× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নকশিকাঁথার গল্প

সুবর্ণা মেহজাবীন

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:৩১ পিএম

নকশিকাঁথার গল্প

নকশিকাঁথা বাঙালি জীবনের এক অনন্য সাংস্কৃতিক অংশ, যা কেবল একটি ব্যবহারিক উপকরণ নয়, বরং আমাদের জীবনের গল্প, আবেগ এবং ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি-

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুতির কাঁথা, যা ‘নকশিকাঁথা’ নামে পরিচিত, তার একটি বিশিষ্ট স্থান রয়েছে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। বহু শতাব্দী ধরে এ কাঁথা বাঙালি নারীদের হাতে তৈরি হয়ে আসছে, যা শুধু একটি সাধারণ পোশাকের উপকরণই নয়, বরং তাদের দক্ষতা, রুচি ও সৃজনশীলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নকশিকাঁথার উত্পত্তি

নকশিকাঁথার ইতিহাস অনেক পুরোনো এবং এর উৎপত্তি মূলত গ্রামবাংলার গৃহস্থালি জীবন থেকে। কাঁথার শিরোনাম ‘নকশি’ শব্দটি এসেছে নকশা বা ডিজাইন থেকে, যা উঁচু কাজের মাধ্যমে সুতা সেলাই করে তৈরি হয়। কাঁথা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘কাঁথা’ থেকে, যার অর্থ পুরাতন কাপড় বা পট্ট। পুরোনো শাড়ি, ধুতি বা কাপড়ের টুকরো জোড়া দিয়ে তৈরি এ নকশিকাঁথা কেবল এক টুকরো কাপড় নয়; এটি নারীর সৃষ্টিশীলতার অসাধারণ উদাহরণ।

নকশিকাঁথার উৎপত্তি ও ঐতিহ্য

নকশিকাঁথার উৎপত্তি বহু প্রাচীন। ধারণা করা হয়, এটি বাংলার গ্রামীণ নারীদের নিজস্ব শিল্পচর্চার অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে। শীতের রাতে পরিবারের সদস্যদের গায়ে দেওয়ার জন্য তৈরি এ কাঁথা প্রথমে ছিল সহজ এবং ব্যবহারিক। পরে এটি নকশা, অলংকরণ এবং বুননশৈলীর মাধ্যমে হয়ে ওঠে এক শিল্পকর্ম।

নকশিকাঁথার নকশায় ফুটে ওঠে জীবনের বিভিন্ন গল্পÑ গ্রামীণ বাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন, রীতিনীতি, এমনকি ব্যক্তিগত আবেগও। কখনও পাখি, ফুল, লতাপাতা, গৃহস্থালির দৃশ্য, কখনও আবার পৌরাণিক কাহিনী বা ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতিফলন দেখা যায় এ কাঁথায়। এটি এক ধরনের হাতের কাজ, যা নারীদের সৃজনশীলতার মুক্ত প্রকাশ।

গল্পের কাঁথা

নকশিকাঁথা শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম নয়, বরং এটি একটি গল্পের বাহক। একটি কাঁথা তৈরিতে সময় লাগে কয়েক মাস, কখনও কখনও বছর। এর প্রতিটি সেলাই যেন একটি গল্পের অংশ, একটি আবেগের ছোঁয়া। একজন মা তার সন্তানের জন্য ভালোবাসা দিয়ে তৈরি করেন একটি কাঁথা; একটি মেয়ে তার বিয়ের জন্য সেলাই করেন জীবনের স্মৃতি। এভাবেই নকশিকাঁথা হয়ে ওঠে একটি পারিবারিক সম্পদ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।

নকশিকাঁথার ডিজাইনের বৈশিষ্ট্য

নকশিকাঁথার ডিজাইনে সাধারণত প্রাকৃতিক উপাদান, যেমন ফুল, পাখি, গাছপালা, প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং লোককথার চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। এটি প্রাচীন বাংলার একটি সৃজনশীলতার প্রতীক। উজ্জ্বল রঙের সুতা, যেমন লাল, হলুদ, নীল, সবুজ, এবং সোনালি দিয়ে নানা ধরনের নকশা তৈরি করা হতো, যা কাপড়ের ওপর হাতে সুতা দিয়ে সেলাই করা হতো।

এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল হাতি, বাঘ, পাখি, ফুলের নকশা। যেমন অনেক কাঁথায় দেখা যায় প্রাকৃতিক দৃশ্যের মতো পাখিরা উড়ে যাচ্ছে, ফুলগুলো ফুটে উঠছে এবং গাছপালার নানা আলপনাও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি শুধু শিল্পের বিষয় নয়, বরং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সমাজের জীবনধারা বোঝায়।


কাঁথার তৈরির পদ্ধতি

নকশিকাঁথা তৈরির জন্য মূলত সুতা এবং কাপড়ের প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের সেলাইয়ের মাধ্যমে সুতা দ্বারা প্যাটার্ন তৈরি করা হয়। কিছু বিশেষ সেলাই, যেমন ‘ফুলকরী’, ‘জালি’, ‘কাঁথা সেলাই’ ব্যবহৃত হয়। প্রথমে কাপড়ের ওপর একটি সাধারণ নকশা আঁকা হয়, তারপর সুতা দিয়ে ধীরে ধীরে সেলাই করা হয়। একেকটি নকশা তৈরিতে অনেক সময়, পরিশ্রম ও দক্ষতা লাগে; যা এ কাঁথাকে আরও মূল্যবান করে তোলে।

আধুনিক কালে নকশিকাঁথা

আজ নকশিকাঁথার গুরুত্ব আর কেবল ঘরোয়া ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন একটি বাণিজ্যিক শিল্প। আজকের দিনে নকশিকাঁথার ডিজাইনে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং ডিজাইনের চাহিদার কারণে নকশিকাঁথার ওপর নতুন রুচি এবং আকর্ষণীয় ডিজাইন যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে সেলাইয়ের পদ্ধতিতে আধুনিক মেশিনের ব্যবহার বেড়েছে, যা কাঁথার উৎপাদন দ্রুত এবং কম খরচে সম্ভব করেছে। এর পাশাপাশি নকশিকাঁথায় নতুন নতুন রঙের ব্যবহার, যেমন পেস্টেল শেড, সোনালি ও রুপালি সুতাও দেখা যাচ্ছে। নকশিকাঁথা এখন শুধু বিছানার চাদর বা গায়ের চাদর নয়, এটি ব্যবহার হচ্ছে পোশাক, ব্যাগ, দেয়ালসজ্জা এবং অন্যান্য পণ্যে।


নকশিকাঁথার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

নকশিকাঁথা বাংলাদেশের গ্রাম্য জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এটি শুধু একটি সযত্নভাবে তৈরি পোশাক বা কম্বল ছিল না, বরং একে একটি সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবেও গণ্য করা হয়। বিশেষ করে নববধূদের জন্য নকশিকাঁথা উপহার হিসেবে খুবই জনপ্রিয় ছিল। এটি তাদের নতুন জীবনের শুভসূচনা হিসেবে ধরা হতো। নকশিকাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ের মধ্য দিয়ে একটি গাঁথা বার্তা ছিল, যা বাংলার ঐতিহ্য, প্রেম ও সংস্কৃতির প্রতিফলন।

এ ছাড়া নকশিকাঁথা এখন আর শুধু ঘরের কম্বল বা শীতবস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না; এখন এটি ফ্যাশনেবল ফেব্রিক হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ডিজাইনাররা নকশিকাঁথাকে শাড়ি, স্কার্ফ, টপ এবং আরও অনেক ধরনের পোশাকের মধ্যে নতুনভাবে ব্যবহার করছেন। এ পরিবর্তনটি কাঁথার ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলেছে, পাশাপাশি বিশ্বব্যাপীও এটি পরিচিত হচ্ছে।

নকশিকাঁথা একটি অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা আমাদের গর্ব এবং সংস্কৃতির পরিচায়ক। এটি শুধু একটি প্রাচীন শিল্প নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাস, নকশা এবং হাতের কাজের প্রতি ভালবাসার প্রতিফলন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা