× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আইল্যান্ড পিক জয়ে রোমাঞ্চকর অভিযান

কাজী বাহলুল মজনু বিপ্লব

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৫৩ এএম

আইল্যান্ড পিকের চূড়ায় ৪ অভিযাত্রী

আইল্যান্ড পিকের চূড়ায় ৪ অভিযাত্রী

কানাডা থেকে রিনি রাশিব জানালÑ ভাইয়া অক্টোবর-নভেম্বরে ৬ হাজার ১৫৫ মিটারের (২০,২২৬ ফিট) পর্বত ইমাজা সে/আইল্যান্ড পিক অভিযানে যেতে চাই। রিনি ২০১৫ সালে মাউন্ট কেয়াজো রির বেজক্যাম্প ট্রেকিং করে, ২০১৬ সালে ভারতের নেহেরু মাউন্টেইন ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেয়, ২০১৭ সালে অন্নপূর্ণা সার্কিট এবং ২০১৯ সালে ভারতের স্টক কাংরি পর্বত অভিযান করে। কিন্তু বিভিন্ন ক্লাস, পড়ালেখার চাপে তেমন কোনো অভিযানে আর যাওয়া হয়নি। সে কানাডায় এখন ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবাতে আর্কটিক (উত্তর মেরুর শৈবাল) নিয়ে পিএইচডি করছে। এখন এক মাসের ছুটি নিয়েছে অভিযানে যাওয়ার জন্য। সেভাবে কাজ শুরু করে দিলাম। নেপালে আমাদের বন্ধু শেরপা দাওয়া তেনজিংয়ের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে ফেললাম।

পাহাড়ের বুকে এঁকেবেঁকে যাওয়া খরস্রোতা নদী

নুরুন্নাহার নিম্নিকে জানালাম সে-ও ঠিক করল এই অভিযানে যাবে। সে ব্যাংকে চাকরি করে। ছুটির ব্যবস্থাও করে ফেলল। নিম্নি ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্পে যায়, ২০২২ সালে ভারতের হিমালয়ান মাউন্টেইন ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেয় এবং ২০২৩ সালে ফার্চামো পর্বত অভিযানে গিয়েছে এবং সে ৪২,২১,৩০ আরও বিভিন্ন ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেছে। আমরা চারজন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) সদস্য। 

ওরা কানাডা থেকে অক্টোবরের ১৭ তারিখ ঢাকা আসে। আমরা ১৯ তারিখ অভিযানের উদ্দেশ্যে নেপাল পৌঁছি। থামেলে আমাদের পরিচিত তান্দুরি হোটেলে উঠি কয়েক ঘণ্টার জন্য। বিকালে কিছু কেনাকাটা করার সময় আমার জ্বর আসে। শরীর খুব দুর্বল লাগছিল। এক জায়গায় বসে পড়ি। ওরা আমার কপালে হাত দিয়ে দেখে আমার প্রচুর জ্বর। ঢাকা থেকে আমি জ্বর নিয়ে যাই। অবশ্য ওদের জ্বরের বিষয়টি জানাইনি। এখন বুঝতে পারছে ওরা আমার শরীরটা খারাপ। ওরা বলে সমস্যা হলে না যাওয়াই ভালো। এর মধ্যে আমাদের গাইড নিমা নুরু গারজা শেরপা হোটেলে দেখা করতে আসে। সে আমাদের সাথে যোগ দেবে চুখুং গ্রামে। এই ট্রেইল আমাদের পরিচিত, তাই আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছি নিজেরা পথ চলব এবং আমাদের ব্যাগ আমরা বহন করব। রাত ৯:৩০ মিনিটে নিমাকে বিদায় দিয়ে আগে থেকে রিজার্ভ করা গাড়িতে রামেছাপের উদ্দেশে রওনা দিই। কিছু দিন আগে নেপালের বিভিন্ন জায়গায় বন্যা হওয়ায় রাস্তা, ব্রিজ নষ্ট হয়ে গেছে, তাই আমাদের অনেকটা ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। সারা রাত গাড়িতে ঘুমিয়ে গিয়েছি। লুকলা যাওয়ার ফ্লাইটের সময় সকাল ৬:৩০ মিনিট। আমরা পৌঁছে যাই ৫:৪৫ মিনিটে। রামেছাপ এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেখি প্রচুর যাত্রী। গত ৩ দিন আবহাওয়া খারাপ থাকাতে লুকলার কোনো ফ্লাইট ছেড়ে যায়নি। আজ ছাড়বে কি না এখনও জানা নেই, সুতরাং অপেক্ষার পালা। খোলামেলা এয়ারপোর্ট পাশে নদী। চারদিকে পাহাড়। খুবই সুন্দর। ছোট এয়ারপোর্ট। এখানে আমি আগেও এসেছি। এখান থেকে ১৪ সিটের ছোট প্লেন ছাড়ে। পাশের দোকানে নাশতা করে নিলাম।

অভিযানে রোমাঞ্চকর এমন অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন অভিযাত্রীরা

বেলা ১১টার দিকে জানাল আবহাওয়া খারাপ থাকাতে আজও প্লেন ছাড়বে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমরা ঝিরিপথ দিয়ে যাব। সবাই রাজি। একটা জিপ রিজার্ভ নিয়ে যাত্রা শুরু করে দিলাম। এই পথে আমরা প্রথম যাচ্ছি। কিছু জায়গায় রাস্তা খারাপ। যেহেতু পাহাড়ের দেশ, তাই যেদিকে তাকাই শুধুই পাহাড়। চারদিকে সবুজ গাছ। ছোট-বড় অনেক গাছ। দুপুর প্রায় ১:৩০ মিনিটে দুপুরের খাবারের জন্য একটি হোটেলে বসি। কিছুক্ষণ পর আমাদের ড্রাইভার এসে বলে এখানে না, সামনে গিয়ে খাব। সামনে তো আর কোনো হোটেলে পাই না। শেষ পর্যন্ত বিকাল ৪টায় একটি হোটেল পাই, সেখানে খেয়ে নেই। জ্বরের কারণে রুচি নেই, তাই খেতে কষ্ট হচ্ছিল। শরীর অনেক দুর্বল। 

আবার যাত্রা শুরু। পথটি যে ভালো লেগেছে তা বলব না। খুব যে খারাপ তাও আবার না। রাত প্রায় ৯টায় সালেরি পৌঁছি। ড্রাইভার সরাসরি তার পরিচিত একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সাধারণ হোটেল কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানেই থাকতে রাজি হয়ে যাই। এই রাতে অন্য হোটেল আর খুঁজিনি। লম্বা জার্নিতে এমনিতেই অস্বস্তি লাগছে।

সকালে নাশতার আগে থামেডাটা যাওয়ার জন্য গাড়ির খোঁজে বের হয়ে যাই। কিছুক্ষণ পরে একজন স্মার্ট ড্রাইভার এসে হাজির, সে যাবে। তাকে আমাদের আগের দিনের ড্রাইভার জানিয়েছে। তার কথাগুলো সুন্দর। ভালো ইংরেজি বলতে পারে। রাজি হয়ে গেলাম তাকে নেওয়ার জন্য। নাশতা খেয়ে রওনা হয়ে গেলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর যে গ্রামের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলাম অনেক সুন্দর। নাম ফাপলু ভিলেজ। যদি কখনও কেউ এই পথে আসেন, তাহলে এখানে থাকলে বেশি ভালো লাগবে। 

পথটি ভালো লেগেছে। চারদিকে অনেক খোলামেলা। দৃশ্যগুলো অনেক সুন্দর। থামেডাটা পৌঁছি বেলা ১১:৩০ মিনিট। বন্যায় এখানে ছোট একটা ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় গাড়ি আবার বদলাতে হয়। এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে রাস্তার ঐ পারে পিকাপ টাইপের গাড়িতে উঠি। গাড়ির ভেতর জায়গা না থাকাতে আমাদের পেছনের খোলা অংশে উঠতে হয়। আরও যাত্রী আমাদের সাথে ছিল। এই গাড়ি চড়ার অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। খুব কষ্ট হয়েছে সবার। আমার ব্যাগ ছিঁড়ে গিয়েছে। নিম্নির শরীরে কয়েক জায়গায় ব্যথা পেয়েছে। রাস্তা ভয়াবহ খারাপ দেখে সন্ধ্যার কিছু আগে আমাদের পাইয়া গ্রাম থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরে নামিয়ে দেয়। এবার ভারী ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু। গ্রামে পৌঁছার কিছু আগে আমার এক চোখ অন্ধ হয়ে যায়। এক চোখে কিছুই দেখছিলাম না। শরীর খুবই দুর্বল। একবার রাস্তায় পড়েও গিয়েছিলাম, কিন্তু ওদের কিছুই বুঝতে দিইনি। ওরা আবার চিন্তায় পড়ে যাবে। ওরা সবাই আমাকে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করছিল আপনার শরীর ঠিক আছে? জ্বর আছে কি না কপালে হাত দিয়ে দেখেছে। আমরা পাইয়া গ্রাম প্রায় পার হয়ে যাচ্ছিলাম, ওদেরকে বললাম শরীর খারাপ লাগছে এখান থেকে যাই। একজন জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবেন, বললাম পাইয়া। এটাই তো পাইয়া। সামনে তো কয়েক ঘণ্টা হাঁটলে আরেকটা গ্রাম। আসলে এখানে ৩০ মিনিটে চলে আসাতে মনে করেছিলাম আরেকটু সামনে গেলে পাইয়া গ্রাম। কপাল ভালো সামনে আর যাইনি। এখানেই একটি লজে উঠি, কিন্তু সারা রাত ঘুম হয়নি। শরীরে খুব ব্যথা, চোখেও সমস্যা। সকালে ওদের আমার সমস্যার কথা জানালাম। ওরাও অনেকটা চিন্তায় পড়ে গিয়েছে। বিষয়টির কারণে নিজেরও খারাপ লাগছে। ওরা আমার ব্যাগ বহন করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি রাজি হইনি। এমনিতেই আমার ব্যাগের বেশি ওজন। সকালে চোখে কিছুটা দেখতে পাচ্ছি।

