যায়। উচ্ছেদ না করে চলেও যায় তারা। শেষে পাঠাগারের কাছে তাদেরই অন্য একটি দোকানঘরে নারায়ণকে বইগুলো নিয়ে উঠতে বলে। আগের চেয়ে ছোট, অসুবিধাজনক হলেও নারায়ণ মিস্ত্রি পাঠাগারের গ্যারেজ দুটি ছেড়ে নতুন জায়গায় গিয়ে ওঠেন। পরবর্তী পরিদর্শন না হলে বোঝা যাচ্ছে না সাময়িকভাবে পাঠাগারের নতুন ঠিকানায় নারায়ণ মিস্ত্রি কতটুকু গুছিয়ে উঠতে পেরেছেন। কিন্তু শাহি জর্দা কোম্পানির এ সহযোগিতা প্রশংসনীয়, যা বলতে গিয়ে নারায়ণ মিস্ত্রি আনন্দিত হয়ে ওঠেন। আপাতত পাঠাগারটি কোনোরকমে বেঁচে রইল, এও-বা কম কী!
ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়া পাঠাগার সমাজে এমন পরিবর্তন আনতে পারে যা কেবল স্থানীয়ভাবে এলাকার লোকদের মাধ্যমেই সম্ভব। সরকার তার বিরাট কর্মযজ্ঞ নিয়ে কখনোই সমাজের ওই স্তরে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠাভ্যাস তৈরি করতে পারবে না। সরকার কেবল দূর থেকে প্রণোদনা দিতে পারে, উৎসাহব্যঞ্জক কাজের মাধ্যমে কিছুটা এগিয়ে নিতে পারে। সরকারের এ প্রচেষ্টা বহু পাঠাগারকে পুনরুজ্জীবিত হতে কিংবা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমাজে রিডিং সোসাইটি গঠন বা সামাজিক উন্নতিসাধন, সবকিছুর বীজ বপন করা হয় নারায়ণ মিস্ত্রির মতো লোকদের মাধ্যমে। এঁরা নিজের জীবনের ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের সুযোগ বিসর্জন দিয়ে একটি পাঠাগার গড়ে তোলেন। একটি পাঠাগার কিন্তু কেবল একটি পাঠাগারই নয়, অর্থাৎ সেখানে কেবল বইয়ের স্তূপ চুপ করে পড়ে আছে তা-ই নয়। বরং সেখানে পাঠক তৈরি হয়। একেকটি পাঠাগার একেকটি পাঠক তৈরির কারখানা। একটি বই একজন নতুন পাঠককে নানান বইয়ের কাছে নিয়ে যেতে পারে। মানুষ হিসেবে তার মননশীলতায় আনতে পারে প্রভূত পরিবর্তন। আর একেকজন মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন মানেই সমগ্রভাবে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন। অন্যদিকে, বই পড়ার নিমিত্ত একসঙ্গে পাঠকরা নানানরকমের সংস্কৃতিচর্চায় মনোনিবেশ করে যাতে সমাজের কৃষ্টি বহমানতা পায়। পাঠকের মধ্যে নানানরকমের চর্চা বা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের বিপথে যাওয়াও প্রতিহত হয়। এভাবে একটি পাঠাগার কেবল পাঠ বা বইয়ের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে সামাজিক সংগঠন। সামাজিক সংগঠনগুলো স্থানীয়ভাবে প্রচুর ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, যা চোখ-কান খোলা রাখলেই জানা যায়।
এ পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকার সচেষ্ট থাকবে, কিন্তু বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এককভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারবে না যতক্ষণ সমাজের চিন্তাশীল মানুষ সে কাজে অংশগ্রহণ না করে। সরকারের কাজ হবে তাদের কাজের বা সহযোগিতার জন্য একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নির্মাণ। নারায়ণ মিস্ত্রি পাঠাগারের মতো বহু পাঠাগার বেঁচে থাকুক সমাজের মানবিক মানুষের সহায়তায় যেন সরকার তাদের আরেকটু এগিয়ে নিতে পারে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক; পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র