নাশতা খেয়ে ফাকদিনের উদ্দেশে ট্রেকিং শুর করি। প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর আমি বসে পড়ি, আমার পাশে রাশিব ছিল। সাথে সাথে সে আমাকে ধরে তুলে দাঁড় করায় এবং বলে আপনার ব্যাগ আমাদের দিয়ে দেন, রিনি আর নিম্নি আরও সামনে ছিল। রিনিকে রাশিব ডাকলে রিনিও এসে বলে আপনার ব্যাগ আমাকে দেন, তাতেও রাজি হইনি। আবার ১০ মিনিট হাঁটার পর আবার রাস্তার ওপর পড়ে যাই। শরীর খুবই দুর্বল লাগছিল। রিনি এসে এবার একরকম জোর করে আমার কাঁধের ব্যাগ নিয়ে নেয়। তার ব্যাগ আমাকে দেয়। আমার ব্যাগ ওদের থেকেও ওজন বেশি। রাশিবের ব্যাগও অনেক বড়, তাই তার ব্যাগ সে নিজেই বহন করছিল। রিনি আর নিম্নি শেয়ার করে আমার ব্যাগ বহন করছেÑ বিষয়টি দেখে নিজের কাছে খারাপ লাগছিল। আমার জন্য ওদের কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু বিষয়টি বুঝতে দেয়নি। খুব খারাপ একটা পথ। তবে আগামী দুই বছরের মধ্যে এখানে রাস্তা হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা বেশি। অনেক জায়গায় রাস্তা কেটে রেখেছে আবার কিছু জায়গায় কাজ চলছে। প্রায় পৌনে ১১টায় ছোট একটা ব্রিজ পার হয়ে সুরকে গ্রামে পৌঁছি। পাথরে এবং কাঠে বানানো ঘর এখানে। এখান থেকেই ওরা আমার ব্যাগ বহন করার জন্য শান্তা নামের একজন পোর্টা ঠিক করে। প্রতিদিন দুই হাজার টাকা দিতে হবে। পথে একজন মহিলা গাইডের সাথে পরিচয় হয়। সে আমাদের পোর্টার ঠিক করে দেয়। চা খেয়ে আবার হাঁটা শুরু করি। পোর্টার শান্তা কথা খুব কম কথা বলে, কিন্তু খুবই ভালো মানুষ। এরপর দুপুরে জোরসালে খাবার খেয়ে হাঁটা শুর করি। এই পথেও অনেক ট্রেকার, ক্লাইম্বার দেখা যায়। সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটে ফাকদিন পৌঁছি। এখন সব পরিচিত জায়গা। আগেও যেহেতু এই পথে এসেছি, শরীর অনেক খারাপ তাই ওরা চেয়েছিল ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু এখানে কোনো ডাক্তার পাওয়া যায়নি। আমরা শান্তার বন্ধুর হোটেলে উঠেছি।

সকালে নাশতা খেয়ে নামচে বাজারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। আজ আমার চোখ অনেকটা ভালো। এটি একটি বিখ্যাত ট্রেইল। এই ট্রেইলে অসংখ্য ট্রেকার দেখা যায়। বেশিরভাগই যাবে এভারেস্ট বেজক্যাম্প। সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। ইয়াক ও খচ্চরের আনাগোনাও বেশি। বিভিন্ন ক্যাম্পে মাল বহন করে নিয়ে যায়। তাদেরকে আবার সাইড দিতে হয়। মাঝে মাঝে সুন্দর কোনো দৃশ্য দেখলে ছবি উঠাচ্ছি। এই ট্রেইলটি আমার প্রিয় ট্রেইল। শায়লা ভিলেজে পৌঁছি প্রায় ১১:৩০ মিনিটে। এখান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার হাঁটা শুরু। 

এই পথে অনেক আপেলগাছ দেখা যায়। আপেলকে নেপালি ভাষায় বলে ছেও। আশপাশের জমিতে আলু চাষ হয় বেশি। মানজো ভিলেজে পৌঁছি। এখান থেকে সাগরমাতা ফরেস্ট ও ট্রেকিংয়ের জন্য টিকিট কিনতে হয়। দুটোতে লেগেছে জনপ্রতি ৭ হাজার রুপি। প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে এখানে। প্রচুর ট্যুরিস্ট। আমার শরীর আগে থেকে কিছুটা ভালো। চোখ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে। শান্তা আমাদের সাথেই আছে। নামচে বাজার পৌঁছি প্রায় ২:৩০ মিনিটে। ফ্রেন্ডস নামের পরিচিত লজে উঠি।

এখান থেকে আমাদের পোর্টার শান্তাকে বিদায় দিই। বিকালে রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাই। ওরা আমাকে জানিয়ে রাখে পরের দিন আপনি হাইটগেনে যাবেন না। বিশ্রামে থাকবেন।

আসার পথে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যদি শরীরের এই অবস্থা থাকে তাহলে আমি নামচে বাজারেই থেকে যাব। ওরা ফেরার পথে আমাকে নিয়ে যাবে। ডাক্তারও দেখাতে চেয়েছিল এখানে, কিন্তু আমি আর রাজি হইনি। কারণ আমি আগে থেকে অনেক সুস্থ। ওরা ৩ জন এই কয়েক দিন আমার এত যত্ন নিয়েছে, প্রতি মুহূর্ত খেয়াল রেখেছে, এজন্য আমি আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠি। ভুলব না কোনো দিন তাদের ভালোবাসা। চিরকৃতজ্ঞ থাকব। পরের দিন ওরা হাইটগেন থেকে ফিরে আসে। আমি আজ আরও বেশি সুস্থ। নিজের কাছে ভালো লাগছে ওদের কাছেও তাই। এই জায়গা আমার প্রিয় জায়গা। নামচে বাজারকে শেরপাদের রাজধানী বলা হয়। এর উচ্চতা ১১ হাজার ২৮৬ ফুট। এটি খুম্বু অঞ্চলে অবস্থিত। নামচে বাজারের ওপরে পুরোনো একটি রানওয়ে আছে। এখন সেটি ব্যবহার হয় না। এই শহরে ব্যাংক থেকে শুরু করে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আছে। এখানে সব ট্রেকার, ক্লাইম্বার দুই রাত অবস্থান করে।

পরের দিন সকালে থেংবোচের উদ্দেশে ট্রেকিং শুরু করি। কিছু দূর হাঁটার পর শুরু হয় দুটি স্বপ্নের চূড়া দেখার। এভেরেস্ট ও আমাদাবলাম। জানি না স্বপ্ন কবে পূরণ হবে। যতবার দেখি ততবারই ভালো লাগে। এভারেস্টের জন্য এখন অনেক টাকা লাগে। প্রায় ৫০ লাখ টাকা। খুব ভালো এজেন্সির মাধ্যমে গেলে আরও বেশি লাগে। স্বপ্নকে পাশে রেখেই হাঁটতে থাকলাম। এরপর শুরু হলো নিচের দিকে নামা। শুধু নামছি ওরা বলে এই যে নামছি আবার তো ওপরে উঠতে হবে। বললাম হ্যাঁ, এর থেকেও উঁচুতে। এই পথেই দেখা হয়ে গেল বিখ্যাত পর্বতারোহী বিশ্বরেকর্ড ধারি ৩০ বার এভারেস্ট বিজয়ী কামি রিতা শেরপার সাথে। তার সাথে কথা বলে পরে গ্রুপ ছবি তুলেছি। সে আমাদের জিজ্ঞেস করে তোমাদের গাইড কে। জানালাম নিমা নুরু গারজা শেরপা। সে বলল, সে আমার চাচাতো ভাই। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। চারদিকে বিশাল গাছ। ঘন জঙ্গল একটা বন। একেবারে নিচে এসে রিভার সাইডে পৌঁছে রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। বাতাসের কারণে কিছুটা শীত লাগছিল। খেয়ে ওপরের দিকে ওঠা শুরু করি। আমি এই পথে ২০০৯-এ যখন প্রথম আসি, তখন মুহিত ভাই, নুর ভাই বলেছিল এই পথ তেল বের হওয়ার পথ। অনেকেই তাই বলে। কিছু দূর হেঁটে বিশ্রাম নিয়ে সবাই আবার হাঁটা শুরু করি। দুপুর ২টার দিকে থেংবোচে পৌঁছি। এখানে একটা মনস্ট্রি আছে। নেপালে সবচেয়ে উচ্চতার মনস্ট্রি। উচ্চতা ১২,৬৮৭ ফুট। এবার দেখলাম মনস্ট্রি ঢুকতে ৩০০ রুপি দিয়ে টিকিট কাটতে হয়। আগে ছিল না এ রকম। এখানে কোনো লজ খালি না পাওয়াতে আমরা কিছুটা সামনে গিয়ে দেবুচুতে রিভেনডাল লজে উঠি। খুবই সুন্দর একটা লজ। এই পথে প্রচুর রডোড্রেনড্রন ফুলগাছ। নেপালের জাতীয় ফুল। নেপালি ভাষায় একে বলে লালি গুরাস। এখানে পরিচয় হয় পশ্চিম বঙ্গের সত্যরুপ দাদার সাথে। দুটো টিম নিয়ে এসেছে এভারেস্ট বেজক্যাম্প নিয়ে যাবে। খুব অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ। আগে ক্লাইম্বিং করতেন। খুব আলাপি মানুষ, তার সাথে সময়টুকু ভালো লেগেছে। বিকালে আমরা পাকোড়া খাই খুবই সুস্বাদু ছিল। আমরা এই উচ্চতায় অনেক কিছুই আশা করি না, কিন্তু পাকোড়া পেয়ে খুবই খুশি।

পরের দিন ডিংবোচের উদ্দেশে সকাল ৭টায় ট্রেকিং শুরু করি। সুন্দর পথ চারদিকে মনে হয় গাছগুলো কেউ হাত দিয়ে লাগিয়েছে। একটা ব্রিজ পার হয়ে কিছু ছবি তুললাম। এখানে মাউন্ট আমাদাবলামের ছবি ভালো আসে। কিছুটা পথ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। এই পথ অনেকটা সমান্তরাল। এই পথেই আমাদাবলামের বেজক্যাম্পে যায়। আমাদের বাম পাশে উঁচু পাহাড় আর ডান পাশে নদী। ওই পাড়ে আমাদাবলাম রেঞ্জ। হাঁটছি আর আমাদাবলাম আমাদের সাথেই আছে। মন বলছিল এখনই চলে যাই আমাদাবলাম।ঐ দূরে দেখা যায় ডিংবোচে ভিলেজ। মনে হয় পাহাড়ের বুকে কিছুটা কাত হয়ে আছে গ্রামটি। পৌঁছে গেলাম দুপুর ১টার দিকে। একটি লজে উঠলাম। দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা হাইটগেনে বের হই। হাইটগেনে যেতে আমার ভালো লাগে, চারদিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। বিকাল নাগাদ আবার ফিরে আসি লজে। এখানকার মালিকের সাথে পরিচয় হয়। নাম তেনজিং। ৭ বার এভারেস্ট জয় করেছে। এখনও সে টগবগে যুবক। খুবই সহযোগিতাপূর্ণ মানুষ। রাতে রাশিবের জ্বর আসে। সকালের ভেতর অনেকটা সুস্থ হয়ে যায়।

ঢাকা থেকে আসার আগে ক্লাবের সাথে আলাপ করে আমরা সিদ্ধান্ত নিই এবার সজল ভাইয়ের নামে স্টেইনলেস স্টিলের একটা স্মৃতিফলক স্থাপন করব। ২০১৪ সালে আমরা পাথরে লেখা স্মৃতিফলক স্থাপন করি। এবারও একই জায়গায় স্থাপন করব স্মৃতিফলকটি।

পরের দিন সকালে আমরা অপেক্ষা করছিলাম একজন গাইডের জন্য। সে ড্রিল মেশিন নিয়ে আসবে সজল ভাইয়ের নামে স্টেইনলেস স্টিলের মধ্যে লেখা স্মৃতিফলক লাগাবে দুঘলাতে। সে সকাল ৮টার সময় আসে। নাম দাওয়া শেরপা। রওনা হয়ে গেলাম লবুজের উদ্দেশে। কিন্তু কিছুটা উচ্চতায় উঠে এবার বিশাল খোলা জায়গায় দিয়ে হাঁটা শুরু করি। বিশাল মাঠ তার ডান পাশে উঁচু পাহাড়। বাম পাশে নিচে পেরিচে গ্রাম। সেই গ্রামে আগেও ৩ বার গিয়েছি। প্রচুর ট্যুরিস্ট যাচ্ছে। আমাদের গাইড বলল আমার সাথে একজন আগে চলো তাড়াতাড়ি স্মৃতিফলকটি লাগানোর জন্য। সে আবার ওখান থেকে লবুজে হাই ক্যাম্পে যাবে। সেখানে তার ক্লাইন্ড অপেক্ষায় থাকবে। আমি তার সাথে হাঁটা শুরু করে দিলাম ওদের থেকে আপাতত বিদায় নিয়ে। সামনে আবার দেখা হবে। বেলা ১০:৪৫-এ দুঘলা পৌঁছে যাই। এর উচ্চতা ১৫ হাজার ১৫৭ ফুট। আমরা ড্রিল মেশিন দিয়ে কাজ শুরু করে দিই। স্ক্রু দিয়ে সেটা লাগাই। কাজ শেষে গাইড তার পারিশ্রমিক বুঝে নিয়ে চলে যায়। আমি রিনি, নিম্নি, রাশিবের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। প্রায় ৪০ মিনিট পর নিম্নি আসে, এর কিছুক্ষণ পর আসে রিনি ও রাশিব। স্মৃতিফলকের চারপাশে কিছু পাথর দিয়ে দিই এবং এক মিনিট নীরবতা পালন করি। এখানে অনেক বিখ্যাত পর্বতারোহীদের স্মৃতিফলক লাগানো আছে। কেউ যদি এই পথে কখনও যান তাহলে দুঘলার ওপরে উঠে ডানে কিছুটা হাঁটলেই সজল ভাইয়ের স্মৃতিফলক দেখবেন। পাশে বিখ্যাত পর্বতারোহী স্কট ফিশারের স্মৃতিফলকও আছে। প্রায় ২০ মিনিট থেকে লবুজের উদ্দেশে রওনা হই। ৪০ মিনিট পর লবুজে পৌঁছে যাই। 

আমাদের গাইড আগেই ফোন দিয়ে লজ বুক করে রেখেছিল। রুমে কাপড় পরিবর্তন করে লজের নিচতলায় রেস্টুরেন্টে চলে আসি। এখানে প্রত্যেকটা টেবিলে যেসব গাইড লজ বুক করে রেখেছে তাদের নাম লিখে রেখেছে। ম্যানেজার আমাদের টেবিল দেখিয়ে দিল। আমাদের গাইডের নামের পাশে আরও লেখা দেখে অবাক হলাম। ম্যানেজারকে বললাম এটা আমাদের টেবিল তো? সে বলল তোমারা তো বাংলাদেশি। এটাই তোমাদের টেবিল। ইংরেজিতে লেখা ছিল। আমি বাংলায় লিখছি। নিমা নুরু গারজা শেরপা। সবচেয়ে কম বয়সি ২৪ বার এভারেস্ট বিজয়ী। সারপ্রাইজ ছিল আমাদের জন্য। অথচ তার সাথে দেখা হলো, কথা হলো, প্রতিদিন সে আমাদের খোঁজ নিচ্ছে এই সম্পর্কে কিছুই বলেনি। দাওয়া তেনজিং শেরপা নামের আমার এক বন্ধুর শ্যালক, সে ঠিক করে দিয়েছে। সেও কিছু বলেনি। তার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল।

পরের দিন। আজ অনেক লম্বা পথ। উদ্দেশ্য এভারেস্ট বেজক্যাম্প। নাশতা খেয়ে সকাল ৭টায় হাঁটা শুরু করি। হাঁটছি আর ২০০৯ সালের কথা মনে পড়ছে এই পথেই এসেছিলাম। কিছু পথ মনে আছে, কিছু পথ ভুলে গেছি। নিম্নি এই পথে আগে এসেছে কিন্তু রিনি, রাশিব এই ট্রেইলে প্রথম। তাদের অনুভূতি ভিন্ন রকম। এই পথটিও চারদিকে খোলামেলা। যেহেতু এই উচ্চতায় গাছ দেখা যায় না। সামনে মাউন্ট পুমোরি দেখা যাচ্ছে, পর্বতটি সুন্দর কিন্তু ভয়ংকর। এটি ক্লাইম্ব করতে গিয়ে মারা যাওয়ার রেকর্ড আছে। প্রায় ১১টায় পৌঁছে যাই গোরকশেপ। এর উচ্চতা ১৬ হাজার ৯৪২ ফুট। মনে পড়ে গেল ২০০৯ সালে এখানে এক রাত থেকে সকালে কালা পাথর গিয়েছেলাম। উচ্চতা ১৮ হাজার ৫২০ ফুট। এখানে চা, কিছু হাল্কা খাবার খেয়ে নিই। ১২টার দিকে বেজক্যাম্পের দিকে যেতে থাকি। কিছু দূর গিয়ে পাথরের দেয়াল দিয়ে হাঁটছি। চারদিকে দেখে মনে হয় পাথরের শহর। ছোট-বড় পাথর বের হয়ে আছে। কিছু পাথর মনে হয় এখনি খুলে পড়বে। এই সময় আইস থাকে না। অথচ আমি যখন এসেছি সব জায়গায় শুধু বরফ দেখা গেছে। এখন বরফের হাহাকার। মনে হয় বরফের দুর্ভিক্ষ লেগেছে। আমরা দুপুর পৌনে ২টায় এভারেস্ট বেজক্যাম্প পৌঁছি। এর উচ্চতা ১৭ হাজার ৫৯৮ ফুট। আবার মনে পড়ল ২০০৯-এর কথা, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এই বেজক্যাম্পে এক রাত থাকার। তখন এটিকে তাঁবুর শহর মনে হয়েছিল। এখন দাঁড়িয়ে ভাবছি কবে যাব ঐ উচ্চতায়। এখন দরকার শুধু স্পন্সর। 

বেজক্যাম্প লেখা পাথরের ওপর ছবি ওঠানোর জন্য আমাদের ৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ছবির পর্ব শেষ করে কিছুক্ষণ থেকে আবার ফিরতি পথ ধরি। ফিরতি পথে গোরকশেপে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার যাত্রা শুরু করি। লবুজে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ৭টা বেজে যায়।

পরের দিনের পথটিও লম্বা পথ। চুখুং যাব। আবার সেই ফিরতি পথ দুঘলা, ডিংবোচে হয়ে যেতে হবে। ডিংবোচে ফিরে আসি রাত প্রায় ১২টায়। এখানে ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করি। দুপুরের খাবার খেয়ে চুখুংয়ের উদ্দেশে রওনা দিই। বিশাল খোলা জায়গা সমান্তরাল পথ। খুব পরিশ্রম করতে হয় না। অভিযানে এসব দৃশ্য যত দেখি ততই ভালো লাগে। কখনও বিরক্তি আসে না। পথে অনেক বিভিন্ন দেশের ক্লাইম্বারদের সাথে দেখা হয়েছে। কেউ আইল্যান্ড পিক করে ফিরে যাচ্ছে আবার ক্লাইম্বিংয়ে যাচ্ছে। এখানে একধরনের ছোট গাছ দেখা যায়। পাতাগুলো অনেকটা লাল। নেপালিরা এটাকে বলে কাটা গাছ। গায়ে কাটা আছে। বিকাল প্রায় ৪:৩০ মিনিটে চুখুং পৌঁছি। এর উচ্চতা ১৫ হাজার ৫২০ ফুট। নিম্নি আগে গিয়ে লজে আমাদের বুক করা রুম পায়নি। আমাদের দেরি হওয়াতে মনে করেছিল আমরা আসব না আজ। তাই অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু অন্য রুমের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। লজের নাম কাংড়ি। খুব সুন্দর লজ। সামনে অনেক খোলা জায়গা। সন্ধ্যার পরে আমাদের জন্য আরেকটি সারপ্রাইজ ছিল। লজের রেস্টুরেন্টে আমরা ৪ জন বসে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় বাংলাদেশের অভিযাত্রীর লিসা, সাফকাত এবং ইউসুফ আমাদের সামনে হাজির। সাথে সাথে সবাই সবাইকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলাম। ওরা আইল্যান্ড পিক সামিট করে মাত্র ফিরেছে। অভিনন্দন জানালাম। ভিন দেশে, দেশি ভাই বোন, বন্ধুদের সাথে দেখার আনন্দই অন্য রকম। 

পরের দিন ওরা ৩ জন বিদায় নিয়ে চলে গেছে। সকাল ১০টায় আমরা হাইটগেনে বের হব, কিন্তু রিনি দুদিন ধরে আমাশয়ে ভুগছে। প্রতি ঘণ্টা তাকে বাইরে যেতে হচ্ছে। এই অবস্থায় তার হাইটগেনে কোনোভাবে যাওয়া ঠিক হবে না। রাশিবও থেকে যায় রিনির দেখাশোনার জন্য। আজ হাইটে যাব চুখুং রি। উচ্চতা ৭০০ মিটার। লজের মালিক লফসন আমাদের পথ দেখিয়ে দেয় এবং বলে উঠতে সময় লাগবে ৩ ঘণ্টা। আমি আর নিম্নি চলে যাই। যত ওপরে উঠছি ততই ভালো লাগছে। যত দূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। পাশেই আমাদাবলামের আরেক পাশ। আইল্যান্ড পিক দেখা যায়। আর কিছু বিদেশিও ছিল। ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটে আমরা ৭০০ মিটার সম্পন্ন করে ফিরেছি। ফিরে লফসনকে বললাম ২ ঘণ্টা ২০ মিনেটে সম্পন্ন করেছি। ও অবাক, বলে তোমরা দ্রুত গিয়েছ।

রাশিব বলে এত দ্রুত আসলেন কীভাবে। ঢাকায় আমরা প্রচুর প্র্যাক্টিস করি এবং প্রতিবছর অভিযানে আসি। এসেই দেখি আমাদের গাইড নিমা নুরু শেরপা চলে এসেছে। ওকে দেখে ভালো লাগল। বিকালে আমরা এখান থেকে আইসবুটসহ কিছু জিনিসপত্র ভাড়া নিই।

পরের দিন দুপুরের খাবার খেয়ে দুপুর ১২টায় বেজক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই। যাওয়ার আগে সবাই বলল শরীর সবার ঠিক আছে। রিনিকে সমস্যার কথা ওভাবে জিজ্ঞেস করলাম না। আমার ইচ্ছে ছিল দেখি শেষ পর্যন্ত কী বলে। চমৎকার একটি ট্রেইল। এক জায়গা আছে দুই পাশে ছোট পাহাড় মাঝখান দিয়ে পথ। হাঁটছি আর ভাবছি এখানে সারা জীবন থাকার জন্য একটা ঘর বানাতে পারতাম। আবার ভাবছি, প্রকৃতি মানুষের সংস্পর্শ ছাড়াই বেশি সুস্থ থাকে। আরও সামনে গিয়ে দেখি বিশাল মাঠ, কিছুটা দূরে পাহাড়। কোনো গাছ নেই। এই উচ্চতায় গাছ হয় না। বেজক্যাম্প পৌঁছি প্রায় ৩:৩০ মিনিটে। উচ্চতা ১৭ হাজার ৬০০ ফুট। ২০১২ সালে যখন এখানে এসেছি, আমাদের বেজক্যাম্প ছিল আরও সামনে।

বেজক্যাম্পের তাঁবুগুলো বড়, ভেতরে দাঁড়ানো যায়। আমি, রাশিব এক ট্যান্ট এবং রিনি, নিম্নি এক ট্যান্ট। ভেতরে ব্যাগ রেখে ডাইনিং ট্যান্টে চা খেতে চলে আসি। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত এখানে থাকি। চা, চকলেট ড্রিংকস, পপকর্ন একটার পর একটা খেতে থাকি। সন্ধ্যায় আমরা ডিনার সেরে নেই। সামিটে যাওয়ার জন্য রাত ১০টায় উঠতে হবে, তাই সন্ধ্যার পরপরই ঘুমিয়ে পড়ি। আজ ফাইনাল ম্যাচ। চূড়ায় যেতে হবে। সরাতে হবে ঘুমাবার আগে। সামিটের কাপড় পড়ে নিই। ব্যাগের ভেতর আইসবুট, ক্রেমপন, হার্নেস, পানি, কিছু খাবার, কয়েক ধরনের হ্যান্ডগ্লাভস নিয়ে নিই। ডাইনিংয়ে খেয়ে রাত ১১:১৫ মিনিটে চূড়ার উদ্দেশে রওনা দিই। রিনির সমস্যা সত্ত্বেও একবারের জন্য বলেনি আমি চূড়ায় যাব না। মানসিকভাবে শক্তিশালী। 

রাতে হাঁটার কারণে আশপাশে কিছু দেখা যায় না। কিছু ক্লাইম্বারকে দেখা যাচ্ছে ওপরের দিকে যেতে। সবাই সাবধানে এগোচ্ছে ভয়ংকর পাথুরে পথ। আজ আবহাওয়া খুবই ভালো। আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। বাতাস নেই। বাতাসকে আমরা ভয় পাই। শরীরের অবস্থা খারাপ করে ফেলে। মাঝেমধ্যে পানি, চকলেট খেয়ে নিচ্ছি। ক্রেম্পন পয়েন্ট পর্যন্ত রক পার্ট, তাই আমরা ট্রেকিং বুট পরেই হাঁটছি। ক্রেম্পন হলো জুতার নিচে কাটাসদৃশ্য যে লোহার ধাতুটি থাকে, ক্রেম্পন পয়েন্টে প্রায় ভোর ৫:৩০-এ পৌঁছি। সেখানে দ্রুত আইসবুট, ক্রেমম্পন ও হার্নেস পরে নিই সবাই। হার্নেস হলো কোমরে বেল্টের মতো লাগানো থাকে, যেটির মধ্যে আমার জুমার (দড়ি বেয়ে ওঠার যন্ত্র), ডিসেন্ডার (নিচে নামার যন্ত্র), স্ক্রু ক্যারাবিনা, প্লেন ক্যারাবিনাসহ আরও অনেক কিছু থাকে। কিছু দূর হাঁটার পর এবার বরফে হাঁটা শুরু। এখান থেকে চূড়া দেখা যায়। কিন্তু অবাক হয়েছিÑ ২০১২ সালে যখন আমি এখানে আসি প্রচুর স্নো ছিল। ক্রেম্পন পয়েন্ট থেকে হেঁটে ক্রেভাস পার হয়ে, আইস ওয়াল দিয়ে উঠে নাইফ রিজ পার হয়ে চূড়ায় চলে গেছি, অথচ এটা আবার কোন পথ। অচেনা মনে হচ্ছে। চারদিকে স্নো গলে গেছে সামিট অনেক উঁচুতে। বরফ গলে ওপরে ওঠার বিভিন্ন স্তর তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো ওপরে বিশাল রক বের হয়েছে, তাতে দুর্ঘটনা বাড়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। জানি এই সময়ে স্নো কম থাকে, তাই বলে এই অবস্থা! তার মানে ক্লাইমেট চেঞ্জ। পরিবেশের ওপরে বিশাল চাপ। আমরা যদি পরিবেশ সম্পর্কে এখনও সচেতন না হই তাহলে অতি দ্রুত পৃথিবী ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। দড়ি বেয়ে সবাই ওপরের দিকে ওঠা শুরু করে দিলাম। এই পিকে এখন প্রচুর পরিমাণে পর্বতারোহী আসে। ওঠা ও নামার সময় জ্যাম লেগে যায়, যেহেতু পথ একটাই। নিম্নি সামনে এরপর রিনি তারপরে রাশিব এবং শেষে আমি। গাইড দুজন তো সামনে আছে। ওপরের দিকে রক পার্টের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে কোনো ভিনগ্রহের এলাকা। ভোরের আলোয় চারদিকে এত সুন্দর লাগছে মনে হয় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ দৃশ্যগুলো দেখি।

মনে হয় না এত সুন্দর সকাল আর কোথাও দেখা যাবে। চূড়ায় ওঠার সময় কম-বেশি কষ্ট হয় সবার।ভয়ও আছে।ঝুঁকি থাকে অনেক। দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সব কষ্ট, ঝুঁকি, ভয়কে জয় করে শেষ পর্যন্ত আমরা চূড়া জয়ে সফল হই সকাল ৮টা ৮ মিনিটে। রিনি, রাশিব, নিম্নির প্রথম সফল পর্বতারোহণ। দেশের পতাকা নিয়ে ছবি ওঠাই সবার আগে। এবার আমরা একটা স্লোগান নিয়ে গিয়েছি। সেভ সুন্দরবন-সেভ টাইগার, সেটার ব্যানার নিয়ে ছবি ওঠাই এবং ক্রণিক অটোইমিউন এক্সপেডিশনের ব্যানার নিয়ে ছবি ওঠাই।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা